বলিষ্ঠ চিত্তে কবি শুনিয়েছিলেন ৭ মার্চের ভাষণ

  • ৭-মার্চ-২০১৯ ০৮:০৬ পূর্বাহ্ণ
Ads

সৈয়দ মিজানুর রহমান
৭ই মার্চ ভাষা আন্দোলনের প্রান পুরুষ, ছয়দফার উপস্থাপক, গন অভ্যুর্থানের মহানায়ক, শৃঙ্খলিত জাতীর মুক্তিদুত, জনগণ মননন্দিত রাজনীতিবিদ, বঞ্চিত বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনের মূর্তপ্রতীক বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীকে দিক নির্দেশনা দিয়ে ভাষণ দিয়ে ছিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম”।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধ:
আমরা যদি বিস্তারিত ভাবে বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ একটু বিশ্লেষণ করি, তবে দেখব, স্বাধীনতার ঘোষণা কত দিপ্তকন্ঠে বলিষ্ঠ চিত্তে শুনিয়ছিলেন।
 
বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চে বললেন, “আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তাঁর অধিকার চায়”। এমনটি করে হ্নদয়দিয়ে, খুব কাছে থেকে বাংলার মানুষকে আর কেউ কোনদিন চিনতে পারছিলেন কিনা আমাদের জানা নেই। দলমতের উর্দ্বে উঠে বাঙালী জাতির আকাঙ্ক্ষাকে আন্তরিক ভাবে উপলব্দি করে একটি অভীষ্ট লক্ষ্যে জাতীকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ছিলেন। তিনি বললেন বাংলার মানুষ ‘মুক্তি চায়’ ‘বাঁচতে চায়’ ‘অধিকার চায়’। ‘মুক্তি-বাচা-অধিকার’ এ তিনটি সব্দের ভেতরে পরোক্ষ ভাবে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতার অতৃপ্ত আকাঙ্খা। বস্তুতঃ তিনি আমাদের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে বজ্রকন্ঠে শাসকের রাজ্যে নির্ভয়ে সেদিন লক্ষ বাঙ্গালীর সামনে ঘোষণা করেন।

আরো বললেন, “—-আমার ছেলেদের গুলিকরে হত্যাকরা হয়েছে”। এখানে ‘আমার’ শব্দটির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপুর্ন। তিনি ‘আমাদের’ সব্দটিও ব্যবহার করেন নাই। ‘আমাদের’ শব্দটি ব্যবহার করলে হয়ত বুঝা যেত তিনি প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু না, সন্তান তুল্য মনে করে ভাবলে’ বুঝলে এবং ভালবাসলেই কেবল ‘আমার’ শব্দটি দিয়ে সম্ভোধন করা সম্ভব হয়। ‘একনেতা একদেশ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ এই শ্লোগানটি যতার্থ ছিল কেবল এমন সম্ভোধন হতে পারে।

“আমি বললাম, এসেম্বলীর মধ্যে আলোচনা করবো –এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদিকেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশী হলেও একজনও যদি হয় তাঁর ন্যায্য কথা আমরা মেন নেব”। Absolute majority ‘এর গর্বে তিনি মোটেও গর্বিত ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু বিরোধী দলের একজনের ন্যায্য কথাও মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করছিলেন।

“আমি বললাম শান্তিপূর্ণ ভাবে হরতাল পালন করুন” হরতাল যদি সেদিন সান্তিপুর্ন ভাবে না করতে পারতেন, তবে সামরিক সরকার ঘটনাকে অন্যখাতে ঠেলেদিতেন। আন্দোলন সান্তিপুর্ন হলেই কেবল অভীষ্ট লক্ষে পৌছানো যাবে, এ দীক্ষা তিনি সেদিন জাতিকে শুনিয়েছিলেন।
 
“আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা। আমি এ দেশের মানুষের অধিকার চাই”। জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাঁকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে সম্ভোধন করার পরেও, পুলকিত হয়ে বাংলার জনগণের অধিকারকে উপেক্ষা করতে পারেননি। পারেননি আপোষের চিন্তা করতে। পরবর্তি কালে, ২৫শে মার্চের পর বেতার ভাষণে জেনারেল ইয়হিয়া খাঁন তাঁকে জেলে ঢুকিয়ে বললেন, ।“আমি তাঁকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে সম্ভোধন করার পরেও তাঁর মাঝে কোন উৎসাহ দেখিনি, তিনি বাঙালীদের নেতা হতেই বেশী পছন্দ করতেন”। এমন লোভ- প্রলোভান বহুবার বঙ্গবন্ধুর জীবনে এসেছিল। তিনি আপোষ করেননি। আগরতলা মামলায় যখন তাঁকে প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব আসে তিনি সরাসরি তা প্রথ্যাক্ষান করেন। এদেশের মানুষের অধিকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীত্ব তাঁর কাছে কোন সময়ই বড় ছিল না।

“আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় – তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল”। বঙ্গবন্দু নিশ্চিত ভাবে জানতেন খুব শীঘ্রই ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। তাই তিনি‘রইল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ তিনি যে আর আমদের মাঝে থাকতে পারবেন না কিংবা শত্রুরা তাঁকে থাকতে দিবে না তা’ তিনি নিশ্চিতভাবে অনুমান করেছিলেন। তাই অনুরোধটি ‘রেখে’ যেতে চাইলেন। তাঁর এ অনুমান পরবর্তিতে অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল তা আমরা সকলেই জানি।

তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু- আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধকরে দেবে”। তাঁর নিরস্র মানুষগুলি আক্রান্ত হলে, ওরা কি ভাবে শত্রুকে মোকাবেলা করবে তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশ এখানে আছে। বঙ্গবন্ধু যদি নাও থাকেন, তাহলে বাংলার মানুষ কি করবে তাঁর সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা এখানে রয়েছে। আজ তথাকথিত অনেক ভুইফোর বুদ্বিজীবি বলে থাকেন বঙ্গবন্ধু আমাদের কোন দিক নির্দেশনা না দিয়েই তিনি পাকিস্তানীদের হাতে আত্নসমর্পণ করেন। তাদের চোখে আঙ্গুলদিয়ে দেখিয়ে দিতে চাই তারা কত নির্বোধ এবং অজ্ঞ। ইচ্ছে করেই সত্যকে লুকিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকেন।

“সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না“। এখানে তিনি শত্রু পক্ষকে উদ্দেশ্য করে জাতিকে আত্নপ্রত্যয়ে আরো বলীয়ান করার মানষে এমনটি বলেছিলেন। যে জাতি চিরকাল গোলামীর শৃঙ্খলে বন্দী ছিল, সেই ভীতু জাতিকে তিনি তিলে তিলে জাগিয়ে তোলেন। আন্দোলন শেখান, সংগ্রাম শেখান, ত্যাগ শেখান তার পর শেখান আত্মত্যাগ। শেখান কি করে বুকের রক্ত ঢেলে আন্দোলনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। যখন দেখলেন তাঁর সন্তানেরা আত্মপ্রত্যয়ে জীবন দেয়ার জন্য প্রস্তুত, তখনই লক্ষ জনতার সামনে ঘোষণা করলেন ‘আমারা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না’। তিনি নিশ্চিত ছিলেন তিনি জয়ী হবেন।

“মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্নকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালী- ননবাঙালী যারা আছেন তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়ীত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়”। তাঁর অসাম্পদায়িক আদর্শ আজ আওয়ামীলীগ লালন করে চলছে। পাক জান্তারা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে আমাদেরকে যেন লক্ষ্য অর্জনে বিচ্যুত করতে না পারে তাই ছিল তাঁর সতর্ক আহবান। সংগ্রামের পথে বাধা হতে পারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, তাই এ দুর্বলদিগটি তিনি তুলে ধরে আমাদেরকে হুশিয়ার করে দেন। আর এটাই হলো যোগ্য নেতার সঠিক নির্দেশ।

“কিন্তু যদি এদেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন”। এখানে আবারো জাতিকে তিনি নির্দেশ দিলেন কি করে তাদের উপযুক্ত সময়ে সঠিক পন্থা বেছে নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী প্রমান করে আজীবন অন্তরালে পুরে রাখার অনেক কৌশল তৎকালীন সামরিক জান্তারা করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে বিদ্রোহের ডাক দিলে তাঁকে দেশদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করা হতে পারে। তাই অত্যন্ত কৌশলে বাঙালীকে বিদ্রোহের সময় টুকু পর্যন্ত বলে দেলেন। যদি কেউ হত্যা যজ্ঞ চালায়, তবে যেন বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করে, অর্থাৎ অস্র হাতে তুলে নেয়।

“প্রত্যেক গ্রামে প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল”। আন্দোলন- সংগ্রামের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশ তিনি তার এ ভাষণে দিয়ে রেখেছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সংশ্লিষ্টতার প্রয়োজনীতা স্বীকার করে নিয়ে নেতৃত্ব আওয়ামীলীগের হাতে রেখে সংগ্রাম পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। তাতে নেতৃত্ব সঠিক স্থানে থাকবে, আন্দোলন সঠিক পথে থাকবে। কেউ ভুল পথে ঠেলে দিতে পারবে না।

“এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক”। মুক্তিযুদ্বের জন্য জাতী (সাধারণ জনতা) কিভাবে প্রস্তুত থাকবে তার নির্দেশ তিনি এখানে উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন তার বাঙালী জাতির কি আছে আর কখন কি পাইতে পারে। তিনি জানতেন বাঙালীর যা আছে তাই নিয়ে যখন ঝাপিয়ে পড়বে, তখন তার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিশ্রুত বন্দ্বুরা এগিয়ে আসবে। এমনটিই ছিল বোঝাপড়া। তাই বন্ধী হ’বার আগেই তিনি তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ৩২ নম্বর থেকে পাঠিয়ে দেন। আর তিনি সাধারণ মানুষকে ‘যা কিছু আছে’ তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন, আর বললেন ‘বাঙালীরা যেন বুঝেসুঝে কাজ করে’। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্বিদিয়ে জাতিকে সকল নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন।

“রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশ’আল্লাহ্‌”। এখানে তিনি জাতিকে আশ্বস্থ করেছেন। ভরসা দিয়েছেন। সামনে একটি যুদ্ব, হয়ত আরো ত্যাগের প্রয়োজন হবে, আরো অনেককে শহীদ হতে হবে। জাতিকে সে ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে বল্লেন। এখানে নেতাজী সুভাস চন্দ্রের একটি কথা না বললেই নয়, নেতাজী বলেছিলেন “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদেরকে স্বাধীনতা দেব”। শহীদের রক্ত যে বৃথা যাবেনা তা তিনি জাতিকে আবারো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা”। তার এই ঐতিহাসিক ভাষণের এটাই মুল কথা। ৭ই মার্চে তিনি লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে পরোক্ষ ভাবে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

সংক্ষিপ্ত ভাবে এ ভাষণের সকল দিক তুলে ধরা সম্ভব নয়। তার এক একটি কথা মুক্তিযুদ্বের এক একটি প্রেক্ষাপট, এক একটি অধ্যায়। এমন কোন নির্দেশনা বাকী ছিল না, যা তিনি তার এ ভাষণে দিয়ে যান নি। তাই যারা আজ নানা স্থানে বলে বেড়ায়, ‘বঙ্গবন্ধু কোন নির্দেশনা না দিয়েই কারা বরন করলেন, তারা মূর্খ। তাদের বুদ্বি লোপ পেয়েছে। তারা বুঝতে পারে না। অথচ একটি সংগ্রামের এমন কোন দিক নেই, যা তিনি তার এই ভাষণে সরাসরি কিংবা আকার ইঙ্গিতে Permissible way-তে ঊল্লেখ না করেছেন। তার এ ভাষণ স্বাধীনতা যুদ্বকে তার নেতৃত্বে চালিয়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল, আর ছিল প্রতিটি মুক্তিযোদ্বার অনুপ্রেরণা ও দিকনিদর্শন। জাতির ইতিহাসের এ এক অবিস্মরণীয় দলীল।

আব্রাহাম লিঙ্কন এর গেটিসবার্গের ভাষণ। মার্টিন লুথার কিংয়ের (জুনিয়র) ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ শীর্ষক ঐতিহাসিক ভাষণের ছেয়ে ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্বে বেশী বলে আখ্যা দিয়েছেন ইউনেস্কো। মার্টিন লুথার কিংয়ের সেদিনকার কণ্ঠের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষণ এবং তাঁর জীবনের সঙ্গেও শেখ মুজিবের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া ম্যালকম এঙ, মহাত্মা গান্দ্বী, সুভাষ চন্দ্র বসু, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা, কর্নেল নাসের এসব মানব দরদী ও জাতীয়তাবাদী নেতার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রদত্ত বিভিন্ন ভাষণের সাথে ৭ মার্চের ভাষণের সামঞ্জস্য রয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁদেরই মতো বিশ্ব পর্যায়ের নেতা।
 
১৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১ দিবাগত রাতে ভারতীয় ১০১ বাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল নাগরা কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান আবদুল কাদের সিদ্দিকী মীরপুরের আমিন বাজারের ব্রিজের ওধারে অবস্থান গ্রহণ করেন। আর পাকিস্থানের হানাদার বাহিনীর প্রধান আমির আবদুল্লাহ নিয়াজীর উপর মানষিক চাপ সৃষ্টির জন্য ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ’র পাকিস্থানের সৈন্য বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার আহবান জানান। আকাশ বানী বেতার কেন্দ্র থেকে জেনারেল মানেকশ’র আহবান বার বার প্রচারিত হয়।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ অবশেষে জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণে রাজী হলেন। পাকিস্তান ৩৬ ইনফ্যাট্রি ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মহাম্মদ জামসে তাদের ঢাকা নগরিতে অভ্যর্থনা জানিয়ে জীপে চড়ে চললেন পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়াটারের দিকে। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে নিয়াজির পক্ষ থেকে পাকিস্থান ইস্টার্ন আর্মির সিফ স্টাফ ব্রিগেডিয়ার বাকের সবাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে একটা সাজনো কক্ষে বসতে অনুরোধ করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে লেঃ জেনারেল নিয়াজী ‘আণ্ডার গ্রাউন্ড’ টেকনিক্যাল হেড কোয়াটার থেকে নিজস্ব অফিসে হাজির হলেন। মেজর জেনারেল নাগরা, আবদুল কাদের সিদ্দিকিকে সাথে করে নিয়ে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামসেদ ও লেঃ জেনারেল নিয়াজীর ঘরে প্রবেস করনে। জেনারেল নিয়াজী মেজর জেনারেল নাগরার সাথে করমর্দন করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। নাগরার কাঁধে মুখ রেখে নিয়াজী একেবারে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং কান্না বিজোড়িত কণ্ঠে বললেন, “পিণ্ডির হেড কোয়াটারের বেজম্মারা আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী”। নিয়াজীর কান্না থামিয়ে একটু ঠাণ্ডা হতেই মেজর জেনারেল নাগরা তাঁর সহকর্মীদের সাথে একে একে পরিচয় করে দিলেন। কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে মেজর জেনারেল নাগরা বললেন, “ইনিই এখন মুক্তিবাহিনীর একমাত্র প্রতিনিধি। ইনিই তোমার পরম বন্দ্বু সেই বিখ্যাত কাদের সিদ্দিকী”।

কাদের সিদ্দিকির নাম শুনে লেঃ জেনারেল নিয়াজী চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বার সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানালেন এবং করমর্দন করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। সবাইকে হতবাক করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা তাঁর হাত সরিয়ে নিয়ে ইংরেজিতে বললেন, “যার হাত দিয়ে নারী ও শিশু হত্যা করেছে, আমাদের মা বোনের ইজ্জত লুটেছে, তার হাতের সাথে করমর্দন করতে পারলাম না বলে আমি দুঃখিত আমি আল্লার কাছে জবাবদিহিকারি হতে চাই না”। কিন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিচক্ষন জেনারেল নাগরা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কাদের সিদ্দিকীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনি কি করছেন? হাত মিলান। আপনার সামনে পরাজিত সেনাপতি। পরাজিতের সাথে হাত না মেলানো বীরত্বের অবমাননা”। জেনারেল নাগরার কথা অনুসারে আবদুল কাদের সিদ্দিকী করমর্দন করলেন। লেঃ জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর সাথে প্রয়োজনীয় আলাপ আলোচনার পর স্থির হলোঃ রেসকোর্স ময়দান (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) বিকেল চারটায় মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেঃ জেনারেল জগৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আত্নসমর্পণ করবে। মুজিব নগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ মুজিব নগর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিমান বাহিনীর প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারকে রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে পাঠান।

মাত্র ৯ মাস ৯ দিন আগে যেই রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাঙালী জাতীর নয়নমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ ই মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম”। ১৬ ডিসেম্বর ঠিক সেই বিশাল ময়দানে প্রায় দশ লক্ষ জনতা আর শতাদিক দেশী বিদেশী সাংবাদিক পশ্চিম পাকিস্থানের হানাদার বাহিনীর সৈন্যদের বাঙালী জাতীর সামনে মাথা নিচুকরে আর্তসমর্পণ করার অনুষ্ঠান নিজের চোখে দেখলেন।

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্ত গিয়েছিলো ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সেই লাল সূর্য আবার স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে উদিত হলো। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বিশ্বের মাবচিত্রে স্থান লাভ করলো একটা দেশ যার নাম বাংলাদেশ।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর

 

Ads
Ads