বিএনপিপন্থি আমিনুর-বাদলের পেটে জনতা ব্যাংক

  • ২৩-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ::

বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার প্রেতাত্মারাই রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ডুবিয়েছেন। ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম আমিনুর রহমানের উত্থান হয়েছিল মান্নান ভূঁইয়ার হাত ধরে। বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের নেতা ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ওয়ান- ইলেভেনের কুশীলবদের মাধ্যমে জনতা ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন আমিনুর রহমান। এক্ষেত্রে তদবির ছিল মানড়বান ভূঁইয়ার। এরপর টানা ৭ বছর ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সূত্র বলছে, আমিনুর রহমান দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। তার হাত ধরেই উত্থান হয়েছিল মানড়বান ভূঁইয়ার শিষ্য ইউনুছ বাদলের। জনতা ব্যাংক থেকে একাই সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন এক সময়কার গাড়িচোর চক্রের হোতা ইউনুছ বাদল।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটিকে ঝুঁকিতে ফেলা আরেকজন গ্রাহক হলেন আব্দুল কাদির মোল্লা। থারম্যাক্স নামের একটি শিল্প গ্রুপের মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ৯৭৩ কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন তিনি। কাদির মোল্লা এক সময় তিতাসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে গ্যাস চুরির। জনতা ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব মানড়বান ভূঁইয়ার বাড়ি নরসিংদী জেলায়। ইউনুছ বাদল ও আব্দুল কাদির মোল্লার উত্থানও নরসিংদী থেকে। জনতা ব্যাংক ধসিয়ে দেওয়ার এ দুই কারিগরের ব্যবসায়িক উত্থান হয়েছিল মানড়বান ভূঁইয়ার হাত ধরে। অথচ তারা দুই জনই ছিলেন নিমড়ববিত্ত পরিবারের সন্তান। অভাব-অনটনেই বেড়ে উঠেছেন তারা। মানড়বান ভূঁইয়ার এ দুই শিষ্যের অস্বাভাবিক উত্থানের পেছনে হাত রয়েছে জনতা ব্যাংকের সাবেক এমডি আমিনুর রহমানের। যদিও তিনিই এখন বড় আওয়ামী লীগার সাজার চেষ্টা করছেন।

জনতা ব্যাংককে ডুবিয়ে দিয়ে আমিনুর রহমান যোগ দিয়েছিলেন নতুন প্রজন্মের ইউনিয়ন ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি ব্যাংকটিতে নতুন করে নিয়োগ পেতে দৌড়ঝোঁপ শুরু করেছেন। তার নিয়োগের ফাইল চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের টেবিলে রয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ইতিহাস বিকৃতি ও বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করে ছাপানো বই নিয়ে এমনিতেই গভর্নর ফজলে কবির বিপদে আছেন। নতুন করে আমিনুর রহমানের মতো চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও বিএনপির এজেন্টকে ইউনিয়ন ব্যাংকের উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়ে গভর্নর নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। জনতা ব্যাংকের তথ্যমতে, এস এম আমিনুর রহমান জনতা ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব গ্রহণের সময় ২০০৮ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। কিন্তু ৭ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৪ সালে তিনি ব্যাংকটির ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রেখে যান। আমিনুর রহমানের বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। তার দায়িত্ব পালনের সময়ই ২০১২ সালে রেকর্ড ১ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে জনতা ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বিষয়টি আমরা যাচাই-বাছাই করছি; এরপর আমরা সিন্ধান্ত নিবো। বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারিতে ২০১২ সালে ভিত নড়ে গিয়েছিল জনতা ব্যাংকের। চলতি বছরের শুরুতে ঝড় উঠেছিল এননটেক্স গ্রুপের সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি নিয়ে। তারপর উদঘাটিত হয়েছে ব্যাংকটির ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের ৪ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি। এর বাইরেও গত এক দশকে ছোট-বড় নানা জালিয়াতির ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়েছে জনগণের অর্থে পরিচালিত ব্যাংকটি। লাগামহীন লুটপাটের কারণে বেসিক ব্যাংকের মতোই ডুবতে বসেছে জনতা ব্যাংক।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির লুটপাট শুরু হয়েছিল সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম আমিনুর রহমানের হাত ধরে। ২০০৮ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। নতুন করে খেলাপির ঝুঁকিতে আছে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক এমডি এস এম আমিনুর রহমানের অপকীর্তিই জনতা ব্যাংককে ডুবিয়েছে। তার সময়ে বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়েছে। বিসমিল্লাহ গ্রুপ, এননটেক্স, ক্রিসেন্টসহ জনতা ব্যাংকের সব বৃহৎ ঋণ কেলেঙ্কারি আমিনুর রহমানের হাতে সংগঠিত হয়েছে। টানা ৭ বছর ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার দায়িত্ব পালনের সময়টিই ব্যাংকটির অন্ধকার যুগের সুচনা করেছে। এস এম আমিনুর রহমানই হলেন জনতা ব্যাংক লুটের ‘মাস্টারমাইন্ড’।
বিসমিল্লাহ গ্রুপের চেয়েও পাঁচগুণ বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে এননটেক্স গ্রুপ। এস এম আমিনুর রহমানের মেয়াদেই জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন গ্রুপটির কর্ণধার মো. ইউনুছ বাদল। ২০০৭ সালে গাড়িচোর চক্রের হোতা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া ইউনুছ বাদলকে রাতারাতি বিশিষ্ট শিল্পপতি বানিয়ে দিয়েছে আমিনুর রহমান।

জুভেনিল সোয়েটার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসায় নামেন ইউনুছ বাদল। ২০০৪ সালে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় গ্রাহক হওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি ব্যাংকিং সুবিধা নেওয়া শুরু করে। ওই শাখার বেশি ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। তখন পর্যন্ত ইউনুছ বাদলের যাত্রা ছিল খুবই সীমিত পরিসরে। ২০১০ সালে এসে ভাগ্যের দুয়ার খুলে যায় তার। সে বছরের ২৫ আগস্টে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডের নামে ৮০ কোটি টাকা ঋণ পান তিনি। এরপর শুধুই বাড়তে থাকে তার ঋণের পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ঋণের অর্থ উপযুক্ত খাতে ব্যয় না করে অন্যত্র স্থানান্তরের অভিযোগও আছে ইউনুছ বাদলের বিরুদ্ধে। ২০১৫ সাল শেষে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডর ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৯ কোটি টাকায়। সম্প্রতি জাতীয় সংসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেওয়া দেশের শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ৭৫ নম্বরে রয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড। ২০১০ সালে ৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরের বছরই জনতা ব্যাংক থেকে ৫৭১ কোটি টাকা বের করেছেন ইউনুছ বাদল। এরপর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে ২০১২ সালে ৮১৬ কোটি, ২০১৩ সালে ১ হাজার ১৯৯ কোটি, ২০১৪ সালে ৫৬০ কোটি ও ২০১৫ সালে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন তিনি। ইউনুছ বাদলের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২০১১ সালে সিমি নিট টেক্সকে ৯৫ কোটি, সুপ্রভ কম্পোজিটকে ৩৮০ কোটি এবং এফকে নিটের নামে ৯৬ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করে জনতা ব্যাংকের এমডি এস এম আমিনুর রহমান। পরের বছর সিমরান কম্পোজিটকে ৪৫০ কোটি, জারা নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, গ্যাট নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি এবং জেওয়াইবি নিট টেক্সকে ৯৩ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১২-১৩ সাল পর্যন্ত এমএইচ গোল্ডেন জুটকে দেওয়া হয় ১৫১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে লামিসা স্পিনিংকে ১৩৪ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্স ৩২০ কোটি, স্ট্রাইগার কম্পোজিটকে ৯০ কোটি, আলভি নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, এম নূর সোয়েটার্সকে ৬০ কোটি ও সপ্রভ স্পিনিংকে ৪৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে আবার জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিংকে ৫৩ কোটি, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিংকে ১৫৫ কোটি, শাইনিং নিট টেক্সকে ৮৮ কোটি ও জারা ডেনিমকে দেওয়া হয় ৫৫ কোটি টাকা। এভাবে মাত্র ৭ বছরের ব্যবধানে এননটেক্স গ্রুপকে ৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা বের করে দিয়েছেন জনতা ব্যাংকের তৎকালীন এমডি আমিনুর রহমান।

বিতরণকৃত এ ঋণ থেকে তিনি বড় অংকের কমিশন নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এননটেক্স গ্রুপের কাছ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। সোনালী ব্যাংকের হলমার্কের মতোই জনতা ব্যাংকের জন্য এননটেক্স গলার কাঁটা হিসেবে আটকেছে। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স কেলেঙ্কারিও শুরু হয়েছিল তৎকালীন এমডি আমিনুর রহমানের হাত ধরে।

এছাড়া ২০১৫ সালে জনতা ব্যাংকের দুটি শাখায় হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ১১টি প্রতিষ্ঠান এ জালিয়াতি করে। এর মধ্যে জনতা ভবন কর্পোরেট শাখায় ৬৫৫ কোটি এবং স্থানীয় কার্যালয় শাখায় ২৬৬ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়। ২০১১ থেকে পরবর্তী তিন বছরে এ কেলেঙ্কারি সংগঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত জামানতও নেই। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জামানতের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখানোর মাধ্যমেও গ্রাহককে বেশি ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন শাখার কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গেও তৎকালীন এমডি আমিনুর রহমান যুক্ত ছিলেন।

Ads
Ads