গুলিস্থান-ফুলবাড়িয়া-বঙ্গবাজার সড়ক বেদখল, ৪ বছরে বেহাত ৩১ কোটি টাকা!

  • ৯-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: আরিফুর রহমান ::

রাজধানীবাসীর সুবিধার কথা বিবেচনা করে নগরীর সড়কগুলোয় নির্ধারিত কিছু অংশকে বাসস্টান্ড করেছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন। তবে দক্ষিণ সিটির গুলিস্থান-ফুলবাড়িয়া-বঙ্গবাজার এলাকাটি এক বিশাল বাস টার্মিনালে রূপ নিয়েছে। এখানে রাস্তা দখল করে সারি সারি শতাধিক বাস থামিয়ে রাখা হয়। এই অবৈধ পরিবহন পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় নেতা, লাইনম্যান ও মালিক সমিতি। তাদের কথায় এইসব বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। অথচ ৪ বছর আগে এইসব স্থানের ইজারা দেওয়ার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের হেয়ালিপনার কারণে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ৩১ কোটি টাকা। এসব স্থানের নির্ধারিত ফি সিটি করপোরেশনে জমা না পড়লেও স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতাসহ পরিবহন নেতারা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। 

জানা গেছে, সরকার রুট পারমিট দিলেও একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চলাচলের নির্দেশনা উল্লেখ করা থাকে। কিন্তু তা একেবারেই মানা হচ্ছে না। রুট পারমিট পাওয়ার পর এইসব পরিবহনের মালিকদের নির্দেশেই বাসগুলো চলাচল করছে বলে একাধিক চালক-হেলপার এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। গত সোমবার দুপুরে গুলিস্থান এলাকার মাওয়া, ইলিশ, আনন্দ পরিবহনের লাইনম্যানদের সাথে কথা হলে তারা জানান, ‘আমাদের মালিক কর্তৃপক্ষ যেভাবে নির্দেশনা দেয় আমরা সেইভাবেই কাজ করি। তাছাড়া এই এলাকায় বহুবছর ধরেই আমরা এইভাবে গাড়ি পাকিং করে আসছি। আসলে এইদেশে সব কিছুই হয় টাকার বিনিময়ে।’ 

বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিবহনের একাধিক লাইনম্যান এর সাথে কথা হলে তারা বলেন, ‘আমাদের পরিবহনের মালিক সমিতির সভাপতি মো. খন্ডকার এনায়েত উল্লাহ্ খুব কাছের লোক। তিনি (মালিক) যেইভাবে মন চায় সেইভাবেই গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। দেখেন না সব গাড়ি মামলা খায়, কিন্তু আমাদের গাড়ি মামলা খায় না।’ ঢাকা-দোহার পরিবহনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লাইনম্যান বলেন, অধিকাংশ পরিবহন এই এলাকায় এইভাবেই গাড়ি রাখে; আর এইভাবেই চলছে কয়েকদিন ধরে। পরিবহন খাতে অস্থিরতার কারণে ঢাকার সব পরিবহননেই সমস্যা চলছে। তাছাড়া আগে এই কোম্পানির গাড়ি চলতো ত্রিশটি আর এখন চলে অল্প কয়েকটি। কি কারণে গাড়ি নিয়মিত রাস্তা বন্ধ করে রাখে জানতে চাইলে তিনি এই বিষয়টি এড়িয়ে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব স্থানের রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতাকারী নিয়োগ দেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং নিয়োজিত ব্যক্তি প্রতিদিন ২১ হাজার ১ শ’ টাকা রাজস্ব আদায় করে পরের দিন সকাল ১০টার মধ্যে করপোরেশনের নির্ধারিত বিভাগে জমা দেওয়ার কথা। এতে করে বছরে রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা ৭৭ লাখ ১ হাজার ৫ শত টাকা। সেই হিসেবে এ চার বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) রাজস্ব হারিয়েছে ৩০ কোটি ৮০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু ডিএসসিসির সহযোগিতাকারী নিয়োগের অভাবে বিশাল অংকের এ রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। এদিকে ভোরের পাতার অনুসন্ধানে আরো পাওয়া যায়, ২০১৪ সালের দিকে এই স্ট্যান্ড এলাকা লিজ নিয়েছিলো মো. বাচ্চু গাজি। তিনি কয়েকদিন টাকা তোলার পর তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলা দেয় স্থানীয় শ্রমিক লীগ। বাচ্চু গাজি বলেন, ‘আমি সরকারকে রাজস্ব দেওয়ার জন্যই এই জায়গাটি লিজ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিলাম এবং সিটি  কর্পোরেশনকে নিয়মিয়ত কয়েকদিন রাজস্ব দিয়েছিলামও। মামলা জটিলতার কারণে বেশ কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। তারপর আমিও আবার কয়েক দিনের মাথায় হাইকোর্টে রিট করলে আদালত আমার পক্ষে রায় দেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আসছি আর যাচ্ছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। তার দাবি, এই এলাকা কয়েকটি প্রভাবশাণী চক্রের নিয়ন্ত্রণে। তারাই মুলহোতা ।

এ বিষয়ে স্থানীয় শ্রমীক লীগের সভাপতি মো. নুরু হোসেনের সাথে ফোনে আলাপ করলে তিনি বিষয়টিকে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার বলে দাবি করেন। ডিএসসিসি’র সাবেক বাস টার্মিনাল এর ব্যবস্থাপক মো. মারুফ হাসান বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাইনা।’  ডিএসসিসি’র মহা ব্যবস্থাপক (পরিবহন) নিতাই চক্র সেন বলেন, ‘র্দীঘদিন লিজ কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। এখন আমরা এই বিষয়ে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি। অচিরেই এর সমাধান হবে।’ 

ফুলবাড়িয়ায় কর্মরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এই ঝামেলা বহু পুরোনো। আমি আসার পর থেকে বহুবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনভাবেই এইসব পরিবহনের লোকজনকে ঠিক করতে পারি নাই।’ এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. এনায়েতউল্লাহ্ সাথে মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোনে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায় নাই।

Ads
Ads