বিকালে অস্ত্রের মহড়া রাতে গুলিতে নিহত

  • ৯-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ভোরের পাতা ডেস্ক

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তুলে নিয়ে যাওয়ার ১১ ঘণ্টা পর গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের ভুলেশ্বর গ্রামের নেতারটেক নামক স্থানের গজারি বন থেকে দুর্ধর্ষ ‘বন ও ভূমিদস্যু’ এবং ১৬ মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি জসিম ইকবাল ওরফে মুচি জসিমের (৩৬) গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে কাপাসিয়া থানাপুলিশ। গতকাল শুক্রবার ভোর ৪টার দিকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ লাশটি উদ্ধার করা হয়।
কাপাসিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবুবকর সিদ্দিক নিহতের নাম উল্লেখ না করে জানান, দুদল সন্ত্রাসীর গোলাগুলিতে ওই যুবকটির মৃত্যু হয়। কিন্তু ওই সন্ত্রাসীরা কারা তা এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। লাশ উদ্ধারের ঘটনায় কাপাসিয়া থানায় এসআই সুমন মিয়া বাদী হয়ে একটি হত্যা এবং আরেকটি অস্ত্র মামলা করেছেন। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

নিহত জসিম ইকবাল কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকার ‘বনদস্যু’ এবং সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে।
পরিবারের দাবি, বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকার জোড়া পাম্প এলাকা থেকে জসিমকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, তুলে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে ওই এলাকায় অনুসারীদের নিয়ে সশস্ত্র মহড়া দেন জসিম। তিনি ছিলেন এলাকাবাসীর কাছে আতঙ্ক।
কাপাসিয়া থানা সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ৩টার দিকে এসআই সুমনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ওই এলাকায় টহল দিচ্ছিল। হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবককে একটি পিস্তলসহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। এ সময় পুলিশ স্থানীয়দের সহায়তায় সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালায়। পরে কাপাসিয়া থানার ওসি (অপারেশন) মনিরুজ্জামান খান ঘটনাস্থল থেকে ছাই রঙের প্যান্ট ও হলুদ রঙের শার্ট পরিহিত জসিমকে উদ্ধার করে কাপাসিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে জসিম ইকবাল ওরফে মুচি জসিম পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নাকি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মুচি জসিম নিহত হওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকার সাধারণ মানুষ। তাদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে যে অরাজকতা চালিয়ে আসছিলেন মুচি জসিম, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তার অবসান হলো। সেই সঙ্গে তার ছত্রছায়ায় যারা কাজ করছিলেন তাদের হাত থেকেও সাধারণ মানুষ মুক্ত হলো।
উল্লেখ্য, মুচি জসিমকে গ্রেপ্তারের খবরে বৃহস্পতিবার এলাকাবাসী কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ও জোড়া পাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেন। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রাতে জসিমের লাশ চন্দ্রা এলাকায় দাফন করতে নিয়ে আসলে বাধা দেয় এলাকাবাসী। পরে স্বজনরা বাধ্য হয়ে লাশ নিয়ে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে জসিম ২০-২৫ বছর পূর্বে চন্দ্রা এলাকায় এসে জুতা তৈরির কারখানায় পিয়নের চাকরি নেন। সেই থেকে এলাকার মানুষের কাছে তিনি ‘মুচি জসিম’ নামে পরিচিত। সেই জসিম এখন শতকোটি টাকার মালিক। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংসদ নামে একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াতেন পুলিশের কথিত এ সোর্স। ১৬টি পরোয়ানাভুক্ত মামলার আসামি হয়েও পুলিশের সঙ্গে ছিল তার নিত্য ওঠবস। সরকারের ৩০০ বিঘা জায়গা দখল করে বন কেটে তিনি গড়ে তোলেন নতুন এক গ্রাম। টাকার বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক জমি জবরদখলেও ছিলেন তিনি সিদ্ধহস্ত।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, একটি হত্যা মামলায় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতে গিয়ে গোটা জীবনটাই বদলে যায় জসিমের। একে একে ১৬ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হলেও প্রকাশ্যে ঘুরতেন তিনি। তার অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হন অসংখ্য নিরীহ মানুষ। বাদ যাননি সরকারি কর্মকর্তাও। ভাওয়াল গড়ের বড় বড় শাল-গজারি গাছ কেটে দখল করতে থাকেন বিঘার পর বিঘা জমি। এভাবে প্রায় ৩০০ বিঘা বনের জমি দখল করে নেন মুচি জসিম। এর পর তার বিরুদ্ধে আদালতে বন বিভাগ ১৮টি মামলা করে। সাধারণ মানুষ থানায় জিডি করেন ৮টি। ১৮টি মামলার মধ্যে ১৬টিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। আর দুটি মামলায় আদালত থেকে ৬ মাস করে সাজা দেওয়া হয়েছে।
২০১৫ সালের ২১ আগস্ট চন্দ্রায় জাতির পিতা কলেজ মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কালিয়াকৈর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলামকে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় আসামিদের ধরিয়ে দিতে থানাপুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন জসিম। অল্প সময়ের ব্যবধানে পুলিশের বিশ্বস্ততা অর্জন করেন। অভিযোগ আছে, ওই হত্যা মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে এলাকার মানুষকে জিম্মি করেন জসিম। তারই সহযোগিতায় কালিয়াকৈর থানার পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। হত্যাকা- সম্পর্কে কিছুই জানে না এমন মানুষকেও ধরে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। পরে জসিম মধ্যস্থতা করে তাদের ছাড়িয়ে দিতেন, বিনিময়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে আদায় করতেন ১০-১৫ লাখ করে টাকা।
আরও অভিযোগ আছে, চন্দ্রা এলাকায় মানুষের জমি জবরদখলে মুচি জসিমের জুড়িমেলা ভার। লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি চুক্তিভিত্তিক জমি জবরদখল করে দিতেন। তার বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে গ্রেপ্তার-বাণিজ্য চালানোর অভিযোগও আছে। ওসমান পালোয়ান নামে এক কৃষক জানান, তার ভাতিজা রাজীবের পকেটে কৌশলে ইয়াবা ঢুকিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেন জসিম। পরে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটক করা লোকজনকে প্রথমে জসিমের আস্তানায় নেওয়া হতো। সেখানে বসত ‘গণআদালত’। জসিমের দাবি করা অর্থ পরিশোধ করলে জোড়া পাম্প এলাকা থেকেই ছেড়ে দেওয়া হতো আটককৃতদের। আর অর্থ পরিশোধে অপারগ হলে তাদের নিয়ে যাওয়া হতো ডিবি অফিসে। মাদক মামলা ও হত্যা মামলার আসামি করার ভয় দেখিয়ে এবং শারীরিক অত্যাচার করে লাখ লাখ টাকা আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হতো। তা ছাড়া স্থানীয় লোকজনের জমি দখল এবং একজনের জমি আরেকজনকে দখল করে দেওয়ার কাজও জসিম করতেন বলে অভিযোগ আছে।

Ads
Ads