কাল ঘটনাবহুল নির্বাচন: প্রশ্নবিদ্ধ ও অন্তঃসারশূন্য যেন না হয়

  • ২৮-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘটনাবহুল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশবাসী তো বটেই বাইরের দুনিয়াও সজাগ দৃষ্টি রাখছে এ নির্বাচন কেমন হবে সে প্রশ্ন সামনে রেখে। কেননা, এ দেশে এ যাবৎ যত নির্বাচন হয়েছে তার বেশির ভাগই বিতর্কিত হয়ে আছে। ষাট দশকে তাই দেশের একটি মহল এই নির্বাচনকে বলত, ‘দুই কুকুরের লড়াই’। কিন্তু সেই লড়াইয়ের এক কুকুর তো চিরতরের জন্য ‘নিপাত’ হয়ে গেছে। কিন্তু আজও কেন এই নির্বাচনকে ঘিরে একই পরিস্থিতি বিরাজ করবে? তবে কি আজও সেই চরিত্রের বদল হয় নাই? বলা হয়, ‘কয়লা যায় না ধুলে, ইল্লত যায় না মরলে।’ নির্বাচন যেন এই চরিত্রেরই সমার্থক হয়ে রইল।

নয়তো ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) একের পর এক অভিযোগ দায়ের কেন্দ্রে পরিণত হবে? নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত এই কমিশনে সহস্রাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। বলাবাহুল্য, এসব অভিযোগ করেছেন হামলা-মামলা ও হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীরা। শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, অভিযোগ জমা পড়ছে প্রতিটি জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দফতরেও এবং সেই অভিযোগগুলোর সংখ্যা নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া অভিযোগের কয়েকগুণ বেশি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে অভিযোগ পাহাড় হয়ে তা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এত অভিযোগের পর অভিযোগ জমা পড়েনি। ফলে এতেও অনেক আঁচ করতে পারছেন, আগামীকালের নির্বাচন কেমন হতে পারে।

আর নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দফতরে জমা পড়া অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই যে ঐক্যফ্রন্ট, স্বতন্ত্র অথবা সরকারবিরোধী প্রার্থী ও সমর্থকদের, তা অনুমান করা যায় সহজেই। তবে এটাও ঠিক, সরকারি দলের পক্ষ থেকেও দায়ের করা অভিযোগের সংখ্যাও কম নয়।

কথা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি করতে কমিশন কতটা আগ্রহী? এ পর্যন্ত যা পাওয়া যাচ্ছে তা হল কমিশন সব অভিযোগ আমলে নিচ্ছে না। জানা গেছে, আচরণবিধি লঙ্ঘন সংক্রান্ত কয়েকশ অভিযোগ নির্বাচনী তদন্ত কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট কমিশনের কাছে পাঠানো হলেও সেখানে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সাজার সুপারিশ নেই।

অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়া হলেও মাত্র ১৪ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে, বিএনপিসহ কয়েকটি বিরোধী দল ও প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে কমিশন সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কমিশন রিটার্নিং কর্মকর্তা অর্থাৎ ডিসিদের ও পুলিশ সুপারদের কাছে ‘আইনানুগ’ ও ‘প্রয়োজনীয়’ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিচ্ছে শুধু। অর্থাৎ এটা যে দায়সারাগোছের দায়িত্ব পালন তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
আগামী নির্বাচনটিকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যে ধরনের লেভেল পে¬য়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা দরকার, তা কেন সম্ভব হলো না সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। সরকারপক্ষীয়রা বলছেন ঐক্যফ্রন্টই তাদের কৌশলের অংশ হিসেবে মাঠে নামেনি।

অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্য হিসেবে পুলিশের কারণেই তাদের কর্মীরা মাঠে নামতে পারছে না। এমনকি পুলিশের  কারণে তারা পোস্টার লাগাতে পারছে না। পোস্টার কিছু লাগালেও তা সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গেই ছিঁড়ে ফেলছে। নির্বাচনী প্রচারণা ২৭ তারিখেই শেষ। এ সময়ের মধ্যে রাজধানীর কোনো কোনো আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা একেবারেই নামতে পারেনি। যেমন, ঢাকা-১২ আসনে সরকার দলীয় প্রার্থীই একচেটিয়া প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। এববারের নির্বাচনে যে উৎসব দেখা গেছে তা মূলত একতরফা উৎসবেই পরিণত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ^ও এবারের নির্বাচন নিয়ে আর উৎসাহী নয়। ইউরোপ তাদের কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাতেই প্রয়োজন বোধ করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও কোনো পর্যবেক্ষক প্রবেশ করতে পারেনি। এমনকি ভারতও এবারের নির্বাচন নিয়ে তেমন একটা গা করেনি। নামেমাত্র কয়েকজন পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে। কারণ, তারাও বুঝে ফেলেছেন এবারের নির্বাচন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে না। এমনকি একজন খোদ নির্বাচন কমিশনারও বলেছেন, নির্বাচনে লেভেল পে¬য়িং ফিল্ড নেই। ফলে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে কী করে? 

নির্বাচনও এক ধরনের খেলা বিশেষ। যে খেলায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না আগে থেকেই যদি জানে দর্শক, তাহলে সে খেলা দেখতে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে টিকিট কাটতে যাবে না- এটা জোর দিয়েই বলা যায়। কাজেই এবারে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এতদিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে যদি  দেশের সাধারণ ভোটাররা মনে করে সরকার দল যে করেই হোক নির্বাচন তাদেরই করে নিচ্ছে, তখন মনে হয় না সে ভোটার আর কষ্ট করে শীতের সকালের আরামের ঘুম ভেঙে সেখানে ভোট দিতে যাবে।  

আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন একটি পক্ষপাতহীন সাংবিধানিক সংস্থা। কমিশনের সদস্যরা জাতিকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রতিশ্রুতি ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নেওয়ার মতোই। যদি তারা এটা বিস্মৃত হন তাহলে মনে করা হবে তারা শুধু সংবিধানই নয়, নিজ ধর্মও লঙ্ঘন করছেন। কাজেই তাদের এই উপলব্ধিতে আসতে হবে যে, লেভেল পে¬য়িং ফিল্ড ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশ্নটি অবান্তর।

সেক্ষেত্রে কমিশনের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। আমরা তাই আশা করব, আগামীকাল যে ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেখানে যেন এমন কোনো পরিস্থিতি দেখা না যায় যাতে সাধারণ ভোটাররা হতাশ হয়ে ফিরে না যান। বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু ভোটাররা যেন পূর্ণ ভরসা পান মাঠের পরিস্থিতি দেখে। তাহলেই বাদবাকি সব ভোটারই স্বস্তি নিয়ে ভোট দিতে যাবে। নয়তো সে নির্বাচন অন্তঃসারশূন্যই মনে করবে দেশবাসী।

Ads
Ads