জনস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর ওষুধ : ক্ষতিপূরণ কেন নয়?

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

যে ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষার্থে আবিষ্কার ও উৎপাদন হয়, সে ওষুধ যদি হয় মানুষের প্রাণসংহারী তাহলে মানুষের দাঁড়ানোর জায়গাটা থাকলো কোথায়, ভাবা যায়! দেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর বিষয়টি জানলেও আমরা দেখেছি যে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বরাবরই তারা অক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। অবশেষে সেসব ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জয়ী হলো মানুষেরই জীবন। জীবন বাঁচাতে কেবল মানসম্পন্ন ওষুধের ওপরই ওপর ভরসা করা যায়। গত সোমবার এক যুগান্তকারী রায় দিল হাইকোর্ট। এর মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়নে মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ ২০ কোম্পানির সব ধরনের ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধ থাকছে। উন্নত বিশ্বে অবশ্য যখন কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয় তখন দেখা যায় সে সব কোম্পানিকে গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণও দিতে হয়। তারপরও বিজ্ঞ আদালত যে রায় দিয়েছেন তা এ দেশের ইতিহাসে একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কেননা, এ দেশে অনেক বছর ধরেই যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছিল এমন সব ওষুধ কোম্পানি যে, তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) নীতিমালা অনুসরণ করে কিনা, কিংবা ওষুধ উৎপাদনে তাদের সেই লাইসেন্স আছে কিনা, তা চ্যালেঞ্জ করার কোনো মাধ্যম ছিল না। ফলে বিনা চ্যালেঞ্জেই কিছু অসাধু কোম্পানি ইচ্ছেমতো ওষুধ উৎপাদন করে আসছিল। এরপর বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পরও ওই আনচ্যালেঞ্জিং কোম্পানিগুলো তাদের জীবনঘাতী ওষুধ উৎপাদন করেই আসছিল। অধিক মুনাফা তাদের নীতিবোধকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, মানুষের জন্য হিতে বিপরীত হয় এমন ওষুধ প্রাণঘাতীও হতে পারে, এ নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ ছিল না। ফলে জিএমপি নীতিমালা অনুসরণ না করা মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ হওয়া ২০টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক (ননপেনিসিলিন, পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন) উৎপাদন বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে গত বছরের ৫ জুন হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ রিটটি করেন। রিটে বলা হয়, সংসদীয় কমিটির বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি ২০টি কোম্পানির সব ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধের সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এর পরে ওই রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারির পাশাপাশি ৩৪টি কোম্পানির ওষুধ উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু এরপরও হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে ৩৪টি কোম্পানির ওষুধ বাজারজাত অব্যাহত থাকে।

এবারেও ওষুধ প্রশাসন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মানহীন ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহারে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ অবস্থায় গত বছরের ২৮ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে ‘মানহীন ৩৪ কোম্পানির ওষুধ এখনও বাজারে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরে প্রতিবেদন যুক্ত করে একই বছরের ৩১ জুলাই হাইকোর্ট একটি সম্পূরক আবেদন করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে রায়টি দেন। যেহেতু হাইকোর্ট ৩৪ ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে তার রায় বহাল রেখেছেন, কাজেই এখন আমরা প্রত্যাশা করবো দেশের ওষুধ প্রশাসন এটি কার্যকর করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। যে ওষুধ মানুষের জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং যা ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় সেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে দেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর নীরব থাকবে তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

দেশের যারা সচেতন নাগরিক তারা হয়তো মানসম্পন্ন কোম্পানির ওষুধ দেখেই তা ক্রয় করবেন। তারা যে সব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন তারাও নিশ্চয় ওই মানসম্পন্ন কোম্পানির ওষুধই তাদের ব্যবস্থাপত্রে লিখে থাকেন। কিন্তু দেশের যারা স্বল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর বা স্বল্প আয়ের মানুষ তারা তো না বুঝেই ওই মানহীন কোম্পানির ওষুধ গ্রহণ করেন। তারা যাবে কোথায়? উন্নত বিশ্ব হলে আজ অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য মামলা হয়ে যেত এবং কোম্পানিগুলোকে তাই গুনতে হতো। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আবদ্ধ না থেকে বরং উল্লিখিত কোম্পানির ওষুধ বাজারজাতকরণ বন্ধ করতে দৃঢ়তার পরিচয় দেবে, সেটাই প্রত্যাশিত।