পূবালীকে পেটে পুড়েই হজ্বে যাচ্ছেন এমডি হালিম

  • ৮-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads
হৃদয়টা তার পাপের অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে শেষ সীমারেখায় এসে পৌঁছেছে। ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূবালী ব্যাংকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির মহারাজা তিনি। এবার পাপের বোঝাগুলো তাকে প্রতিনিয়তই ক্ষত বিক্ষত করছে। ব্যাংকটিকে তিনি শুধু খাদের কিনারায়ই নয়, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। এত পাপ জমেছে যে আগামী ১৩ আগস্ট বোর্ড মিটিং শেষ করে পবিত্র হজ্জ পালন করার জন্য নিয়ত করেছেন তিনি। কথা হচ্ছিল প্রথম প্রজন্মের পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আব্দুল হালিম চৌধুরীকে নিয়ে। এই হজ্জ পালনে কি তিনি মুক্তি পাবেন এই পাপের হাত থেকে? এ প্রশ্নই এখন ব্যাংকটির ভেতরে ও বাইরে। একচ্ছত্র আধিপত্য, সীমাহীন দুর্নীতি, গ্রাহক হয়রানি, খেলাপি ঋণে ভয়াবহ অবস্থার কারণ ব্যাংকটির ভবিষ্যত বেসিক অথবা ফারমার্স ব্যাংকের মতোই রুগ্ন হবে বলে খোদ ধারণা পোষণ করেছেন ব্যাংকটির একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা। সীমাহীন এই দুর্নীতির মহা খলনায়ক এমডি আব্দুল হালিম চৌধুরী ব্যাংকটিকে পেটে পুড়েই এবার পবিত্র হজ্জ পালন করতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে ব্যাংকটির নির্ভরযোগ্য সূত্র। পূবালী ব্যাংকের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে ভোরের পাতার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূবালী ব্যাংকের যত অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে তার সবকিছুরই কারসাজিতে যে নামটি সবার আগে এসেছে তিনি হচ্ছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আব্দুল হালিম চৌধুরী। বিশেষ করে ঋণ জালিয়াতির মূল হোতা হিসাবে তাকে দায়ী করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে ভোরের পাতা নিশ্চিত হয়েছে, পূবালী ব্যাংকের মতিঝিল, নরসিংদীর মাধবধী ও নারায়ণগঞ্জ শাখায় মোট ১০৮ কোটি টাকার ঋণ কেলেংকারির ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে খুলনা শাখার ২৩ কোটি টাকার ভোক্তাঋণ জালিয়াতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরো ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের মালিক মিজানুর রহমান মেডিকেল ইকুইপমেন্ট (চিকিৎসা সরঞ্জামাদি) আমদানির জন্য মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনের মতিঝিল শাখায় ২ হাজার ৯৮০ ডলারের একটি এলসি (লেটার অব ক্রেডিট ) খোলেন। কিন্তু এলসির বিপরীতে বি এল ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বন্দরে আসেনি। এরপরও পূবালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে এমডি আব্দুল হালিম চৌধুরীর অনৈতিক হস্তক্ষেপে বিল পরিশোধ করে দেয়া হয়। এ ঘটনার পর চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের মালিক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে। পরে বাংলাদেশ বাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের (লিগ্যাল কমপ্লায়েন্স এন্ড এনফোর্সমেন্ট শাখা) থেকে পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এক পত্রে মতিঝিল শাখার গ্রাহক মোসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে ইস্যুকৃত এলসির বিপরীতে ত্রুটিপূর্ণ দলিলপত্র এবং বিল অব এন্ট্রি না পেয়েই পরিশোধ করায় পূবালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি (২০০৯ ভলিউম ১ এর ২৬ নম্বর ধারা) লংঘন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ডিজলাইন পরিচালন ব্যতীত ভুয়া জাহাদি দলিল (বিল অব লেডিং) এর বিপরীতে মূল্য ছাড়করণ করায় আলোচ্য অনিয়ম হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে। এদিকে, এমডি হালিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি আর স্বজন প্রীতির মাধ্যমে ব্যাংকের ভুয়া কাগজের ওপর ভিত্তি করে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে। এমনসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে তিনি পবিত্র হজ্জ পালন করতে কিভাবে যাচ্ছেন তা নিয়েও খোদ প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান এমডি আব্দুল হালিমের ইচ্ছের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে পুরো ব্যাংকটি। তিনি কোনো এক অদৃশ্য শক্তির জোরে নিয়ম নীতি না মেনেই ব্যাংকটিকে রশাতলে নিয়ে যাচ্ছেন দিন দিন। তার লোক দেখানো হজ্জ করা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের নিয়ম ভেঙে ঋণ সুবিধা দিয়ে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশে বিদেশে অগাদ সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন এমডি আব্দুল হালিম চৌধুরী। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে দেশের প্রথম প্রজন্মের পূবালী ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানতের ছিলো ১৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটি গ্রাহকদের মাঝে ১৪ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিলো। সব মিলিয়ে ২০১৪ সাল শেষে ২৪ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকার ব্যাংক ছিলো পূবালী। বছরটিতে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিলো ৩০৭ কোটি টাকা। তিন বছর পর ২০১৭ সাল শেষে পূবালী ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত, ঋণ ও মোট সম্পদ সবকিছুই বেড়েছে। শুধু কমেছে ব্যাংকটির নিট মুনাফা। গত তিন বছর ধরেই পূবালী ব্যাংকের নিট মুনাফার পরিমান কমেছে। আর্থিক বিপর্যয়ের এ ধারাবাহিকতা চলছে চলতি বছরেও। অথচ আমানত, ঋণ ও সম্পদ বাড়ায় বিদায়ী বছর পূবালী ব্যাংকের নিট মুনাফা ২০১৪ সালের দ্বিগুণ হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো পথেই চলছে দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকটি। ক্রমশ খাদের কিনারে পৌঁছেছে পূবালী ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত তিন বছর পূবালী ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে আর্থিক বিপর্যয়ের পথে হাটছে। নিট মুনাফা কমতে কমতে অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ এ সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বাছ বিচার না করে ঋণ বিতরণের নামে ব্যাংকের টাকা বের করে নেয়ায়, সে টাকা আর ফেরত আসছে না। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আব্দুল হালিম চৌধুরীকে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির এমডির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তারা বলছেন, এমডি পদে আব্দুল হালিম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ব্যাংকটি ডুবতে শুরু করেছে। অর্থের প্রতি এমডির সীমাহীন লোভ, অনিয়ম- দুর্নীতি, অযোগ্যতা আর ব্যর্থতার বলি হচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিচেছন এমডি। ফলে কমিশনের বিনিময়ে বিতরণ করা ঋণ আর ফেরত আসছে না। বিগত তিন বছর পূবালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন আব্দুল হালিম। দুর্নীতির অর্থে দেশে বিদেশে বাড়ি, গাড়িসহ বিপুল সম্পরে পাহাড় গড়েছেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের এমডি আব্দুল হালিমকে বুধবার সন্ধ্যা ৬ টা ১৩ মিনিটে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এরপর ৬ টা ২০ মিনিটে প্রতিবেদক একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর করেননি।
Ads
Ads