বুধবার ● ৩ জুন ২০২০ ● ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ ● ১০ শওয়াল ১৪৪১
রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে পোকা তাড়াতে গমের বস্তায় পানি
ফয়সাল আহমেদ রাজশাহী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯, ৬:৫৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে পোকা তাড়াতে গমের বস্তায় পানি

রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে পোকা তাড়াতে গমের বস্তায় পানি

অনিয়ম-ই এখন নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে রাজশাহীর সদর খাদ্য গুদামে। খাদ্যের বস্তায় পোকা তাড়ানোর নাম করে পানি দিয়ে ওজন বাড়াচ্ছে গুদাম ইনচার্জ মাজেদুল। স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাজশাহী সদর এলএসডি কর্মকর্তা মোঃ মাজেদুল ইসলাম ঠান্ডা মাথায় চালিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক অনিয়ম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মচারী, লেবার ও স্থানীয়রা জানান, গত বুধবার বিকাল পাঁচ টায় রাজশাহী সদর এলএসডি অফিস ছুটির পর সকলে চলে যায়। সবাই যাবার পর রাজশাহী সদর এলএসডি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাজেদুল ইসলাম বহিরাগত দু’জন স্থানীয় ব্যক্তির সহায়তায় গুদামে সাবমার্জ ট্যাপের সাথে পানির পাইপ সংযোগ করে ৬ নং গুদামের খামালের উপর উঠে বস্তার মাঝ বরাবর পানি দিয়ে বস্তা ভেজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা অভিযোগ করে বলেন, বস্তাগুলো ছিলো গমের বস্তা এবং তাতে পানি দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ওজন বাড়ানো। তিনি প্রায় গোপনে স্থানীয় দুজনের সহায়তায় এসব অপকর্ম করে থাকেন।

রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামের কয়েকজন কর্মচারী জানান, খবরটি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ নাজমুল হক ভূইয়া জানতে পারেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামের কেমিষ্ট মোঃ মোমিনুল ইসলাম সমেত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারপর ৬ নং গুদামসহ অন্যান্য সকল গুদামে প্রবেশ করেন এবং ঘটনার সত্যতা নিরিক্ষণ করেন।

এলএসডি কর্মকর্তা মাজেদুলের উপস্থিতিতে বহিরাগত দ্বারা খামালে উঠে পানি দেওয়ার বিষয়ে কেমিষ্ট মোঃ মোমিনুল ইসলাম প্রথমে অস্বীকার করেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন তথ্য ও আলামতের প্রমাণ তুলে ধরায় সময়ের আলো প্রতিনিধির কাছে তিনি স্বীকার করেন ৬ নং গুদামে গমের বস্তায় তিনি পানি দিয়ে ভেজা দেখেন। তাতে কোনো প্রকার কীটনাশক ছিল না। সেই সাথে খামালের ভিতরে পানির উপস্থিতিও দেখতে পান বলে জানান কেমিস্ট মোমিনুল ইসলাম। বস্তায় বিষ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা সকাল বা দুপুরে রোদে রাখতে হয়। তারপর কুয়াশার মত বাষ্প আকারে বিষ ছিটাতে হয়। যেনো বস্তার খাদ্য শস্যে পোকা সহজে না আক্রমণ করে। ঘটনাটি করে তিনি ভুল কাজ করেছেন, অথবা জেনে বুঝে ভুল কাজ করেছেন।


খোজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বহিরাগত স্থানীয় দুই সহযোগী যথাক্রমে মোস্তফা ও মোঃ আশরাফ খাদ্য গুদামে আনাগোনা বেড়ে যায়। তার বিরুদ্ধে গুদাম থেকে খাদ্য শস্য চুরির অভিযোগও রয়েছে। আবার ডিও অনুযায়ী মালামাল সময় মতো ডেলিভারী না দেওয়ার অভিযোগ আছে বলে জানা যায়। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্তে¡ও ডিসি ফুড অফিসার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি।

এছাড়াও জানা যায় যে, নিয়ম অনুযায়ী একজন গুদাম কর্মকর্তাকে গুদাম এলাকার নিজ কোয়াটারে থাকতে হবে। এবং সকাল ৭-৮ টার মধ্যে লেবার দ্বারা গুদাম খুলে তার সঠিক পরিচর্যা করতে হবে। পোকা যেনো খাদ্যের বস্তায় না আক্রমণ করে সেজন্য দরজা খুলে বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা করতে হবে। বস্তার ধুলাবালি প্রতিনিয়ত জাড়– দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। নিয়মিত বিষ প্রদান করতে হবে বাষ্প আকারে স্প্রে করে। কিন্তু তিনি এসব নিয়মের কোনো টায় মানেন না। গুদামের কর্মচারীদের বলেন, তিনি থাকেন তার নিজ পিতৃ বাসায়। অফিসে আসেন এক আধ ঘন্টার জন্য। তারপর এই অফিস ঐ অফিসে যেতে হবে বলে প্রতিনিয়তই চলে যান। যাওয়ার সময় চাবিও সাথে নিয়ে যান। তিনি কাউকে বিশ্বাস করেন না। তার এমন অবহেলার কারণে গুদামের খামালে রাখা খাদ্য শস্যের বস্তায় প্রচন্ড পোকার প্রকোপ পরিলক্ষিত হয়।

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ০৩.০৩.২০১৯ ইং তারিখে উপ-পরিচালক (সংস্থাপন), খাদ্য অধিদপ্তরের মামুন আল মোর্শেদ চৌধুরী রাজশাহী সদর খাদ্য গুদাম পরিদর্শনে আসেন। পরিদর্শনকালে উক্ত এলএসডির এফএস-৩ এবং এফএস-৪ গুদামের অনেকগুলো খামালে কার্ড ঝুলানো পাননি। এছাড়াও বিভিন্ন খামালে ভাঙ্গা, এলোমেলো, নিম্নমানের খাদ্য, ফাঁকা এবং ময়লাযুক্ত অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে যান। এছাড়াও তিনি ডিও করা মাল সময় মতো না দেওয়ার অভিযোগ পান। গুদামে মজুদের তুলনায় কম খাদ্য উপস্থিতিও টেন পান। আবার, দাপ্তরিক খাতা কলমের সাথে গুদামের কোনো মেল পান নাই বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

উক্ত কারণে মাজেদুলকে অভিযুক্ত করা হয় এবং তার উপর তদন্ত করার নিমিত্তে ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয় (৩ মার্চ, ২০১৯)। কমিটিকে ৫ দিনের সময় দেওয়া হয়। ৫ দিনের কর্মদিবস অতিক্রম করলেও বিভিন্ন কারণ দর্শীয়ে উক্ত কমিটি তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে ব্যর্থ হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটির আহব্বায়ক উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নরোত্তম কুমার প্রামাণিক, কারিগরী খাদ্য পরিদর্শক আল সিহাবুল ইসলাম সদস্য ও খাদ্য পরিদর্শক বোয়ালিয়ার মির্জা জাকারিয়া আহমেদ সদস্যদের সাথে মাজেদুলের ভালো সম্পর্কে হওয়ায় তারা তদন্ত রিপোর্ট প্রদানে বিলম্বিত করেন।

এ বিষয়ে জানার জন্য রাজশাহী সদর এলএসডির কর্মকর্তা মোঃ মাজেদুল ইসলামের সাথে বহুবার সাক্ষাৎ ও ফোনালাপে কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গতকালের বস্তায় পানি দেওয়ার ঘটনাটি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ নাজমুল হক ভূঁইয়া স্বীকার করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিষয়টি শোনার পর পরই আমি ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যায়। অভিযোগ আসে তিনি বহিরাগতকে দ্বারা বস্তায় পানি দিয়ে প্রায় ৫ টন ওজন বাড়িয়েছেন। কিন্তু আমি সেখানে তেমন সত্যতা পায়নি। আমি ৩-৪ টা বস্তা ভেজা অবস্থায় পেয়েছি এবং ঘটনাস্থলেই তাকে প্রচন্ড কড়াভাবে বকাবকি করেছি। মাজেদুল যেটা করেছে তা নিয়মের বাইরে কাজটি করেছে। যদিও এই বিষয়ে এখন পযর্ন্ত আমি কোনো এ্যাকশন নেই নি। আমি আপাতত ছুটি নিয়েছি কয়েকদিনের জন্য। ছুটি শেষে এবিষয়ে ব্যবস্থা নিব।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »




আরও সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]