খেলার মাঠে

মাশরাফির কারণেই হেরেছে বাংলাদেশ!

::ক্রীড়া প্রতিবেদক::

শিরোনাম দেখেই আঁতকে উঠার কোনো কারণ নেই। এটাই সত্যি, অভিমানী মাশরাফি বিন মর্তুজা না থাকাতেই, মাঠে তার সরব উপস্থিতির অভাবেই ফাইনালে হেরেছে বাংলাদেশ, জিতেছে ভারত। শেষ বলে ভারতের দরকার ৫। মানে ছক্কা হাঁকাতে হবে। অনিয়মিত বোলার সৌম্য সরকার, বেচারা! বলাটও দিলেন যেন ছক্কা মারার মতো! অভিজ্ঞ দীনেশ কার্তিক অনায়াসে সেটা ছক্কা হাঁকিয়ে বাংলাদেশের অতি নাগালে থাকা ম্যাচটা কেড়ে নিয়ে গেলেন। ভারতের কাছে আবারও বেদনার হার, ৪ উইকেটে।

কার্তিক ছক্কা হাঁকানোর সঙ্গে সঙ্গেই সাকিব-সৌম্যরা মাঠে বসেন পড়েন চরম হতাশায়, চোখে জল। কঠিন পরিস্থিতি জয় করে জয়ের এতকাছে এসেও হলো না! এবারও হলো না। এবারের না হওয়াটা আরো কষ্টের।

ভারত যেন বিশ্বকাপ জয় করে ফেলেছে। প্রেসবক্সে সাংবাদিকদের চিৎকার। গ্যালারিতে উৎসব। ভারতীয় দল প্রদক্ষীণ করলো পুরো মাঠ। এটা যে তাদের স্মরণীয় জয়ের একটা। আর বাংলাদেশের জন্য আরেকটা ক্ষত।

তবে একটা কথা না বললেই নয়, সময়মতো অধিনায়ক সাকিবের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে গ্রহণ করতে পারার ব্যর্থতা বারবার ফুটে উঠেছে। সৌম্যকে দিয়ে শেষ ওভার না করিয়ে তিনি মাহমুদ উল্লাহর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালেন না। ১৯ তম ওভারেই এক প্রকার শেষ হয়ে যায় ম্যাচ। রুবেল হোসেনের ২২ রান খরচ করা ওভারের প্রথম দুই বলেই যখন ১০ রান চলে আসলো তখন কেন সাকিব তাকে বুঝাতে গেলেন না? টাইগার ক্রিকেটের মহানায়ক মাশরাফি মাঠে থাকলেই হয়ে যেত। তিনি প্রতিটি বল করার আগেই বোলারকে পরামর্শ
দিতেন, উৎসাহ যোগাতেন। সাকিবের কাছ থেকে এই বিষয়টা তেমনভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। তাই মনে হয়েছে, একজন মাশরাফি থাকলেই আজ জিতে যেত বাংলাদেশ।

ভারতের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের সামনে এবং ব্যাটিং প্যারাডাইসে ১৬৭ রান ভারতের জন্য ছোট স্কোরই মনে করা হয়েছিল। বাংলাদেশের দরকার ছিল দুর্দান্ত শুরুর। আজও প্রথম ওভার নিজে তুলে নেন সাকিব। দেন ৭ রান। কিন্তু দ্বিতীয় ওভার করতে এসে সর্বনাশ করে ফেলেন মিরাজ। দুর্বল বল পেয়ে চড়াও হন রোহিত। এই এক ওভার থেকেই নেন ১৭ রান।

তবে এর পরের দুই ওভার ছিল অন্যরকম। দুই ওভারে ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচে দারুণ উত্তেজনা আনেন সাকিব ও রুবেল। প্রথমে ১০ রানে শেখর ধাওয়নকে বিদায় করেন সাকিব। পরের ওভারে রুবেলের শিকার হন সুরেশ রায়না, ০ রানে। ভারতের রান তখন ৩২, ৩.৩ ওভারে। মানে ম্যাচে পুরো উত্তেজনা।

দরকার ছিল পরপর আরো দুই এক উইকেট। কিন্তু সেটা হতে দেননি ওপেনার রোহিত শর্মা ও লোকেশ রাহুল। ধীরে ধীরৈ ম্যাচ বাংলাদেশের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে থাকেন তারা। মাত্র ১৪ বলে ২৪ রান করে রুবেলের বলে যখন লোকেশ রাহুল বিদায় নেন, তখন ভারতের রান ৮৩, ৯.৩ ওভারে।

রোহিত শর্মা যেভাবে ব্যাট করছিলেন তাতে ম্যাচ কত আগে শেষ হবে, এই হিসেব করা শুরু করে দিয়েছিলেন অনেকে। তবে ৪২ বলে ৫৬ করার পর অপুর বলে রোহিত আউট হলে আশার সঞ্চার হয় আবার।

আবারও একই কথা লিখতে হয়। এ পর্যায়ে দরকার ছিল একটা দুইটা উইকেট। কিন্তু মানিস পান্ডে বড় বাঁধা দাঁড়ান। সঙ্গী পান বিজয় সরকারকে। শেষ তিন ওভারে ভারতের দরকার পড়ে ৩৫ রান।

১৮তম ওভার করতে এসে ম্যাজিক দেখান মোস্তাফিজ। ওভারে মাত্র এক রান দিয়ে বিদায় করেন পাল্ডেকে (২৮ রান)। শেষ দুই ওভারে ভারতের দরকার ছিল ৩৪ রান। ম্যাচ তখন নাটকীয়ভাবে বাংলাদেশের পক্ষে।

কিন্তু সর্বনাশ করে দেন রুবেল। ২২ রান দিয়ে বাংলাদেশের জয় অনেকটা হাতছাড়া করে দেন এ পেসার। দুর্বল বল পেয়ে প্রথম তিন বলে ১৬ রান নিয়ে নেন দীনেশ কার্তিক। চতুর্থ বলে দুই রান, পঞ্চম বলে কোনো রান না হলেও শেষ বলে চার। কঠিন সমীকরণ থেকে সহজ সমীকরণে চলে আসে ভারত।

শেষ ওভারে ভারতের চাই ১২ রান। কিন্তু মোস্তাফিজদের ৪ ওভারের কোটা শেষ হওযায় কঠিন এ দায়িত্ব বর্তায় অনিয়মিত বোলার সৌম্য সরকারের উপর।

প্রথম বল দিলেন ওয়াইড, পরের বলে রান হলো না।এরপরের বলে এক রান। শেষ চার বলে দরকার ১০ রান। তৃতীয় বলে হলো এক রান। পরের বলে চার। তবে পঞ্চম বলে বিজয় ফিরে গেলে আবার চরম নাটক। শেষ বলে দরকার ৫ রানে। মানে ছ্ক্কা মারতে হবে ভারতকে জিততে হলে। বাংলাদেশকে হতাশ করে সেটাই করলেন অভিজ্ঞ দীনেশ কার্তিক।

২০১৬ সালে ব্যাঙ্গালোরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেই বেদনায়দায়ক হারের পূণরাবৃত্তি। আবার কষ্টের হার। জয়ের দ্বারপ্রন্তে এসেও বেদনার হার। ৭ বলে ২৯ রানের সর্বানাশা ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন দীনেশ কার্তিক। রুবেল ২ উইকেট নেন। মিরাজ ছাড়া অন্য সবাই পান একটি করে উইকেট।

এর আগে প্রথম দিকের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশ সাকুল্যে ১৬৬ রান তুলে, ৮ উইকেটে। রাজার মতো খেলেছেন।কিন্তু অন্যদের ব্যর্থতায় স্কোরটা বড় করতে পারেননি। রিয়াদ, সাকিবের মতো ব্যাটসম্যানরা হন রান আউট। নইলে আরো গোটা বিশেক রান হয়তো আসতো। ৫০ বলে ৭৭ রান এসেছে সাব্বিরের ব্যাট থেকে।

টসে জিতে প্রথমে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠাতে দুবার চিন্তা করেননি রোহিত শর্মা। পেসার জয়দেব উনাদকাটের প্রথম ওভার থেকে ৯ রান নেন তামিম- লিটন। যথারীতি দ্বিতীয় ওভার বল করতে আসেন স্পিনার ওয়াশিংটন সুন্দর। কিন্তু আগের দুই ম্যাচের মতো এদিনও সুন্দরের বলে অস্বস্তিতে পড়েন লিটনরা।কেনোমত ৪ রান আসে এ ওভার থেকে।

বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিলেন দুই স্পিনার সুন্দর ও চাহাল। সেই চ্যালেঞ্জ আজও নিতে পারলেন না বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। প্রথমে ১১ রানে সুন্দরের বল ঠিকমত খেলতে না পেরে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন লিটন। এর কিছু পরে চাহালকে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ঠিক সীমান্তের উপর থেকে তামিমকে দর্শনীয় ক্যাচে ফেরান শার্দুল ঠাকুর।

সৌম্য টানা ব্যর্থ। দলের বোঝা হয়ে ওঠেছেন রীতিমত। দলের কঠিন সময়কে আরো কঠিন করে গেলেন মাত্র ১ রান করে। ৫ ওভারে ৩ উইকেটে ৩৩ রান। ভয়ানক শুরু। ৬ ওভারের পাওয়ার প্লেতে আসে মাত্র ৪০ রান। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বাজে শুরু।

গত চার ম্যাচেই রান পেয়েছেন মুশফিক। আজও দায়িত্ব এসে গেল তার কাঁধে। ইনিংস গড়ার, জলদি রান তোলার। সঙ্গে সাব্বির। কিন্তু আজ আর হলো না। ১২ বলে ৯ রান করে তাকে ফেরান স্পিনার চাহাল। ১০.১ ওভার শেষে বাংলাদেশের রান ৪ উইকেটে ৬৮।

কতদূর আর যাওয়া যাবে এই অবস্থায়? লড়াই করে যাচ্ছিলেন সাব্বির। সঙ্গে যোগ দেন গত ম্যচের জয়ের নায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। বেশ ভালো খেলছিলেন এ জুটি। দ্রুত রান করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এক রান নিতে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝিতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে রান আউট হয়ে যান রিয়াদ। তার আগে করেন ১৬ বলে ২১ রান।

ওদিকে মাঠের ও মাঠের বাইরের নানা চাপের মধ্যেও ৩৭ বলে হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন সাব্বির রহমান। হাফ সেঞ্চুরি করার পর আরো বেশি হাত খুলে খেলছিলেন সাব্বির। সাকিব আল হাসান উইকেটে থাকলে ভালো কিছু রান হতে পারত। কিন্তু আবারও রান আউটের শিকার হতে হলো দলকে। এবার রান আউট সাকিব। এক রান নিতে গিয়ে জীবন দেন সাকিব। করেন ৭ বলে ৭। এরপর ৫০ বলে ৭৭ করে সাব্বির আউট হলে পুরো ২০ ওভারই দায় হয়ে পড়ে। তবুও মিরাজের ৯ বলে ১৯ রানের সুবাদে শেষমেশ বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ১৬৬ রান, ৮ উইকেটে ।

মাত্র ১৮ রানে ৩ শুরুর দিকে গুরুত্বপূর্ণ তিন উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভেঙে দেন স্পিনার চাহাল। পেসার উনাদকাট ৩৩ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন। চার ওভারে মাত্র ২০ রান দিয়ে এক উইকেট নেন স্পিনার সুন্দর।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ফল: চার উইকেটে জয়ী ভারত।

বাংলাদেশ ইনিংস: ১৬৬/৮ (২০ ওভার)

(তামিম ইকবাল ১৫, লিটন দাস ১১, সাব্বির রহমান ৭৭, সৌম্য সরকার ১, মুশফিকুর রহিম ৯, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২১, সাকিব আল হাসান ৭, মেহেদী হাসান মিরাজ ১৯*, রুবেল হোসেন ০, মোস্তাফিজুর রহমান ০*; জয়দেব উনাদকাত ২/৩৩, ওয়াশিংটন সুন্দর ১/২০, যুজবেন্দ্র চাহাল ৩/১৮, শারদুল ঠাকুর ০/৪৫, বিজয় শঙ্কর ০/৪৮)।

ভারত ইনিংস: ১৬৮/৬ (২০ ওভার)

(রোহিত শর্মা ৫৬, শিখর ধাওয়ান ১০, সুরেশ রায়না ০, লোকেশ রাহুল ২৪, মনিশ পান্ডে ২৮, বিজয় শঙ্কর ১৭, দিনেশ কার্তিক ২৯*, ওয়াশিংটন সুন্দর ০*; সাকিব আল হাসান ১/২৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ০/১৭, রুবেল হোসেন ২/২৫, নাজমুল ইসলাম অপু ১/৩২, মোস্তাফিজুর রহমান ১/২১, সৌম্য সরকার ১/৩৩)।

প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: দিনেশ কার্তিক (ভারত)।

প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ: ওয়াশিংটন সুন্দর (ভারত)।

Spread the love
  • 286
    Shares

খেলার মাঠে | আরো খবর