দাফনের ১১ দিন পর গৃহবধূ জীবিত উদ্ধার!

  • ১০-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ভোরের পাতা ডেস্ক
গৃহবধূ সাথী খাতুন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন গত ১৪ জুলাই। এরপর তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন যশোরের সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের জলকর গ্রামের আজিজ লস্করের বাড়িতে। তবে সেই তথ্য জানতেন না সাথীর পরিবার। এরই মধ্যে সাথীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা আমজাদ হোসেন।     

গত ২৯ আগস্ট রাতে যশোরে সরকারি সিটি কলেজ এলাকা থেকে পলিথিনে মোড়ানো এক তরুণীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পঁচে যাওয়া লাশটি উদ্ধারের পরের দিন বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে পুলিশ। ওই দিন খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানায় যান আমজাদ হোসেন। তিনি লাশের তুলে রাখা ছবি দেখে পুলিশকে জানান, সেটি তার মেয়ে সাথীরই লাশ। 

কিন্তু তদন্তে নেমে রোববার গৃহবধূ সাথী খাতুনকে উদ্ধার করে পুলিশ। এতে ভুল ভাঙে পুলিশ ও সাথীর পরিবারের। ওই তরুণীর লাশ দাফনের ১১ দিন পর জানা যায়, সাথী বেঁচে আছেন।   

উদ্ধার হওয়া সাথী খাতুন যশোরের চৌগাছার নয়ড়া গ্রামের আমজাদ হোসেনের মেয়ে এবং একই উপজেলা চাঁদপাড়া গ্রামের গোলাম মোস্তফার স্ত্রী। এহসান নামের ছয় বছরের এক ছেলে সন্তান রয়েছে সাথীর সংসারে।

সাথীর ভাই বিপ্লব হোসেন জানান, ওই সময়ে লাশ শনাক্ত করতে ভুল করেছিলেন তার বাবা। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে তদন্ত হলে তার ভুল ভেঙে যায়। 
উদ্ধার হওয়ার পর সাথী খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বামী নির্যাতন করত। তাই নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে ১৪ জুলাই স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যশোরে চলে আসি। শহরের নিউ মার্কেটে বাসে নেমে এক ঘণ্টা বসেছিলাম। একপর্যায়ে মালয়েশিয়া প্রবাসী চাঁদপাড়া গ্রামের মান্নুকে ফোন দিই। তিনি ধৈর্য্য ধরতে বলেন, যেন আত্মহত্যা না করি। একপর্যায়ে সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের জলকর গ্রামে যাই। যাওয়ার পথে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ভেঙে পানিতে ফেলে দিই। এরপর ওই গ্রামের আজিজ লস্করের বাড়িতে আশ্রয় নিই।’

সাথী বলেন, ‘গত শুক্রবার আজিজ লস্কর পত্রিকার পাতায় আমার মৃত্যুর সংবাদ দেখেন। তারপর থেকে তিনি আমাকে আর আশ্রয় দিতে রাজি হননি। এরপর বাড়িতে আব্বার মোবাইল নম্বরে (মুখস্থ ছিল) কল করি। পুলিশকেও বিষয়টা জানাই। পুলিশ আজ  আমাকে উদ্ধার করে।’  
 
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আমিরুজ্জামান জানান, এই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি খুঁজে পান চাঞ্চল্যকর তথ্য। মেয়েটির সঙ্গে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ছেলের সম্পর্ক ছিল। তদন্ত করতে গিয়ে পরিবারের লোকজন জানায়, গত ১৬ মার্চ সাথী খাতুন ভারতে গিয়েছিল চিকিৎসার জন্য। এক মাস ১১ দিন পর চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরে। ওই সময় সাথী একাই ভারতে গিয়েছিল বলে জানায় পরিবারের লোকেরা। বিষয়টি সন্দেহ হলে সাথীর পাসপোর্ট যাচাই করা হয়। পাসপোর্ট দেখে জানা যায়, সাথী ১৬-২৪ মার্চ ভারতে ছিল। কিন্তু পরিবারের লোকজন বলছে, সাথী ১ মাস ১১ দিন ভারতে ছিল।

এসআই আমিরুজ্জামান জানান, তদন্তে দেখা যায়, ভারতে থাকাকালীন সাথী সেখানকার একজনের মোবাইল নম্বর থেকে কথা বলেছিল। সেই নম্বর সংগ্রহ করা হয়। নম্বরে কথা বলে জানা যায়, সাথী ভারতে প্রবেশ করার এক ঘণ্টা আগে মালেশিয়া প্রবাসী চাঁদপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মান্নু ভারতে হাজির হন। সেখান থেকে তারা দুজন ভারতে চিকিৎসার জন্য যান। পরে চিকিৎসা শেষে ২৪ মার্চ সাথী ও মান্নু দেশে আসেন। মান্নু মালয়েশিয়া থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও সেটি জানতেন না তার ও সাথীর পরিবারের কেউ। ২৪ মার্চ থেকে এক মাসের বেশি সময় সাথী ও মান্নু যশোর সদর উপজেলার জলকর গ্রামের আজিজ লস্করের বাড়িতে অবস্থান করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গত এপ্রিলের শেষের দিকে মান্নু মালয়েশিয়া ফিরে যান। আর সাথী যান স্বামীর বাড়িতে। বাড়ির সবাই জানে, সাথী চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। সর্বশেষ গত ১৪ জুলাই সাথী স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যান। এরপর সদর উপজেলার জলকর গ্রামে পূর্ব পরিচিত আজিজ লস্করের বাড়িতে আশ্রয় নেন। রোববার সকালে সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে সাথীর বাবার জিম্মায় তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে।

এসআই আমিরুজ্জামান বলেন, মান্নুর সঙ্গে আজিজ লস্করের পরিবারের পরিচয় ২০১২ সালে। মালেশিয়া থেকে রং নাম্বারে আজিজ লস্করের পরিবারের সঙ্গে মান্নুর পরিচয় হয়। আর আজিজ দম্পতির কোনো সন্তান না থাকায় মান্নু তাদের ধর্ম বাবা-মা ডাকেন। সেই থেকে তাদের সম্পর্ক।

এদিকে সাথী জীবিত ফিরে আসায় গলাকাটা ও পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় উদ্ধার ওই তরুণীর লাশটি কার-সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে এসআই আমিরুজ্জামান বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া লাশটি সাথীর বলে ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে আসল রহস্য উন্মোচন হয়েছে। এবার ওই লাশটি আসলে কার, সেই রহস্য উদঘাটনে কাজ করব।’

Ads
Ads