দুর্নীতি দমনে দুদক কেন ‘একা’ থাকবে?

  • ২৭-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দুর্নীতি কোন মাত্রায় চললে একজন অডিটরের শোয়ার ঘরে বস্তাভর্তি ৯২ লাখ টাকা পাওয়া যেতে পারে সেটার নজির দেখলাম আমরা গতকালের গণমাধ্যমে। প্রতিবেদনটি সব গণমাধ্যমেই ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের নামে আত্মসাৎ করা এ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের মো. সৈয়দুজ্জামানের বাড়ি থেকে। এ উদ্ধারকাজে দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) নাসিম আনোয়ার নেতৃত্ব দেন। প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় ১৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যান ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেরাজুল ইসলাম। এই হচ্ছে আমাদের দেশের জনগণের টাকায় পরিচালিত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, যেখানে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একটি অংশ এভাবেই টাকা লুটপাটের মহোৎসবে মত্ত থাকেন। এর আগে ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময় বনবিভাগের আরেক কর্মকর্তার বাসায় বালিশের ভেতর কোটি কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছিল।

যে কর্মকর্তা ‘বনখেকো’ নামে ভূষিত ছিলেন সাধারণের মধ্যে। তবে দুর্নীতির এসব খবরের অন্তরালে আরো অনেক এমন চিত্রও আছে, যেখানে দুদকেরও হয়তো প্রবেশ দুঃসাধ্য। যারা টাকা নিজঘরে স্টিলের বা আলমারিতে গচ্ছিত রাখেন না, বালিশের ভেতরে রাখেন না, এমন কোথাও রাখেন যেখানে টাকা গচ্ছিত থাকলে কাকপক্ষীও টের পাবে না। তবে মাঝেমধ্যে এরকম দু-একটি ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেই তখন আমরা বুঝতে পারি দুর্নীতি কোন মাত্রায় পৌঁছেছে দেশে। তবে আমাদের দেশে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই। এমন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে দুর্নীতি কমবেশি হয় না। সে তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি কম। এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির চিত্র তেমন দৃশ্যমান নয়, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেন এত দুর্নীতি থাকবে? এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সবগুলোতেই যে সমানতালে দুর্নীতি হয় এমন নয়। যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানে টাকা-পয়সার লেনদেন বেশি হয় সেখানেই এই দুর্নীতির চিত্রটি প্রকট। এখন এই দুর্নীতি প্রতিরোধ করবে কে? কথায় বলে, কাকের মাংস কাকে খায় না’।

এখন এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী যখন ঘুষের লেনদেনে জড়িত থাকেন তখন তার সহকর্মীদের কেউ ‘সৎ’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি নিশ্চয়ই সেই সহকর্মীকে ধরিয়ে দেবেন না বা তা তৃতীয় পক্ষে প্রকাশ করে দেবেন না। এভাবেই চলছে ঘুষ খাওয়া অসৎ কর্মজীবী ও ঘুষ না খাওয়া কর্মজীবীদের মধ্যে একধরনের অদৃশ্য বোঝাপড়া। এই যদি হয় একা দুদকের দেশের এই দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলাÑ কীভাবে সম্ভব হবে? এজন্যই কিছুদিন আগে দুদকের চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুদকের একার পক্ষে দুর্নীতি দমন সম্ভব হবে না।’ এতে আমরাও একমত।

তবে এক্ষেত্রে যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিজেদের ‘সৎ’ বলে দাবি করেন তাদেরও মনে রাখা উচিত যেসব ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের চোখের সামনে দুর্নীতি করে যাচ্ছেন আর তারা এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন তারা যেন আরো একবার এই পঙ্ক্তিটিতে চোখ বুলিয়ে  নেন- ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সমদহে’- ন্যায়দণ্ড, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এখন তাদের তথাকথিত ‘সততা’ যদি দুর্নীতিরোধে সহায়ক না হয়ে ওঠে তাহলে সেটা কীসের কোন সততা? সেজন্যই তো দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দুদকের একার পক্ষে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়। এখন আমাদের প্রত্যাশা থাকবে দুদক যেন আর ‘একা’ না থাকে, তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসলেই ‘সৎ’ বলে খ্যাত কর্মজীবীরা ‘প্রকৃত সৎ’ বলে দাবি করতে পারবেন। নয়তো কখনোই নয়। তখন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আবারো বলতে হবে, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সমদহে’।

Ads
Ads