অপ্রতিরোধ্য বায়ুদূষণ : চ্যালেঞ্জের মুখে পরিবেশের উন্নয়ন

  • ৮-মার্চ-২০১৯ ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন দেখা দিয়েছে তা মূলত অর্থনৈতিক। কিন্তু এমন কিছু কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যা এই উন্নয়নের জন্য হুমকিস্বরূপ। যেমন- পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বায়ুদূষণ, যানজট, জনঘনত্ব প্রভৃতির অবনতি যে অপ্রতিরোধ্যগতিতে চলছে তাতে করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিও যে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তা বলাই বাহুল্য।  যেমন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার এয়ারভিজুয়াল’ ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিসে’র গবেষণা প্রতিবেদনে দেশে বায়ুদূষণ মাত্রার যে প্রকৃতি ফুটে উঠেছে, তা খুবই মারাত্মক। ২০১৮ সালে পরিচালিত একটি গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ৭৩ দেশের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে দূষিত রাজধানীর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয় এবং শহর হিসেবে ১৭তম। তালিকাটি প্রস্তুত করতে বাতাসে ‘পিএমটু-পয়েন্টফাইভ’ নামে পরিচিত এক ধরনের সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতির মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে। দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাতাসে পিএমটু-পয়েন্টফাইভের গড় মাত্রা ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। যা সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক।

উল্লেখ্য, এসব কণা মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে মারাত্মক দূষণ ঘটিয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএমটু-পয়েন্টফাইভের দূষণে ফুসফুসের ক্যান্সার, স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগ হতে পারে, যার মধ্যে অ্যাজমা অন্যতম। জানা গেছে, অকালে প্রাণহানির জন্য দায়ী কারণগুলোর মধ্যে চতুর্থ হচ্ছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে অন্তত ৭০ লাখ মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে। আর এজন্য বিশ্বে বার্ষিক প্রায় ১৯ লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর কোটি কোটি গাছের চারা রোপণ করার পরও জাতিসংঘ বলছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনভূমি। এ হিসেবে প্রতি মিনিটে ধ্বংস হচ্ছে প্রায় আট হেক্টর বনভূমি। যে হারে পৃথিবীতে বন উজাড় হচ্ছে, সে হারে বৃক্ষরোপণ হচ্ছে না। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায় এক লাখ ৩০ হাজার বৃক্ষনিধন হলেও রোপণ হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার বৃক্ষ। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে কী নিষ্ঠুর আচরণ করছি আমরা! ফলে স্বাভাবিকভাবেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের জলবায়ু, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর। রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠেছে। এই শোচনীয় অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী মাত্রা ছাড়ানো যানবাহনের সংখ্যা। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্যরে কারণেও রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য শহরে বায়ুদূষণ বাড়ছে। ফলে মানুষ বিভিন্ন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা মনে করি, উন্নয়নকে অর্থবহ করে তুলতে হলে মানবসম্পদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের দিকেও নজর দিতে হবে সরকারকে। এজন্য সংসদীয় কমিটি কর্তৃক ‘হেলথ অ্যালার্ট জারির যে সুপারিশ এসেছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজধানীসহ সারা দেশের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রতিষ্ঠান বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেভাবে এগিয়ে চলেছে তা আজ সারা বিশে^ই প্রশংসনীয়। কিন্তু জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ প্রভৃতির যে শোচনীয় অবনমন চলছে তা যথাযথ রোধ না করা গেলে এই দৃশ্যমান উন্নয়নও রসাতলে যাবে। সেজন্য গঠনমূলক পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে সরকারকে।

Ads
Ads