রেলের ভাড়া বাড়ানো: ভেবে চিন্তে উদ্যোগ নেওয়া হোক

  • ১৯-মার্চ-২০১৯ ০৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
Ads

 

:: ড. কাজী এরেতজা হাসান ::

এ কথা বলা বাহুল্য যে, বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে শস্তায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ট্রেনের কোনো জুড়ি নেই। সাধারণ আয়ের মানুষ তাই দূরপাল্লার যাতায়াতের ক্ষেত্রে ট্রেনের ওপরই অধিক ভরসা রাখেন। একসময় ট্রেন চলাচলে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকায় অনেকেই এক পর্যায়ে ট্রেনবিমুখ হয়ে পড়েছিল। তবে এখন ট্রেনে যাত্রীসেবা ৪০ বছর আগে যা ছিল তার চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এ সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ‘আন্তঃনগর’ সার্ভিস। বেড়েছে ট্রেনের সংখ্যাও। যদিও এক্ষেত্রে যাত্রীসংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে- অব্যবস্থাপনা, যাত্রী হয়রানি, ট্রেন ও স্টেশনের অপরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত বিশ্রামাগারের অভাব, সময়সূচি ঠিক না থাকা, টিকিট ছাড়া যাত্রী ওঠা, কুলিদের দৌরাত্ম্য, বুফে কারে মাত্রাতিরিক্ত মূল্য রাখা- এতসব সমস্যা যেন ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির মতো হয়ে আছে। বিশেষ কয়েকটি ট্রেন ছাড়া চলাচলকারী দুই শতাধিক ট্রেনে যাত্রীসেবার যে মান তা কিন্তু মোটেও সন্তোষজনক নয়।

অন্যদিকে সেবা বাড়ানোরও কোনো উদ্যোগ নেই। তবে ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ আছে। ২০১৬ সাল থেকে ফি বছর ভাড়া বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। গত বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় তা বাড়ানো যায়নি। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এবার ২৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) চাপ এবং একটি বিদেশি পরামর্শক সংস্থার সুপারিশে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। জুন মাসের মধ্যে তা কার্যকর করা হবে।

যদিও গতকাল সোমবার রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে অন্যান্য যানবাহনের ভাড়ার সঙ্গে তুলনার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এই ‘তুলনা’র উদ্দেশ্য কী? আমরা মনে করি, এ প্রস্তাব কার্যকর হলে ভাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আন্তঃনগর (শোভন চেয়ার) ৩৪৫ থেকে বেড়ে ৪৬৫ টাকা ও এসি চেয়ারে ৬৫৬ থেকে বেড়ে এক হাজার ৭০ টাকা হবে; ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-লালমনিরহাট ও ঢাকা-খুলনা রুটে শোভন চেয়ার ৫০৫ থেকে ৬৩০ টাকা ও এসি চেয়ারে ৯৬৬ থেকে এক হাজার ৪৪৯ টাকা; ঢাকা-রাজশাহী রুটে শোভন চেয়ারে ৩৪০ থেকে ৪৬৫ টাকা ও এসি চেয়ারে ৬৫৬ থেকে এক হাজার ৭০ টাকা; ঢাকা-সিলেট রুটে শোভন চেয়ারে ৩২০ থেকে ৪৩৫ টাকা ও এসি চেয়ারে ৬১০ থেকে এক হাজার এক টাকা; ঢাকা-দিনাজপুর রুটে শোভন চেয়ারে ৪৬৫ থেকে ৬৩০ টাকা ও এসি চেয়ারে ৯৯০ থেকে এক হাজার ৩৮০ টাকা; ঢাকা-পঞ্চগড় রুটে শোভন চেয়ারে ৫৫০ থেকে ৬৭৫ টাকা ও এসি চেয়ারে এক হাজার ৫৩ থেকে বেড়ে এক হাজার ৫৫৩ টাকা হবে। 

এমনিতেই দেশের মানুষ আজ প্রায় ট্রেনবিমুখ। কোথায় মানুষকে ট্রেনমুখী করা হবে যাত্রীসেবার মান বাড়িয়ে, তা না করে ফি বছর এভাবে হুটহাট ভাড়া বাড়ানোর উদ্দেশ্যটা কি? ট্রেনের ভাড়া বাড়বে  না সে তো আমরা বলছি না। তবে সরকারি গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির উদ্দেশ্য কিন্তু মুনাফা বৃদ্ধি নয়; এর মূল উদ্দেশ্য পরিচালন ব্যয় মেটানো। কিন্তু সেবা না বাড়লে ভাড়া বৃদ্ধি যৌক্তিক নয়, তাও ২৫ শতাংশ হারে। মনে রাখতে হবে, ট্রেনের লোকসানের মূল কারণ অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। কিন্তু এর কোনো সুরাহা না করে ভাড়া বাড়ালে কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? বরং এসব সমস্যা সমাধানের পর যতটুকু ভাড়া বাড়ানো দরকার ততটুকুই বাড়ানো উচিত। অযথা যাত্রীর ওপর চাপ বাড়িয়ে আর যা-ই হোক সেটা যাত্রীসেবা হতে পারে না। বরং সেটা যাত্রী নিপীড়নের পর্যায়েই পড়বে। কাজেই সরকার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে দৃষ্টি দিয়ে যথাযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবে এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের।

Ads
Ads