বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দাতার দুর্নীতিবাজ ছেলে নূর মোহাম্মদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থী

  • ৭-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: উৎপল দাস ::

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় পাকিস্তানের পক্ষের সাক্ষী নুন্দর আলীর ছেলে পুলিশের আলোচিত সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও মরক্কোর রাষ্ট্রদূত এবং বিএনপি ও তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত নূর মোহাম্মদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান।

ইতিমধ্যে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা আয় করায় গত ৮ আগস্ট তাকে নোটিশ পাঠিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন।

এদিকে তিনি বর্তমানে কিশোরগঞ্জ-২ আসন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী নূর মোহাম্মদের পারিবারিক সুত্র থেকে জানা যায় তার পিতা নুন্দর আলী। নূর মোহাম্মদ ছিলেন একজন বিএনপির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। কটিয়াদী উপজেলা স্থানীয় আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আইন উদ্দিন এর সত্যতা জানান নূর মোহাম্মদের পিতা নুন্দর আলী ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পাকিস্তান সরকার পক্ষের প্রধান সাক্ষী ছিলেন। সেই মামলায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মরত ও প্রাক্তন সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি অফিসারদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

সেখানে বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে সাক্ষী দিয়েছিল নুন্দর আলী। সাবেক আইজিপি এর নিজ ইউনিয়ন চাঁদপুরের আওয়ামীলীগ সভাপতি মোঃ রতন এর সত্যতা স্বীকার করে জানায় তারেক জিয়া যখন বাংলাদেশে ছিলো নূর মোহাম্মদ তার সকল অপকর্মের সঙ্গী হিসেবে সাথে থাকতো। এ ছাড়াও বিভিন্ন সূত্রে তারেক জিয়ার সাথে বিভিন্ন ছবি দেখা যায়। তিনি বর্তমানে কিশোরগঞ্জ-২ আসন আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে যাদের দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা সম্পূর্ণ বিএনপির নিবেদিত কর্মী। তারও কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।এলাকাবাসীদের দাবী এই রকম একজন অসাধু ব্যক্তি যদি মনোনয়ন পায় তাহলে এলাকায় অশান্তি বিরাজ করবে।

নূর মোহাম্মদের অসংখ্য দুর্নীতির খোঁজ পাওয়ায় ৮ আগস্ট নূর মোহাম্মদকে দুদকের পাঠানো নোটিশে উল্লেখ করা হয়, “আপনার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের খোঁজ পাওয়ায় আপনি ও আপনার স্ত্রীসহ আপনার উপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের সম্পদ বিবরণী সাত কার্যদিবসের মধ্যে দাখিল করতে বলা হলো…।

দুদকের একটি টিম নূর মোহাম্মদের সম্পদ অনুসন্ধানের বিষয়ে তদন্ত করছে। এ টিমের প্রধান ও দুদকের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল জাহিদ সোমবার বলেন, নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান করছে। ইতোমধ্যে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিবরণী জমা দিতে ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলের মাধ্যমে মরক্কোয় নোটিশ পাঠিয়েছে দুদক।

সাবেক আইজিপি ও বর্তমান রাষ্ট্রদূত নূর মোহাম্মদের সম্পদের তালিকা দেখে অবাক দুদক! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার এ পরিমাণ সম্পদের অভিযোগ আমরা পাইনি। বৈধ পন্থায় এ পরিমাণ সম্পদ কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।

সূত্র জানায়, দুদক জানতে পেরেছে ২৮ বছরের চাকরি জীবনে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন নূর মোহাম্মদ। নূর মোহাম্মদ চাকরি জীবনের ২৮ বছরে কত টাকা আয় করেছেন তার তথ্য চেয়ে পুলিশ বাহিনীর কাছে চিঠি দিয়েছে দুদক।

এছাড়া অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নূর মোহাম্মদের আর্থিক ব্যাংক লেনদেনের বিষয়, ভূমি অফিসের কাছে জমিজমার বিষয় জানার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতেও চিঠি দেন। এর মধ্যে অনেক চিঠির জবাব এসেছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া নূর মোহাম্মদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ জানার অংশ হিসেবে অর্থ-সম্পদের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভূমি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দুদক চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার যেসব সম্পদ পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে- আইজিপি থাকা অবস্থায় সর্বশেষ এক বছরে কটিয়াদীতে ১৩ কোটি টাকায় জমি কিনেছেন ৪০০ বিঘা। বেইলি রোড ও মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিংয়ে ৯ কোটি টাকায় কিনেছেন ৫টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আইজিপি থাকাকালে ৬, মিন্টো রোডে সরকারি অনুমোদন ব্যতীত ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থানার চান্দপুর গ্রামের মীরেরপাড়ায় ২০ বিঘা জমির ওপর একটি রাজকীয় বাড়ি। এর মধ্যে রয়েছে রেলওয়ের ৪ বিঘা জমি। যার মূল্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। বাড়ির নির্মাণ ব্যয় ৩ কোটি টাকা। বাড়ি থেকে ১ মাইল পূর্বে ৪০০ বিঘা জমির ওপর ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি মাছের প্রকল্প। বাড়ি থেকে প্রকল্প পর্যন্ত যাওয়ার জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২৫ ফুট প্রস্থের পাকা রাস্তা। খুলনায় ৩৫০ বিঘা জমির ওপর ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তুলেছেন চিংড়ি প্রকল্প।

২০০৮ সালে পূর্বাচলে র্যানরিকা নামক প্রকল্পের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে নিয়েছেন ১০ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। পল্লবীতে ৯ কোটি টাকায় বানিয়েছেন জমির প্রকল্প। তার স্ত্রী পনম সমিতির চেয়ারম্যান থাকাকালে ২ কোটি টাকা আৎসাতের অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের মাওয়ায় ২০ কোটি টাকায় কিনেছেন ৩০ বিঘা জমি। স্কাইওয়েজ কোম্পানির মালিক মানিক মিয়ার (বাড়ি ৩৯৬, রোড ৬, বারিধারা, ডিওএইচএস) সঙ্গে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প তৈরি করেছেন।

দুবাইয়ে মানিক মিয়ার সঙ্গে (দুবাই অফিস-ফ্লোরিডা হোটেল, ১ম তলা, ১০২ নম্বর কক্ষ, পোস্ট বক্স-১১৩৮১) ২৫ কোটি টাকা পুঁজির মাধ্যমে যৌথ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন ব্যাংকে তার নামে-বেনামে প্রায় ১০০ কোটি টাকা রয়েছে বলে দুদক মনে করছে।

দুদকে আসা এক অভিযোগে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা লতিফের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তার ভাগ্নে মুর্শেদ আলীর মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির কথা বলে বিভিন্ন কায়দায় ৩০ বিঘা জমি, ১টি দোকান ও ৩ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। মুর্শেদের নামে তিনি ১৪০ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করিয়েছেন। মানিকখালী বাজারে রেলওয়ের জমির ওপর মুর্শেদের নামে ১টি মিনি মার্কেট তৈরি করে দিয়েছেন। এর মূল্য ১৮ কোটি টাকা। মুর্শেদের কাছ থেকে কিছু জমি নূর মোহাম্মদ নিজ নামে রেজিস্ট্রি করছেন। তার নামে জনতা ব্যাংক মানিকখালী বাজার শাখায় মোটা অংকের টাকা রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে দাখিলকৃত অভিযোগ থেকে জানা যায়।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী ভাগ্নে শাওন ও মনকে ব্যবসার জন্য তিনি দিয়েছেন ১৫ কোটি টাকা। তার বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন কটিয়াদী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মিলন। দীর্ঘদিন আগে বাড়ি নির্মাণ কাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত তার ৮৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়নি। সম্প্রতি কটিয়াদীর চাতল হাইস্কুল সংলগ্ন এলাকায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার জমি বিক্রি করেছেন দারোগা মজিবুরের কাছে। কম দামে দলিল করে এখানে কর ফাঁকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, তার আত্মীয় সামছুদ্দিনকে ৩০ লাখ টাকা পুঁজি ও ১০ কাঠা জমি কিনে ব্যবসা ধরিয়ে দিয়েছেন। মিশনে লোক পাঠানোর সময় ৫৬০ জনের মধ্যে ১০০ জনকে সঠিকভাবে পাঠানো হয়। বাকি ৪৬০ জনের কাছ থেকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। বিশ্বাস বিল্ডার্স নামে এক কোম্পানির সঙ্গে ১০ কোটি টাকায় যৌথ ব্যবসা রয়েছে নূর মোহাম্মদের। একটি সূত্র জানায় দুদকের কাছে থাকা এসব সম্পদের বিষয়ে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নূর মোহাম্মদ।

এর আগে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগের বিষয়ে নূর মোহাম্মদ দেশে অবস্থানকালীন গণমাধ্যমের কাছে চ্যালেঞ্জ দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি যা করেছেন বৈধ উপায়ে। বৈধ আয়ে অর্জিত সম্পদ ব্যতীত আর কোন সম্পদের সন্ধান পেলে সেই সম্পদ তিনি রাষ্ট্রকে দিয়ে দেবেন বলেও জানিয়েছেন।

Ads
Ads