একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসন,জিততে বহু সমিকরণ মেলাতে হবে প্রার্থীদের

  • ১৬-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

আর মাত্র কয়েকমাস পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নএলাকার মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ ভোটারদের নিজের দলে ভেড়াতে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন। ঢাকা-১৬ আসনেও এর ব্যাতিক্রম নয়। তবে ভোটার বলছেন, এ আসনে ভোটে জিততে হলে বহু সমিকরণ মিলিয়েই নির্বাচিত হতে হবে প্রার্থীদের। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এখানে যারা প্রার্থী হচ্ছেন প্রায় সবাই কোন না কোন দিক থেকে এলাকায় তাদেও প্রভাব রয়েছে। একারণে এখানে ভোটের অনেক জটিল হিসেব রয়ে গেছে। ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনবার আওয়ামী লীগ, দুবার বিএনপি জিতেছিল। আসনটিতে দল দুটির পাল্টাপাল্টি জেতার ধারা উল্টে যায় বহুল আলোচিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে, যাতে বিএনপি অংশ নেয়নি।

রাজধানী ঢাকার উত্তরের সীমান্তবর্তী মিরপুরের পল্লবী ও রূপনগর থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২,৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড এই আসনের অন্তর্ভুক্ত। ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৬৩ হাজার। একসময় বৃহত্তর মিরপুরের এই আসনটি ছিল ঢাকা-১১তে। তা ভেঙে তিনটি আসন করা হয়। তার মধ্যে ঢাকা-১৪ আসনের বর্তমান সাংসদ আসলামুল হক, ১৫ আসনে কামাল আহমেদ মজুমদার আর ১৬ আসনের সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্। তিনজনই আওয়ামী লীগের।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল হবে। যদিও এখনো বিএনপি সেভাবে মাঠে নেই। দলটির নামকরা সম্ভাব্য কোনো প্রার্থীরও দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। কার্যত নয় বছর ধরে এলাকায় সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্র একচ্ছত্র আধিপত্য। নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়নে, প্রচারে-পোস্টারে দৃশ্যত আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। তবু স্থানীয় লোকজনের ধারণা, আড়ালে বিএনপিও শক্তিশালী। প্রার্থী যিনিই হোন, আওয়ামী লীগের জন্য জেতা এত সহজ হবে না।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী ও এলাকাবাসী বলছেন, মিরপুরের শেষ প্রান্তের এই আসনটিতে বড় সমস্যা ‘মাদক’। এরপর আছে পয়োনালার অভাব, খানাখন্দ ও রাস্তাঘাটের দুর্ভোগ। আছে তৈরি পোশাকের কারখানা ঘিরে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি। বছরে কয়েক দফায় এলাকার নানা বস্তিতে আগুন লাগে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বর্ধিত পল্লবীর একজন স্থায়ী বাসিন্দা বলেন, এলাকার মাদক, চাঁদাবাজি, বস্তির আগুন সবকিছুর পেছনে একজন জনপ্রতিনিধির মদদ আছে। পয়োনালা ও রাস্তাঘাটের দুর্ভোগ। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলেই অনেক এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। এর মধ্যে পল্লবীর বি ব্লক, কালশী, বাউনিয়া বাঁধ এলাকা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রূপনগর, ৬ নম্বর, বর্ধিত পল্লবী, ইস্টার্ন হাউজিং আবাসিক এলাকা, আলবদী গ্রামে রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব খারাপ। নির্বাচনী আসনের চারটি ওয়ার্ডের তিনটিতেই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কমিউনিটি সেন্টার নেই। কেবল ২ নম্বর ওয়ার্ডে কমিউনিটি সেন্টার আছে। ফলে এলাকাবাসীকে অনেক টাকা খরচায় ব্যক্তিগত কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে।

সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ্ বলেন, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার ও এলাকাকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইমুক্ত করেছি। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের যেসব রাস্তা সংস্কার ও প্রশস্ত করা হয়েছে বা হচ্ছে, এর সবই প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে এই আসনে প্রার্থিতা নিয়ে আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব আছে। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বেশির ভাগই বর্তমান সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ্র বিপক্ষে। আবার নির্বাচন ঘিরে মোল্লাহ্ পরিবার ও গোষ্ঠীতেও বিভক্তি আছে। সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ্র বড় ভাই এখলাস উদ্দিন মোল্লাহ্ও মনোনয়ন চাইবেন, যিনি ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ইতিমধ্যে এখলাস মোল্লাহ্ এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার লাগিয়েছেন।

এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে দুই মোল্লাহ্র শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী এস এম মান্নান ওরফে কচি। তিনি তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের (উত্তর) সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এস এম মান্নান ২০১৪ সালের নির্বাচনে ইলিয়াস মোল্লাহ্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ২৫ হাজার ১৩৩ ভোট পান। ইয়িলাস মোল্লাহ্ পেয়েছিলেন ৩৫ হাজার ৮৫৫ ভোট।এস এম মান্নান ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে বলেন, নেত্রী (শেখ হাসিনা) যদি মিরপুরে ইলিয়াস মোল্লাহ্র সমাবেশে না যেতেন, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতো। আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে আমি মনোনয়ন চাইব। না দিলে দল যাঁকে নৌকা প্রতীক দেয়, তাঁর জন্য কাজ করব।

এর বাইরে মহিলা আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগরীর সভাপতি শাহিদা তারেখ, মুক্তিযোদ্ধা আমীর হোসেন মোল্লাহ্ ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের (উত্তর) সাংগঠনিক সম্পাদক ফকির মহিউদ্দিনও মনোনয়নপ্রত্যাশী। ফকির মহিউদ্দিন হারুন মোল্লাহ্র ছোট ভাই আবদুর রশীদ মোল্লাহ্র মেয়ের জামাই। শাহিদা তারেখ সাবেক কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ।এছাড়া ও ইসমাঈল হোসেন বেনু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদন্দ্বীতা করবেন যিনি ১৯৮৮ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এক টানা দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশেনের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইসমাইল হোসেন বেনু বলেন, এই এলাকার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এখানে কোন সরকারী হাসপাতাল না থাকা। রোগীদের এখান থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বহু বেগ পেতে হয়। কখনও হাসপাতালে নিতে নিতে পথেই রোগীর মৃত্যু হয়। আমি নির্বাচিত হতে পারলে সবার আগে এই মহৎ কাজটি করব। এছাড়াও ১২ নং বাস ষ্টান্ডটি স্থায়ীভাবে ৯ নং সেকশনে সরকারী জায়গায় স্থানান্তর করব ফলে ১২ নং ষ্টান্ড তথা এই রোডে আর কোন যানজট থাকবে না। পাশে ন্যশনাল ডিফেন্স কলেজ এ বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে আসা সামরিক অফিসাররা জ্যামের কারনে সৃষ্ট নানা ধরনের বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাবেন। তাছাড়া খেলার মাঠ, ব্লক ভিক্তিক বেয়ামাগার ও পাঠাগার এবং একটি কবরস্থান নির্মানের পরিকল্পনাও আছে। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য মিরপুর ৮নং সেকসন দুয়ারীপাড়ায় পল্লবী ডিগ্রি কলেজ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ২নং ওয়ার্ড কমিনিউটি সেন্টার নির্মাণ করেন। যেখানে শিশুদের নাচ ও গান শিখানোর পাশাপাশি ডে কেয়ার, চাইল্ড কেয়ার এবং পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে মহিলাদের স্বাস্থ্য সেবা ব্যাস্থা চালু রয়েছে। পয় নিষ্কাশনের জন্য উত্তর ত-ব্লক থেকে মুসলিম বাজার এবং ধ-ব্লক হয়ে কালশি প্রধান সড়ক পর্যন্ত রড ড্রেন নির্মাণ শিশু পার্ক নির্মাণ রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রশস্তকরণ তার করা উন্নয়নের মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও এ ব্লক লাল মাঠটি (২নং ওয়ার্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ্ মাঠ মর্তমানে হারুন মোল্লা ঈদগাহ্ মাঠ) বে দখল হলে ১৯৮২ সালে এলাকাবাসীদের সাথে নিয়ে তিনি ভূমিদুস্যুদের কাছ থেকে মাঠটি দখলমুক্ত করেন। তিনি নিজ উদ্যোগে অনেক ধর্মীয় সামাজিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছেন এবং প্রধান উপদেষ্ঠা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামাী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তার মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন জনগণ এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি সচেতন তাই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা শুধু মার্কা দেখে নয় যোগ্য প্রার্থী দেখেই ভোট দিবে।

বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো জানায়, এই আসনে প্রার্থিতা নিয়ে বিএনপিতে তেমন বিরোধ নেই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া। তিনি ইলিয়াস মোল্লাহ্র কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। তিনি এই এলাকার বাসিন্দা নন। বিহারিদের নাগরিকত্ব প্রশ্নে একটি মামলায় রফিকুল ইসলাম উচ্চ আদালতে তাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। মিরপুরের এই আসনটিতে বিহারিদের বড় একটি অংশের বসবাস আছে। সে বিবেচনায় বিএনপি তখন তাঁকে প্রার্থী করেছিল। অসুস্থতার কারণে রফিকুল ইসলাম মিয়া অনেক দিন ধরে দলীয় কর্মকান্ডে নিষ্ক্রিয় বলে জানা গেছে। তবে রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, ‘আমি সুস্থ। দল নির্বাচনে গেলে নির্বাচন করতে চাই। বাকি দলের সিদ্ধান্ত।

এর বাইরে আসনটিতে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসান মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ১৭ বছর কাউন্সিলর ছিলেন। ডেপুটি মেয়রও ছিলেন। এলাকায় তাঁর সাংগঠনিক যোগাযোগ ভালো। তবে মামলা-মোকদ্দমার কারণে তিনি প্রকাশ্যে নেই। আহসান উল্লাহ হাসান বলেন, দল যদি নির্বাচনে যায়, আমাকে মনোনয়ন দেয়, আমি এ জন্য প্রস্তুত। এই এলাকার অলিগলি, ঘরবাড়ি সবই আমার চেনাজানা।

এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক ও ঢাকা মহানগর বিএনপির (উত্তর) সহসভাপতি এ কে এম মোয়াজ্জেম হোসেনও মনোনয়ন চাইবেন। আমিনুল ২০১৪ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দ্রুত দলে জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর খেলাধুলা, বেড়ে ওঠা এই এলাকায়। আর মোয়াজ্জেম দলের পুরোনো কর্মী। তিনি এলাকায় সরকারি জমি বরাদ্দ নিয়ে জিয়াউর রহমানে নামে দুটি হাইস্কুল ও কলেজ করেছেন। তিনি এলাকায় বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

এ বিষয়ে এ কে এম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, দল থেকে মনোনয়ন পেলে আমিও জয়ী হতে পারবো।

Ads
Ads