গার্মেন্টে মজুরি সমন্বয়: আন্দোলনের ন্যায্যতা স্বীকার

  • ১৫-জানুয়ারী-২০১৯ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

অবশেষে আন্দোলনের ন্যায্যতা স্বীকার করেই সরকার পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়াল ছয় গ্রেডে। প্রথম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত বেসিক বা মূল মজুরিও বাড়ানো হয়েছে বিভিন্ন হারে। সপ্তম গ্রেডে মজুরি বোর্ড ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ে মজুরি পর্যালোচনায় গঠিত কমিটির বৈঠকে গত রোববার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশোধিত মজুরি কাঠামো গত ডিসেম্বর থেকেই কার্যকর ধরা হবে। আগামী মাসের মজুরির সঙ্গে বকেয়া হিসেবে বাড়তি অর্থ পাবেন শ্রমিকরা। নিঃসন্দেহে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য এটি একটি বড় সুখবর। শত হলেও তাদেরই ঘাম নিংড়ানো শ্রমেই গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাত আজকের বাংলাদেশের পোশাক শিল্প। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই পোশাক শিল্পের এই শ্রমিকরা তারপরও বিশ্বের সবচাইতে কম মজুরি পেয়ে আসছিলেন এতোদিন। এই যে ছয় গ্রেডে বেতন বাড়ানো হলো তারপরও কিন্তু মজুরির হারের দিক থেকে এখনো বাংলাদেশ বিশ্বের সব পোশাক শিল্প উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় কমই রয়ে গেছে। তারপরও যতোটুকু বেড়েছে এটাকে আমরা সুখবর হিসেবেই ধরে নিতে পারি। গত কয়েকদিন ধরে মজুরি নিয়ে পোশাক শ্রমিকদের ভেতর যে অসন্তোষ বিরাজ করছিল তাতে করে সে অসন্তোষ কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে বলে মনে করি আমরা।  

কেননা, গত কিছুদিন ধরে ঢাকা ও আশপাশের পোশাক-শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠেছিল। শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে একজন শ্রমিকের মৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এটা ঘটলে তোলপাড় হয়ে যেত। আন্তর্জাতিক বিশ্বও এতে নাক গলানোর সুযোগ পেত। কিন্তু সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতি আর বেশিদূর গড়াতে দেয়নি। জানা গেছে, সংশোধিত কাঠামো অনুসারে এক নম্বর গ্রেড মজুরি এখন থেকে হবে ১৮ হাজার ২৫৭ টাকা। আগে এই গ্রেডে মজুরি ছিল ১৭ হাজার ৫১০ টাকা। দুই নম্বর গ্রেডে মজুরি হবে ১৫ হাজার ৪১৬ টাকা। আগে এই গ্রেডে মজুরি ছিল ১৪ হাজার ৬৩০ টাকা। তিন নম্বর গ্রেডে এখন থেকে মজুরি হবে ৯ হাজার ৮৪৫ টাকা। আগে এই গ্রেডে ছিল ৯ হাজার ৫৯০ টাকা। চার নম্বর গ্রেডে সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরি হবে ৯ হাজার ৩৪৭ টাকা। আগে ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ২৪৫ টাকা। পাঁচ নম্বর গ্রেডে সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী মজুরি হবে ৮ হাজার ৮৭৫ টাকা যা আগে ছিল ৮ হাজার ৮৫৫ টাকা। ৬ষ্ঠ গ্রেডে নতুন মজুরি নির্ধারণ হয়েছে ৮ হাজার ৪২০ টাকা। আগে ছিল ৮ হাজার ৪০৫ টাকা। তবে ৭ম গ্রেডের মজুরি কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এই গ্রেডে আগের মতোই ৮ হাজার টাকাই রাখা হয়। তাদের অন্তত ২০০ টাকা বাড়ালে শ্রমিকরা কাজে আরো উৎসাহ পেত। মনে রাখতে হবে, তৈরি পোশাক শিল্পই আজকের বাংলাদেশের মূল ধমনী, শিরা-উপশিরা। কাজেই এটাকেই বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পের বাজারে চীন শীর্ষস্থানে রয়েছে এবং আর আমরা দ্বিতীয় স্থানে। এটা কম কথা নয়। বাংলাদেশ আজ অমিত সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ জন্য শ্রমিকদের মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি তাদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

পোশাক খাত নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোসহ সবাই যদি ইতিবাচক কথা বলেন তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া কঠিন কিছু নয়। আর এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রান্তও রয়েছে। কোনো কোনো দেশ নানা মনভোলানো কথা বলে বাংলাদেশের এই তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার ছিনিয়ে তাদের দেশে নিয়ে যেতে চায়। কাজেই এ চক্রান্তের গতি-প্রকৃতি কেমন তাতে হিসেব করে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যারা ধ্বংস করতে চায় তারাই এ দেশের পোশাক শিল্পের বিকাশ সহ্য করতে পারছে না। শ্রমিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন না দিতে পেরে ইতোমধ্যেই অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কাজের মৌসুম। ফের যাতে বেতন-ভাতা নিয়ে কোনো অসন্তোষ মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। সজাগ থাকতে হবে এ নিয়ে উস্কানিদাতাদের বিষয়েও।

কেননা, বিদেশ থেকে যারা অর্ডার পেয়েছেন তারা যদি সময় মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারেন তাহলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। শ্রমিকদেরও দেশেপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। এটাও ঠিক যে, বাজার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব দেখা দিলে সে কাজপ্রেম, দেশপ্রেমও উবে যেতে বাধ্য। মালিকদেরও সেটা মাথায় রাখতে হবে। তবে সরকার যে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করেছে তাতে সন্তুষ্ট হয়ে শ্রমিকদের কাজে মনোযোগী হতে হবে।

Ads
Ads