এডিটর
বৃহঃস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ ১৩ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

অগ্নিগর্ভ সিরিয়া : শান্তিপূর্ণ বিশ্বই প্রত্যাশিত

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া বেশ কিছুকাল থেকেই উত্তপ্ত। এককথায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যই বেশ কয়েক দশক ধরে কখনো ধারাবাহিক কখনো থেমে থেকে একের পর এক যুদ্ধ ও সংঘাতে জড়িয়ে আছে। আর এতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে ইউরোপ ও আমেরিকা। এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই বর্তমানে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যেভাবে একযোগে মিসাইল হামলা চালিয়েছে তা জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু জাতিসংঘ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে সেই ক্ষমতাও সংস্থাটির নেই। এদিকে সারা দুনিয়াও এ বিষয়ে চুপ। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশও এই হামলাকে সমর্থন জুগিয়েছে। আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেন এই ত্রয়ী শক্তি সম্মিলন এখন এমন এক অবস্থানে উপনীত হয়েছে যে, তাতে করে যে কোনো সময় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

কেননা, বিশ্ব সামরিক মঞ্চে রাশিয়ার কোনো শক্তিশালী মিত্র না থাকলেও দেশটির যে সামরিক শক্তি মজুদ আছে তাতে করে তারা এককভাবে বিশ্বের সব ঐক্যবদ্ধ সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম। আর তারা সেরকম হুমকিও দিয়ে রেখেছে আমেরিকাকে ইতোমধ্যে। আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিনি তবে ওই যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। কাজেই তাদের এ ধরনের সামরিক দম্ভ বিশ্বের শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর জন্য অনাকাক্সিক্ষত এবং নিন্দনীয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ওই তিন দেশ তাদের হামলার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য, অন্য কিছু নয়। যদিও রাসায়নিক অস্ত্র থাকার কথা সিরিয়া অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী প্রতিশোধ হিসেবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা যায় না। আর এ কারণেই ১৯৯৮ সালে সুদানের কথিত একটি রাসায়নিক অস্ত্র কারখানায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দিলে জাতিসংঘ তার নিন্দা করেছিল। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এমন অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পরে প্রমাণ হয়, ইরাকে এ ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্রই ছিল না। এ জন্য তৎকালীন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ ওই যুদ্ধে প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি ইরাক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। পরাজিত সাদ্দাম হোসেনকে প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়। কাজেই সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে আমরা বলতে চাই, সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র থাকার অভিযোগও প্রমাণিত নয়। এ নিয়ে এরই মধ্যে অর্গানাইজেশন ফর দি প্রহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপন্স তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

কাজেই তদন্ত চলাকালে এই মিসাইল হামলা কিছুতেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তদন্তে সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রসম্ভার আছে বলে প্রমাণিত হয়। মিসাইল হামলার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইট বার্তায় বলেছেন, ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড, আমরা জিতেছি।’ এটা তার আত্মম্ভরিতা ছাড়া কিছুই নয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সে সময়ের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশও সামরিক অভিযানের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু দেড় দশক পরও ইরাক অশান্ত। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের অবসান তো ঘটেইনি, বরং ডোনান্ড ট্রাম্প তাদের দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে চাইছেন। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আইপিইউ সম্মেলনে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে পাস হয়েছিল যে কোনো বড় দেশ ছোট দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পারবে না। তাতে রাশিয়া, চীন ও ভারতের মতো বড় দেশসহ অনেক দেশ সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব বিষয়ে আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেন যেভাবে নাক গলিয়ে চলেছে তাতে করে বিশ্বের ছোট দেশগুলো নিজ সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা নিয়ে থাকতে পারবে কিনা সংশয়।

আমরা এহেন অস্ত্র প্রতিযোগিতামূলক সংঘাতকে শান্তিপ্রিয় বিশ্বের জন্য হুমকি বলে মনে করি। সিরিয়া আন্তর্জাতিক আইন-কানুন লঙ্ঘন করে চললে এবং নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করলে, তা দেখার জন্য তো জাতিসংঘই যথেষ্ট। সেখানে আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন কেন? তাছাড়া কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় জাতিসংঘ অনুমোদনেরও প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এখানে অনুমোদন বিষয়ে দেখা গেল যে, এতে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন এসবের থোরাই কেয়ার করে। সামরিক শক্তি হিসেবে তাদের শক্তিমত্তা অনস্বীকার্য। কিন্তু এটা যেন বিশ্বকে শান্তিপূর্ণ রাখায় ব্যবহৃত হয় সেটাই প্রত্যাশিত। অবশ্যই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে নয়।