ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থান: এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে

  • ১০-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ১০:৩৮ pm
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

একটা সময়ে এমন ছিল যে, বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। কারণ দেশে একদিকে যে হারে মানুষ বেড়ে চলছিল আরেকদিকে কৃষিজমি কমে আসছিল তাতে করে দেশের সবারই কমবেশি দুশ্চিন্তা ছিল এ দেশের ভবিষ্যৎ কি! যে দেশ ‘ধনধান্যে পুষ্পেভরা’ বলে খ্যাত ছিল সে দেশের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে তো! প্রথমে এলো চীন থেকে ইরি সেই ষাট দশকে। হ্যাঁ, এ দেশের মাটির সাথে ভালোই খাপ খাইয়ে নিতে পারলো অতিদ্রুত এ ধান। এই ইরির প্রভাবেই এদেশের ঐতিহ্যবাহী অনেক প্রজাতির ধান একসময়ে ধীরে ধীরে হারাতে বসলো। কিন্তু সেসব সুস্বাদু ও সুগন্ধি চাল হারিয়ে যাক, আগে মানুষকে বাঁচতে হবে তো! এরপর দেশের কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট নানা প্রজাতির ধান উদ্ভাবনে সক্ষম হলো। আজ আমাদের এই গবেষকদের হাত ধরেই দেশের অর্থনীতিতে কৃষি একটা বড় ভূমিকা রাখছে। শুধু তা-ই নয়, কৃষিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি রীতিমতো ঈর্ষা জাগানিয়া সাফল্য আজ বিশ্বের দরবারেও প্রতিষ্ঠিত।

তারই জেরে বর্তমানে ধান উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানটি দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ অন্য কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধির ব্যাপক অবনতি হয়েছে অর্থাৎ মাইনাসে নেমে এসেছে। ধান উৎপাদনে বিশ্বের বড় দুই দেশ ভারতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ ও চীনের দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

বলাইবাহুল্য যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, বৈরী প্রকৃতির মধ্যেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে এখন বিশ্বের অনুসরণীয় উদাহরণ বাংলাদেশ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। অবশ্য বর্তমান স্বয়ংসম্পূর্ণতা বা উদ্বৃত্ত উৎপাদন একদিনে বা এক শাসকের আমলেই অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। যেহেতু আমরা প্রকৃতিগতভাবেই কৃষিপ্রধান দেশ সেকারণেই এ দেশের প্রতিটি সরকারই কমবেশি কৃষির উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও কৃষকের নিরলস পরিশ্রমের ফলে সাফল্য দেখা দিয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ সাফল্য টেকসই হবে কিনা? কারণ টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের বড় চ্যালেঞ্জ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ক্রমহ্রাসমান সম্পদ (কৃষিজমি, শ্রমিক, পানি ইত্যাদি) ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত (বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা প্রভৃতি)। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ। এছাড়া আগামীর কৃষি নিশ্চিতভাবে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। ফলে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আমাদের কৃষি কর্মকর্তাদের আরও দক্ষ ও আধুনিক হতে হবে। পাশাপাশি নিত্যনতুন পরিকল্পনা ও গবেষণাকর্মও অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যদিকে সরকারকে দেশের কৃষিজমি রক্ষায় জোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা, যেহারে অবাধে আবাসনপ্রকল্প বেড়ে  চলেছে  কৃষিজমির ওপর তাতে করে ভবিষ্যতে কৃষিজমিই থাকবে না বলে ইতোমধ্যেই আশঙ্কা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশের ৮০ শতাংশ জমিই আবাসনের গর্ভে হারিয়ে যাবে। কমে যাবে কৃষিজমি। এই উদ্বেগ কাটাতে এখন থেকেই সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। 

Ads
Ads