ফিরছে মিনি পার্লামেন্ট: অতীতের সুনাম যেন ক্ষুণ্ণ না হয়

  • ১৬-জানুয়ারী-২০১৯ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

কোনো অঘটন না ঘটলে দীর্ঘ ২৮ বছর পর অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ যে শেষপর্যন্ত উদ্যোগটি নিল এ থেকেই একটি ভালো ফলাফল বেরিয়ে আসবে আশা করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে ডাকসুর ২১ বছরের পুরনো গঠনতন্ত্র সংশোধনে কমিটি গঠন করেছে। ক্যাম্পাসে সক্রিয় ১৩টি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে এ বিষয়ে কমিটির বৈঠকও হয়েছে। ডাকসু তো বটেই, বাস্তবতা হচ্ছে, দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। একসময় মিনি পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৬ জুন। এমনকি সামরিক শাসকদের আমলেও ডাকসুসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নজির রয়েছে। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ সামরিকতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক শাসনের নতুন সোপানে পা রাখলেও রহস্যজনক কারণে চাপা পড়ে যায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। যে ছাত্রসমাজের ভূমিকা না থাকলে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানই ঘটতো কি-না সন্দেহ, সেই ছাত্রসমাজের মিনি পার্লামেন্ট নির্বাচনই আটকে দেওয়া হলো, কাদের স্বার্থে, কাদের তৎপরতায় এ এক রহস্যই হয়ে থাকলো।

নয়তো যে ছাত্রসমাজ এ দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে তাদের গণতন্ত্রচর্চা ও প্রতিনিধি নির্বাচিত করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে কেন গণতান্ত্রিক শাসনামলেই? এখন জাতি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছে, ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় জাতীয় ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্বের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যার পরিণতিতে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশই ব্যবসায়ী প্রার্থী। মাত্র ৭ শতাংশ রাজনীতিক। যদি আরও কিছুকাল এই ডাকসু নির্বাচন বন্ধ থাকে তাহলে দেখা যাবে ৭ শতাংশ তো দূরের কথা ১ শতাংশও সংসদে প্রার্থী হওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবই ব্যবসায়ীরা গোগ্রাসে গিলে ফেলবে।

‘দেশপ্রেম’ হয়ে যাবে ব্যবসায়িক লাভলোকসানের বিষয়। রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধ নেতৃত্বের বদলে আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারীরা রাজনৈতিক অঙ্গনে উড়ে এসে জুড়ে বসার সুযোগ পাবে। যা ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে। ডাকসু নির্বাচন না হওয়াতেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পরিক সহযোগিতায় পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও তা চলছে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও ২৮ বছর ধরে সেখানে শূন্যতা বিরাজ করছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্রনেতাদের মধ্যে দায়বোধের ব্যত্যয় ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ঘটনা। তবে শুধু নির্বাচনের আয়োজন নয়, সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত সব ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে যাতে ছাত্রদের মতামত মুক্তভাবে প্রতিফলিত হতে পারে সে স্পেসও রাখতে হবে।

তবে অতীতে দেখা গেছে ছাত্র রাজনীতি ঘিরে বহু মায়ের কোল শূন্য হতেও। ছাত্র রাজনীতির বৈরী পরিবেশের কারণে দুপক্ষের অস্ত্রের ঝনঝনানি প্রায়ই থেমে থেমে একটা ত্রাসের আবহ জমে থাকতো ক্যাম্পাস এলাকায়। একটা গা ছমছম করা পরিবেশ ছিল ক্যাম্পাস ঘিরে। একটা ভীতিকর পরিবেশ গুমোট বেধে থাকতো। ফলে সাধারণ মানুষ সেদিক দিয়ে যেতে সাহস পেতো না, এমন পরিবেশও আমরা দেখেছি এই ক্যাম্পাস ঘিরে। শুধু ডাকসুই নয়, দেশের সব কলেজগুলোতেই এমন মারামারি, সন্ত্রাসপ্রবণ আবহ দেখেছি অতীতে। যে কারণে কবিও লেখেন- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?’ এ নিয়ে কবিও ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা যে তখন এরকমই ছিল, আর এ কারণেই যে অবশেষে ডাকসুসহ দেশের সব ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়, এটাও কিন্তু কমবেশি অস্বীকার করা যাবে না। তবে এহেন পরিবেশের জন্য দায়ী করা হয়, বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং এরশাদের গড়া ছাত্রসমাজকেই। কাজেই সেই অরাজক পরিবেশ যেন আর ফিরে আসে সেটাও দেখতে হবে। এটা যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।  

Ads
Ads