চুড়িহাট্টার মতোই বিস্ফোরণ ঝুঁকিতে ঢাকার সড়ক

  • ২৩-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
Ads

নিজস্ব প্রতিবেদক
 
রাজধানীর যে কোনো সড়কে যখন তখন ঘটতে পারে শক্তিশালি বিস্ফোরণ। ঘটতে পারে চকবাজারের চুড়িহাট্টার মতো বিপর্যয়ের ঘটনা। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের উৎস ছিল ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতালার হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। ঢাকার সিংহভাগ গাড়িই এখন সিএনজি চালিত। মানহীন ও মেয়াদ পার হওয়া সিলিন্ডারে গ্যাস ভরো ঢাকার সড়কে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটছে গাড়ি। নিম্নমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার, পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার এখন বিপজ্জনক বোমায় পরিণত হয়েছে।

গাড়িতে সংযোজিত সিএনজি সিলিন্ডার এখন জানমালের জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চকবাজার ট্র্যাজেডির পর গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার না করার বিকল্প ভাবছে সরকার।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে প্রায় দেড় লাখ সিএনজি চালিত যানবাহন চলাটল করে। এসব যানবাহনের নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবহৃত সিলিন্ডার প্রতি ৫ বছর পরপর রিটেস্ট (পুনঃপরীক্ষা) করার বিধান রয়েছে। সকল ধরনের সিলিন্ডারের রিটেস্টের অনুমোদন দেয় বিস্ফোরক অধিদফতর। তবে সিলিন্ডারের রিটেস্ট করাতে হয় অন্য প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও আইনে বাধ্যবাধকতা না থাকায় সিলিন্ডারের ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলছে।

বিস্ফোরক অধিদফতর বলছে, সিএনজি চালিত যানবাহনের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মান নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার ৫ বছর পরপর রিটেস্টের বিধান রয়েছে। তবে মাত্র ৫০ শতাংশ যানবাহনের সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার আওতায় রয়েছে। বাকিগুলোর পুনঃপরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া যায় না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিআরটিএর ফিটনেস নেয়ার সময় সিলিন্ডার রিটেস্ট করানো বাধ্যতামূলক করা হলে বহুলাংশেই এ ঝুঁকি কমবে। সরকারের উচিত খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

তারা জানান, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়, ওই সময় গাড়ি ভয়াবহ বোমা হয়ে বিস্ফোরণের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। এ আশঙ্কা রোধে গ্যাস সিলিন্ডারের সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। বাধ্যবাধকতা থাকলেও সিএনজিচালিত গাড়ির পাঁচ বছরের বেশি পুরনো সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষায় কেউ উদ্যোগী হচ্ছে না। রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ বেশিরভাগ গাড়ি বিপজ্জনক সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় চলছে প্রতিদিন। ঘন ঘন দুর্ঘটনার কারণে সিএনজি সিলিন্ডারের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লি. (আরপিজিসিএল)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গাড়িতে ব্যবহার করা গ্যাস সিলিন্ডার মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। মানহীন ও সময়মত পুনঃপরীক্ষা না করানোই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত দায় চাপাচ্ছে বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) কাঁধে। বলছে, বিষয়টি আইনের মধ্যে না থাকায় রোধ করা যাচ্ছে না সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। আরপিজিসিএল’র হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় ৫ লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে একই সিলিন্ডার পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহার করা গাড়ির সংখ্যা অর্ধেকের বেশি। পুনঃপরীক্ষা ছাড়াই চলছে সড়ক-মহাসড়কে।

রাজধানীতে চলতি প্রথম দুই মাসে এনজি (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস) সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যাত্রীবোঝাই দুটি গণপরিবহনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছ। দুটি বাস পুরোপুরি পুড়ে গেলেও সৌভাগ্যবশত বেঁচে যান যাত্রীরা।

সূত্র জানায়, সারা দেশে রিটেস্ট সেন্টার রয়েছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪টি। বিআরটিএ থেকে ফিটনেস নেয়ার সময় যদি রিটেস্ট বা পুনঃপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় তাহলে কমবে ঝুঁকি। আর বাঁচবে জীবন। বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা সাড়ে ৩৮ লাখ। এর মধ্যে ঢাকায় চলছে ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ১৯২। যার বড় একটি অংশ সিএনজিচালিত। কিন্তু এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। ঢাকাসহ সারা দেশে যানবাহনের একটি বড় অংশই সিএনজিচালিত। কিন্তু সিলিন্ডারের ফিটনেস পাঁচ বছর পর পর পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও, তা করা হচ্ছে না। জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে চার লাখ গ্যাস সিলিন্ডারের মধ্যে মাত্র ৫৩ হাজার ৮০০ সিলিন্ডারের রিটেস্টিং করা হয়েছে। মোট সিলিন্ডারের যা মাত্র ১৪ ভাগ। সারা দেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১৮০ সিএনজি কনভারশন ওয়ার্কশপ রয়েছে। দেশে গত ১৫ বছর ধরে সিএনজিচালিত গাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছে।

Ads
Ads