ফেসবুকের দেয়ালজুড়ে মাহবুবুল হক শাকিল

:: ভোরের পাতা অনলাইন ::

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের মৃত্যুর পর থেকে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাকে নিয়ে নানা ধরণের আবেগ, অনুভূতি, স্মৃতিচারণ করছেন তার বন্ধু, সহকর্মী, নেতাকর্মীরা। এমনকি শাকিলের সঙ্গে অনেকের তোলা ছবিও পোস্ট করছেন। শুধু দেশে নয়, প্রবাসীরা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ফেসবুকে।

অজয় দাশগুপ্ত, সিডনি প্রবাসী, কলামিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষক লিখেছিলেন, মৃতদের কান্নার কোনো শব্দ নেই। কবরের কোনো ভাষা নেই। আমাদের নির্বাক করে কোথায় গেলেন মাহবুবুল হক শাকিল? এ কোন ধরনের যাওয়া?

মাহবুবুল হক শাকিলের সহকর্মী ও প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‌‌‌‘বিজয়ের মাসে আমার সারাজীবনের শোক। দীর্ঘ ১৯ বছরের সুখ দুঃখের ভাই যেখানেই থাকেন ভালো থাকেন..। এছাড়া মাহবুবুল হক শাকিলকে আবেগী রাজকুমার উল্লেখ করে তার সঙ্গে নিজের ছবি এবং শাকিলের কবরের ছবিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন।

শফি আহমেদ ভাই লিখেছেন ‘কে সেই আস্থাভাজন, কে সেই নিরব হন্তারক’ যার কথা লিখে রেখেছিলেন প্রয়াত শাকিল ভাই। আসলেই খুঁজে বের করা দরকার। এটা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা সেটাও ভাবা দরকার যেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসারা তাকে দিনে দিনে ক্ষমতাহীন করেছে। প্রধানমন্ত্রী অফিসে পীর-মুরিদগণকে সব একমুখী করা হয়েছিল। সকল লবি আর ক্ষমতার কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল নতুন প্রভাবে। দিনে দিনে নানাভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠাটা ভদ্রলোক মেনে নিতে পারেননি বলেই হয়তো লিখেছিলেন, খুব কাছের আর আস্থাভাজনরাই তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। কাউকে সরাসরি হত্যা না করলেও, আত্মহত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করাটাও একটা হত্যার সমান অপরাধ। মিথ্যাও হতে পারে এ সন্দেহ, সেটাই হোক, কামনা করি।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আল আমিন ছাত্রলীগ নিয়ে মাহবুবুল হক শাকিলের ভাবনা প্রকাশ করেছেন। যা হচ্ছে-‘মাঝে মধ্যে ভাবি ছাত্রলীগ জীবনের কত কিছুই না কেড়ে নিয়েছে, পরঃক্ষণে ভাবি, ছাত্রলীগ যা নিয়েছে, দিয়েছে তার চেয়েও বেশি। -মাহবুবুল হক শাকিল ভাই।’

সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনি লিখেছিলেন, শাকিলের জন্য মন খারাপ! মাহবুবুল হক শাকিলের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ঢাকা ক্লাবে। বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামের একটি অনুষ্ঠান থেকে আমি যখন বের হচ্ছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে ও ঢুকছিল। দেখা হতেই দুহাত চেপে ধরে বলল, কিছু দরকার নেই শুধু লিখে যাও, লেখকরা কোনোদিন মরে না। শাকিল শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সতীর্থ এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন না, আমরা একই হলের আবাসিক ছাত্র এবং পাশাপাশি রুমের বাসিন্দা ছিলাম।

ব্যক্তিগত জীবনে শাকিল ছিল প্রচণ্ড অভিমানী এবং লাজুক প্রকৃতির। তিনি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেন না, অন্যদিকে কেউ যদি তাকে মুখের ওপর কটুবাক্যে জর্জরিত করত সেক্ষেত্রেও শাকিল সর্বোতভাবে চেষ্টা করতেন হাসিমুখে মেনে নেওয়ার জন্য। দাম্পত্য জীবনের ছোটখাটো সমস্যা, অভিমানী মনের না পাওয়ার বেদনা এবং সুখস্বপ্ন নিয়ে সীমাহীন সংকোচ ও দ্বিধার বেদনা থেকে তিনি কবিতা লিখতেন। তিনি যতটা না লিখতেন তার চেয়েও বেশি ভাবতেন। যতটা না প্রকাশ্যে নিজেকে উপস্থাপন করতেন, তার চেয়েও বড় বড় সৌধ নির্মাণ করতেন মনের গহীন অরণ্যে। শাকিলের আকস্মিক মৃত্যুতে খুব কষ্ট পেয়েছি। সারাটা রাত বেদনাহত হয়ে নির্ঘুম কাটিয়েছি। তার বিদেহী আত্মার জন্য শুভকামনা এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা।

ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আফরিন নুসরাত মিশা তার ফেসবুক ওয়ালের কভার পিকে মাহবুবুল হক শাকিলের ছবি ব্যবহার করেছেন। শাকিলে মৃত্যুতে নিজের স্ট্যাটাসে লিখেছেন, I am really shocked!

ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি হাসানুর রহমান হাসু তার ফেসবুকের কভার পিকে মাহবুবুল হক শাকিলের ছবি ব্যবহার করেছেন। এছাড়া তিনি সর্বশেষ বইমেলাতে শাকিলের হাত থেকে নেয়া একটি কবিতার বই উপহার নেয়ার ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না কোন ভাবেই, অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে গেল। ভাল থাকবেন শাকিল ভাই না ফেরার দেশে।তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শরিফুজ্জামান শরিফ লিখেছিলেন, আমি কাঁদছি শাকিল ভাই। একই হলে ছিল আমাদের বসবাস। আপনি ২১০ নম্বর রুমে। আমি প্রথমে ১০৮ পরে ৪০৪ স্যার এএফ রহমান হল। আমরা ভিন্ন রাজনীতি করতাম। তারপরেও কত স্নেহ, খুনসুটি, হলের ছাদে রাত জেগে তুমুল আড্ডা। বয়সে বড় হলেও আপনি আমাদের বন্ধু ছিলেন।

সুইজারল্যান্ড প্রবাসী ব্লগার অমি রহমান পিয়াল নিজের ফেসবুক প্রোফাইল পিকচারই পরিবর্তন করেছেন। মাহবুবুল হক শাকিলের শেষ কবিতা আর কালো ব্যানারে শোকার্ত ছবিটি অনেকে শেয়ার করেছেন এবং আবেগময় মন্তব্য করেছেন।

সাংবাদিক অমি রহমান পিয়াল লিখেছিলেন, প্রিয় শাকিল কথাগুলো আমি ঠাট্টার ছলে নিয়েছিলাম। দুহাতের মুঠোয় আমার ডান তালুটা আকড়ে ধরে বলেছিলে ‘আমি মারা গেলে আমার জন্য একটা অবিচুয়ারি লিখবা পিয়াল ভাই?’ হাসতে হাসতে বলেছিলাম, ‘আচ্ছা, কিন্তু সিনিয়রিটিতে তো আমার আগে মরার কথা। আমারটা কে লিখবে!’ কখনো ভাবিনি সেই প্রতিশ্রুতির দায়শোধের তাড়াটা এত দ্রুত আসবে। সকালে ক্লাসের মধ্যে ফোনে তোমার খবরটা এলো। তারপর থেকে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আছে। চারপাশ এবং কি বোর্ডের অক্ষরগুলো। মা ছাড়া শেষ কবে কার জন্য এত কেঁদেছি স্মরণ নেই। সারাটা ক্ষণ তোমার স্মৃতিগুলো অবিচুয়ারির অক্ষর হয়ে সামনে এসে স্মরণ করায়। আর সব ঝাপসা হয়ে যায়।

কিন্তু কি লিখব তোমাকে নিয়ে? কাউকে বিব্রত না করে কতটুকু লিখলে সৎভাবে আমি চেনাতে পারব তোমার সত্ত্বাটাকে। সেই সত্ত্বাটুকু যা রাজনৈতিক নয়। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী নয়, শুধুই মাহবুবুল হক শাকিল। যে কবি, সম্প্রতি ছোটগল্পেও অনবদ্য হয়েছে। পুরনো দিনের সিনেমার গানে গজলে যার অনুরাগ এবং যে উদাসী এক প্রেমিক কৈফ মজনুনকে ধারণ করে পদ্য লিখে যায় হাতছাড়া প্রেয়সী বিহনে। খৈয়ামী মৌতাতে কখনো কেঁদে যায়। কতটা স্পর্শকাতর কতটা সংবেদন নিয়ে তোমার যাপিত জীবন তা কয়জনে জানে?

তুমি চাইলে আমাকে কোটিপতি করে দিতে পারতে। হ্যাঁ তোমার আমার সম্পর্কের গাঢ়তায় কত যে সুপারিশ প্রতিদিন আসত, ব্যবসায়িক। সেগুলো যদি করে দিতে, গাড়ি বাড়ি কোনোটারই অভাব হতো না আমার। বলিইনি তো কোনোদিন কিছু। নিজের জন্যও না। এজন্যই বলতে, ‘পিয়াল ভাই তোমারে যে দিনে রাতে ত্যক্ত করি, তার কারণ একটাই। তুমি আমার কাছে ধান্দা করতে আসো না।’ আসলেই তাই। ‘পিয়াল ভাই কই আছো, কতক্ষণ লাগবে তোমার আসতে?

একটা সিএনজি নিয়া চলে আসো।’ সেই ডাক উপেক্ষা করার সাহস আমার কোনোকালেই ছিল না। আমরা কবিতা নিয়ে কথা বলতাম। গান নিয়ে কথা বলতাম। কখনো পাল্টাপাল্টি কবিতার সুপারিশ হতো। তবে সবচেয়ে বড় অর্জন বঙ্গবন্ধুর অপ্রকাশিত ডায়েরিটা আমাকে তুমি পড়িয়েছিলে। অপ্রকাশিত আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে এটার এডিট চলছিল। বঙ্গবন্ধুর নানা ঘটনা আমরা উচ্চারণ করে পড়ছিলাম। এর মাঝেই তোমার কান্না। এত্তো আবেগী, এত্তো সংক্রামক সে কান্না।

বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার প্রতি তোমার আনুগত্য এবং ভালোবাসা নিয়ে নতুন কিছু না বলি। এতো সবাই জানে। কিন্তু কয়জন জানে শাহবাগের গণজাগরণে তোমার ভূমিকার কথা! কীভাবে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছিলে গোটা আন্দোলন, নেপথ্যে থেকে, কয়জন জানে সে কথা? কয়জন বলে সে কথা? আমি স্বাক্ষী, আমি জানি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বলে যাব সে কথা। গত মাসে আমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর পর ফোনে বলেছিলে, আর রাজনীতি করব না পিয়াল ভাই, কিন্তু আপারে তো ছাড়তে পারব না।

জবাবে বলেছিলাম, তিনিও তোমারে ছাড়বেন না। রাজনীতির যে অংশটুকু বিবেকে বাধে, উপেক্ষা করো, নোংরামিটুকু এড়িয়ে চলো, লেখায় থাকো। তার কিছুদিন আগে আমাকে শুনিয়েছিলে তোমার নতুন গল্পের প্লট। ‘রেখো মা দাসেরে মনে’, আমাকে মাথায় রেখে গল্পটা লিখেছিলে। বলেছ, পিয়াল ভাই, বিদেশ তোমার জায়গা না, দেশে তোমারে ফিরতেই হবে। জানি তোমার সইবে না।’

নানা ঘটনা, নানা স্মৃতি মনে আসছে। সেসব লিখতে পারছি না। কিছু ব্যক্তিগত ব্যাপার জনতার জন্য নয়। সেগুলো ব্যক্তিগতই থাক। আসলে কিছুই লিখতে পারছি না। এটুকু লিখেছি বার কয়েকের চেষ্টায়। তারপরও মনে হয় কিছুই লিখিনি। আসলে যদি লিখি সেটা মহাকাব্য হয়ে যাবে, ফুরাবে না তাও অনেক না বলা কথাও আড়ালে রয়ে যাবে। তুমি আমাকে পড়তে পারতে। সমস্যা না বললেও তোমার অজানা থাকত না কিছুই। রাজকন্যার জন্য প্রগাঢ় ভালোবাসাও কখনো লুকাওনি তুমি। মা মারা যাওয়ার পর ভোর রাতে ছুটে এসে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলে যাতে কোনোকিছুতেই না ঠেকি।

তোমার কাছে অনেক ঋণ আমার শাকিল। সেই দেনা শোধ করার উপায় তুমি রাখোনি। তোমার জন্য শোকগাথার দায়টাও শোধাতে পারলাম না। কারণ তোমাকে নিয়ে কিছু লেখার সাধ্য আমি রাখি না ভাই। শুধু বলি, যার উপেক্ষায় অভিমানে অগস্ত্য যাত্রায় অকালে নাম লেখালে, তোমার বিদেহী ভালোবাসায় সে জ্বলবে আজনম। এটা অভিশাপ নয়, এটাই নিয়তি। ভালো থেকো কৈফ মজনুন…

 

ভোরের পাতা/ডিএইচ