শিক্ষার্থীদের ওপরই কি বাসের আক্রোশ!

  • ২৬-মার্চ-২০১৯ ০৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Ads

সব বাস কোম্পানিকেই শিক্ষার্থীদের কাছে অর্ধেক ভাড়া নিতে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে: ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া, চেয়ারম্যান, বিআরটিসি

:: আরিফুর রহমান ::

রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) এক শিক্ষার্থীকে বাস থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গতকাল রোববার সিলেট ছিল বিক্ষোভে উত্তাল। শনিবার বিকেলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুর বাসস্ট্যান্ডে ভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে বাস থেকে আফনানকে গলাধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেন বাসের সহকারী মাসুক আলী। এতে ঘটনাস্থলেই বাসের চাকার নিচে পড়ে মারা যান তিনি।

আফনান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার রুদ্র গ্রামের ঘারি মো. আবু জাহেদ মাহবুব ও চিকিৎসক মীনা পারভিন দম্পতির ছেলে। সেদিন আফনানসহ ১০ শিক্ষার্থী হবিগঞ্জের দেবপাড়ায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে শেরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ওই বাসে করে সিলেট ফিরতে চেয়েছিলেন। বাসে ওঠার পর ভাড়া নিয়ে বিবাদ দেখা দিলে ১০ জন বাস থেকে নেমে যাচ্ছিলেন। এ সময় বাসের চালক জুয়েল আহমদ ও সহকারী মাসুক আলী তাদের গালমন্দ করলে আফনান বাসে ওঠে গালমন্দের কারণ জানতে চান। তখন চালকের সহকারী মাসুক আলী আফনানকে গলাধাক্কা দিয়ে বাস থেকে ফেলে দেন।

এর আগে ১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে বাসচাপায় নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। চাপা দেয়া সুপ্রভাত বাসটির রুট পারমিট ছিল না রাজধানীতে চলার। এ ছাড়া এ বাসের বিরুদ্ধে অনেক মামলাও ছিল। এ অবস্থায় বাসটি নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করেছে অনায়াসে। আবরার মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়ে পুরো রাজধানী। নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পরিবহন মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেই প্রশ্ন উঠেছে পারমিট ছাড়া এ বাস ঢাকার সড়কে এতদিন চলেছে কীভাবে? এদিকে অবৈধ চালক ও যানবাহনের বিরুদ্ধে চলা সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও গত শুক্রবার গাজীপুর রুটে চলাচলকারী বলাকা সার্ভিসের একটি বাস রাজধানীর মহাখালী এলাকায় সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের গাড়িতে ধাক্কা দেয়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ওই বাসটি জব্দের পরও পুলিশ জানিয়েছে, লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছিলেন চালক।

গণপরিবহনের নৈরাজ্য থামছেই না: বারবার অভিযান পরিচালনা করেও এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছে না পুলিশ। ৮৭ শতাংশ বাস চালানো হয় বেপরোয়া গতিতে। বেশিরভাগ চালকই লাইসেন্সবিহীন। নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করে তারা গাড়ি চালান। এ কারণে প্রায় প্রতিনিয়তই সড়কে ঝরে প্রাণ। সিটিং সার্ভিসের নামে চলছে প্রতারণা। সিটিংয়ের নামে অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও দাঁড় করিয়ে যাত্রী নেয়া হচ্ছে। দরজা খোলা রেখে যত্রতত্র ওঠানো-নামানো হয় যাত্রীদের। প্রতিবাদ করলেই লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে বাস মালিকরা চুক্তিতে গাড়ি তুলে দেন অদক্ষ চালকদের হাতে। আর চালকদের অনেকেই মাদকাসক্ত। ছাত্রদের হাফ পাশ ও সাম্প্রতিকালের নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণেই তাদের ওপর ক্ষুব্ধ পরিবহন চালক ও শ্রমিকরা।

ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য: গণপরিবহনে ভাড়া আদায়ে নৈরাজ্য যেন থামছেই না। লোকাল বাস সার্ভিসগুলোর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও কম স্টপেজ ও সিটিং সার্ভিসের নামে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় চলছেই। চেকারকে বকশিস দেওয়ার মাধ্যমে সিটিং বাসগুলোতে দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া এবং যাত্রীদের টিকিট না দিয়েই বাস শ্রমিকরা ভাড়া নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার এসব পরিবহনের অধিকাংশতেই হাফ পাশ না থাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত বাকবিতক্ত ও হাতাহাতির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। গতকাল রোববার প্রেসক্লাব, আজিমপুর, শাহবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর, মহাখালী, নতুনবাজার এলাকা ঘুরে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। মিরপুর থেকে গুলিস্তান ও আজিমপুরগামী বিকল্প, শিখর, বিহঙ্গ, সেফটি, মিরপুর লিংকসহ বেশ কয়েকটি বাস সিটিং সার্ভিস বলা হলেও এসব বাসে দাঁড় করিয়েও যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভাড়া আদায় করা হচ্ছে সিটিং সার্ভিসের।

এছাড়া সায়দাবাদ থেকে গাজীপুরগামী তুরাগ পরিবহনের গায়ে সিটিং সার্ভিস লেখা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আবার এসব বাসের অধিকাংশতেই নেই বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের (বিআরটিসি) নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট। মানা হচ্ছে না সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দেওয়া হাফ ভাড়ার নির্দেশনা। বিভিন্ন গণপরিবহনের গায়ে লিখে দেওয়া হয়েছে ‘হাফ পাশ নাই’। এসব বাস সার্ভিসে উঠলেই গুনতে হয় শুরুর স্টপিজ থেকে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত ভাড়া।

বিজয় সরণি মোড়ে গুলিস্তানগামী অন্য একটি বাসের যাত্রী অ্যাডভোকেট শওকত হায়াত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘শ্যাওড়াপাড়া থেকে কারওয়ানবাজার পর্যন্ত ভাড়া নিয়েছে ২৫ টাকা। সবাইকে যদি এভাবে অর্ধেক পথ গিয়ে পুরো ভাড়া দিতে হয় সেটা তো যাত্রীদের প্রতি জুলুম, প্রশাসনও এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’ এ সময় পাশ থেকে অন্য এক যাত্রী বলে ওঠেন, ‘বিআরটিএ কী বলবে তারা তো আগে থেকেই খেয়ে বসে আছে।’ 

ঢাকা স্কুল অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এর শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান বাশার অভিযোগ করে বলেন, মন্ত্রী যেটা বলেছেন তার উল্টোটা হচ্ছে। তার নির্দেশের কোনো তোয়াক্কাই করছে না বাসগুলো। আজিমপুর থেকে মিরপুরগামী সব বাসের গায়েই লেখা হাফ পাশ নেই, আমরা শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এত ভাড়া কীভাবে দেবো- বলেও প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে বিআরটিএ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিবেদককে বলেন, সরকারের ভাড়ার তালিকার মধ্যে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এটা মালিক শ্রমিকদের সৃষ্টি। বিভিন্ন পরিবহনের মালিকরা বিআরটিএতে এসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে গেছেন কিন্তু তারা এটা মানছেন না বলে জানান।

শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো লিখিত আদেশ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া না নিলেও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

বিআরটিসি চেয়ারম্যান যা বলেন: গত ১৮ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নিতে কোনো বাস কোম্পানি অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া। রাজধানী ঢাকায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান বাহন বাস। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া আদায়ের নিয়ম প্রচলিত থাকলেও নানা অজুহাতে তা মানে না অধিকাংশ বেসরকারি বাস কোম্পানি। যদি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নিতে কোনো বাস কোম্পানি অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে অভিযোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া।

তিনি জানান, সব বাস কোম্পানিকেই শিক্ষার্থীদের কাছে অর্ধেক ভাড়া নিতে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় ১৮৫টি রুটে বিআরটিসির ৪৫২টি বাস চলাচল করছে জানিয়ে তিনি দাবি করেন, বিআরটিসির বাসে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হয়।প্রায় বাসেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘হাফ ভাড়া’ বা অর্ধেক ভাড়া নিয়ে হেল্পারদের নিয়মিত তর্ক-বিতর্ক হয়। বাসের হেল্পার-কন্ডাক্টররা দাবি করেন, অর্ধেক ভাড়া নেওয়া নিষেধ রয়েছে কোম্পানির পক্ষ থেকে, তাই তারা অর্ধেক ভাড়া নিতে পারবেন না।

Ads
Ads