রোববার ● ৩১ মে ২০২০ ● ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ ● ৭ শওয়াল ১৪৪১
যেভাবে জুমা ও জামাত করবেন, আরব ও উপমহাদেশের আলেমগণের পরামর্শ
ভোরের পাতা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২০, ৮:০৯ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

যেভাবে জুমা ও জামাত করবেন, আরব ও উপমহাদেশের আলেমগণের পরামর্শ

যেভাবে জুমা ও জামাত করবেন, আরব ও উপমহাদেশের আলেমগণের পরামর্শ

করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে ডাক্তারদের পরামর্শ ছিলো মানুষের সমাগম থেকে দূরে থাকা। মুসলমানদের ধর্মীয় অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো জমায়েত হওয়া ছাড়া আদায় করা যায় না। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করতে হয়।
নামাজের জামাতে বহু লোকের সমাগম হয়। মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলা হয় জুমাকে। সেখানে আরো বড় জমায়েত হয়। সম্প্রতি জুমা ও জামাতের নামাজ নিয়ে আরব বিশ্ব ও উপমহাদেশের আলেমদের বিভিন্ন মতামত ও পরামর্শ সামনে এসেছে। নিম্নে সেগুলোর অনুবাদ তোলে ধরা হচ্ছে।

যথাসম্ভব জুমা না ছাড়া :
জুমার নামাজ ইসলামের অনেক বড় একটি প্রতীক। শরয়ী পরিভাষায় বলা হয় শি’আর। অর্থাৎ যে বিষয়গুলো দ্বারা মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে পার্থক্য ফুটে ওঠে তার অন্যতম হচ্ছে জুমা। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ, মুকিম যে মুসাফির নয় এমন পুরুষের ওপর জুমার নামাজ ফরজ। পবিত্র কোরআনের আয়াত দ্বারা তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। জুমার নামাজে শরীক হওয়ার নির্দেশ দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! জুমার দিন যখন তোমাদেরকে নামাজের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর জিকিরের দিকে ধাবিত হও এবং বেচা-কেনা ত্যাগ করো (সূরা জুমআ:৯)। তাই জুমার আজানের পর নামাজের প্রতিবন্ধক কোনো কাজ করাকেও ওলামায়ে কেরাম হারাম বলেছেন। আবু দাউদ শরিফে বর্ণিত হয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ। তবে চার ব্যক্তি ব্যতিত-১. গোলাম, ২. নারী, ৩. নাবালেগ, ৪. অসুস্থ।

সুতরাং কোনো শরয়ী কারণ ছাড়া জুমার নামাজ তরক করা মারাত্মক গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হাদিসেও এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি- হুজুর (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, যারা জুমার নামাজ ত্যাগ করে তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা কঠিন ধমকি দিয়ে বলেন, তাদের অন্তরে মোহর অঙ্কিত করে দেয়া হবে। অতঃপর তারা গাফেলদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে (সহিহ মুসলিম-৮৬৫)।

ইসলাম মানুষের সাধ্যের বাহিরে কোনো বিষয় চাপিয়ে দেন না :
কোনো বিষয় যত গুরুত্বপূর্ণই হোক তা বান্দার সাধ্যের বাইরে হলে তা করতে বাধ্য করা আল্লাহর নীতি নয়। এটা ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা কাউকে সাধ্যতীত দায়িত্ব দেন না।’ (সূরা বাকারা-২৮৬)। জুমার নামাজের ক্ষেত্রেও সে দৃষ্টিভঙ্গি মেনে চলা হয়েছে। তাই যখন ভয় এবং ক্ষতি নিশ্চিত হবে তখন জুমার নামাজ পরিত্যাগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। চাই সে ভয় নিজের ব্যাপারে হোক অথবা পরিবার কিংবা মালের ব্যাপারে। এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রে রাসূল (সা.) থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আজান শুনার পর মসজিদে না আসার কোনো সুযোগ নেই। তবে ওজর থাকলে ভিন্ন কথা। তখন সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন সেই ওজর কি? রাসূলে পাক (সা.) বলেন, ভয় এবং অসুস্থতা (আবু দাউদ-৫৫১) সুতরাং শরয়ী কোনো ওজর ছাড়া জুমার নামাজ তরক করার কোনো সুযোগ নাই।

বর্তমান সময়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে জুমা ছেড়ে দেয়ার প্রসঙ্গটি এখানে আলোচনায় আসতে পারে। রাসূল (সা.) মূলত যারা অসুস্থ তাদেরকে জামাতে না আসার অনুমতি দিয়েছেন। তাই যদি কোনো ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাহলে তার কর্তব্য হলো সে মসজিদে নামাজ পড়তে যাবে না। বরং সে নিজ ঘরে নামাজ আদায় করবে। রাসূল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় তা উম্মতকে বলে দিয়েছেন। তাঁর (সা.) ভাষায় ‘অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ ব্যক্তির কাছে যাবে না।’ (বুখারী-৫৭৭১, মুসলিম-২২২১)।

যেহেতু মসজিদে অনেক সুস্থ লোক থাকে তাই এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ড হাইয়াতু কিবারিল উলামা করোনায় অসুস্থ ব্যক্তির জুমা বা জামাতে উপস্থিত হওয়াকে হারাম বলেছেন।’ কারো কারো মতে এমন ব্যক্তিদের জন্য হাসপাতালগুলোতে যেরকমভাবে আলাদা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় তদ্রুপ তাদের জন্যও মসজিদে পৃথক নামাজের জায়গার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ দ্বীনদার চিকিৎসকের পরামর্শকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

পূর্বোক্ত হাদিস ছাড়াও এমন অসুস্থ লোকদের জামাতে যাওয়া নিষিদ্ধের আরো বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন- রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেঁয়াজ খাবে সে যেন মসজিদে না আসে (মুসলিম-৫৬৭)। পেঁয়াজের গন্ধে মানুষের যে পরিমাণ কষ্ট তার চেয়ে এমন রোগীর দ্বারা আরো বহুগুণ বেশি কষ্ট পাবে। তাই আসা নিষিদ্ধ। সুস্থ কোনো ব্যক্তি যদি নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করে সে মসজিদে গেলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে তাহলে তার জন্য মসজিদে নামাজ পড়তে না যাওয়ার সুযোগ আছে। কেননা ইসলাম কারো ক্ষতি করাকে সমর্থন করে না এবং কাউকে বিপদে ফেলে দেয়াকেও সমর্থন করে না। 

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, তোমরা নিজেদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করো না (বাকারা-১৯৫)। তবে এই ওজরটা ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, যে এই আশঙ্কার কারণে বাজার, বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদিতে গমন করে না। পক্ষান্তরে যে বাজারে যাওয়া আসা করে এবং কোনো কিছু মনে করে না তার জন্য মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকা বৈধ হবে না।

মোটকথা হলো, সৌদি আরবের হাইয়াতু কিবারিল উলামা, আমেরিকার উলামায়ে কেরাম দ্বারা গঠিত শরীয়াহ বোর্ড লাজনাতুত দা’ইমাহসহ বিশ্বের কোনো উলামায়ে কেরামই জুমা কিংবা জামাত বন্ধ করার পক্ষে ফতোয়া দেননি। বরং করোনা ভাইরাস আক্রান্ত শহর, আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যাদের নিজেদের ব্যাপারে আশঙ্কা হবে তাদেরকে তাদের স্তর অনুযায়ী হুকুম দিয়েছেন। সুতরাং করোনা ভাইরাস জাতীয় কোনো মহামারীর দোহাই দিয়ে জুমা, জামাত বন্ধ করা যাবে না। ইরাকের সর্বোচ্চ ফতোয়া বোর্ড জুমা নিষিদ্ধের ফতোয়া দিয়ে তার সঙ্গে টিকা যুক্ত করে বলেছেন, ‘জুমার নামাজ একেবারে নিষিদ্ধ না করে তা সীমিত আকারে আদায়ের ব্যবস্থা করা যায়। যেমন প্রত্যেক মসজিদের খতীব, মুআজ্জিন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জুমার সালাত আদায় করবে। এর বাইরে কেউ শরীক হবে না।’ কাতারের এ ব্যাপারে পদক্ষেপ ছিলো খুবই চমৎকার। তারা জুমার নামাজের অনুমতি দিয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শ ছিলো সবাই বাড়ি থেকে ওজু করে আসা। সঙ্গে জায়নামায নিয়ে আসবে। সেখানকার কর্তৃপক্ষ মসজিদের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ওপরও খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। এর সঙ্গে যেসব মুসল্লির মাঝে করোনার উপসর্গ পাওয়া গেছে তাদের মসজিদে আসা নিষেধ করে দেয়া হয়। 

তকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহুর পরামর্শ :
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম মুফতি আল্লামা তাকি উসমানী দা.বা. ও এই ফতোয়া প্রদান করেছেন যে, সতর্কতার স্থানে সতর্কতা ঠিক আছে। তবে সতর্কতার অজুহাত দিয়ে মসজিদে জুমার নামাজ বা জামাতের সঙ্গে নামাজ বন্ধ করা যাবে না। কেননা সাহাবায়ে কেরামের যুগে কোনো মহামারী আসলে তারা কখনও জুমা, জামাত বন্ধ করতেন না। মুফতি তাকী উসমানী সাহেব দা.বা. আরো বলেছেন, ইমাম সাহেব জুমার খুতবাহ সংক্ষিপ্ত করবেন এবং ওয়াক্তিয়া নামাজে ছোট সূরা দিয়ে নামাজ আদায় করবেন। কিন্তু মসজিদ বন্ধ করা জুমা নিষিদ্ধ করা বৈধ নয়। বরং বেশি বেশি দোয়ার ইহতেমাম করা, আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং রোনাজারী করা যেন তিনি আমাদেরকে এই সমস্ত মহামারী থেকে হেফাজত করেন। আমিন।

জামাত ও আজানের মাঝে সময় কমিয়ে আনা :
আমাদের দেশে সাধারণত মাগরিবের নামাজ দ্রুত আদায় করা হয়। বাকি নামাজের ক্ষেত্রে পনের থেকে আধা ঘণ্টা বিলম্ব করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতেও আমরা পূর্বের সেই অবস্থা বহাল রাখা হয়েছে। অথচ বেশি সময়ের কারণে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই আরব বিশ্বসহ আমাদের দেশের প্রখ্যাত আলেমদের পরামর্শগুলো মেনে চলা কর্তব্য। নামাজ ও আজানের মাঝে সময়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা। নফল ও সুন্নত নামাজ মসজিদে নয় ঘরে পড়া। বর্তমানে কোনো কোনো ইমাম করোনা থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন দোয়া-আজকার মুসল্লিদের নিয়ে মসজিদে আদায় করছেন। এটাও অনুচিত। দোয়া-তেলাওয়াত এখন বাড়িতে একা একা করতে হবে।

জামাতে নামাজ আদায়কারীদের প্রতি আবেদন :
করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারো মাঝে রোগের আলামত দেখলেই সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাই কাতার থেকে যে ফতোয়া প্রকাশ হয়েছে, তাতে মুসল্লিদের মাঝে আতঙ্ক না ছড়াতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যেমন নামাজে এসে হাচি বা কাশি দেয়া।

করোনা সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় আইন মানার গুরুত্ব :
ইসলামের বিধান হচ্ছে, রাষ্ট্রের কোনো আইন যদি শরীয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয় তাহলে তা মানা সবার জন্য জরুরি। করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রনের জন্য সরকার যেসব আইন জারি করেছে নাগরিক হিসেবে তা মানা জরুরি। দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকেও তা মানা কম গুরুত্বের নয়। সরকারের নির্দেশ হচ্ছে, প্রত্যেক নাগরিক ঘরে অবস্থান করবে। কর্মস্থলে অবস্থান করবে। সেক্ষেত্রে যদি তা অমান্য করা হয় তাহলে রাষ্ট্রীয় আইন অমান্যের কারণে অপরাধী হবো। সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনী দিক থেকেও আমি গোনাহগার হবো। কারণ এ ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর নির্দেশ সুস্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘যখন তোমরা শুনবে কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তখন তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে না এবং যারা উক্ত এলাকায় আছে তারা সেখান থেকে বের হবে না (বুখারী-৩৪৭৩)।

ওজরের কারণে যারা জুমা বা জামাতে অংশগ্রহণ করবেন না তাদের করণীয় :
ওজরের কারণে জুমা বা জামাতে শরীক না হওয়ার অবকাশ যাদের আছে তারা নিজ ঘরে নামাজ আদায় করবেন। যদি আলাদা থাকার পরামর্শ না থাকে তাহলে পরিবারের লোকজনকে নিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করা। মনে রাখতে হবে মুসলমান হিসেবে আমাদের বিশ্বাস অটুট রাখতে হবে। মৃত্যুর মালিক আল্লাহ তায়ালা। তার নির্দেশ হিসেবেই আমরা সতর্কতা অবলম্বন করছি। তিনি চাইলে এত কিছুর পরও মৃত্যু দিতে পারেন। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]