অতিউৎসাহী নেতাকর্মী: গণতান্ত্রিক পরিবেশের অন্তরায়

  • ১৭-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

এবারের নির্বাচন যতোটা আনন্দঘন বলে হবে আশা করা হচ্ছিল ঠিক ততোটা হওয়ার কোনো পরিবেশ দেখা যাচ্ছে না এখনও পর্যন্ত। ভোটের সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই উত্তাপের পারদ চড়ছে, ছড়াচ্ছে উত্তেজনা। ইতোমধ্যেই দেশের কমপক্ষে ৩০ জেলায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে এ হচ্ছে ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর’ মতো ব্যাপার। 

বাংলাদেশের যেকোনো নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে, এমনটি আশা করা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা হয় না। এই ঔপনিবেশিক ভূত কখনো যাবে বলেও মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে দেশে যতো সংঘাতমুখরতা, তা এক নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই। যদি নির্বাচন বলে কিছু না থাকতো তাহলে হয়তো দেশের মানুষ শান্তিতেই থাকতো। এসব মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানির ব্যাপার থাকতো না। নয়তো দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কেন নির্বাচন কেন্দ্রিক সেই একই সহিংসতা, রক্ত দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার থাকবে কেন? এখানে কে কার রক্ত দেয় বা কে কার রক্ত নেয়? তাহলে সেই ‘বাঙালি’ জাতিসত্ত্বা কোথায় গেল? নির্বাচন কেন্দ্রিক এই হানাহানি, রক্ত দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার এখনও পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন না হলেও কিছু কিছু ঘটনাও যে নির্বাচনের পরিবেশ অনেকাংশে নষ্ট করে এটা অস্বীকারের কোনো জো নেই। 

অথচ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করছে। এক্ষেত্রে অতীতের সকল রেকর্ডও ভঙ্গ করেছে। আশা করা হয়েছিল, অংশগ্রহণমূলক এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সব রাজনৈতিক দল দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে। কিন্তু সব সময়েই এমন সব অতিউৎসাহী নেতা-কর্মী-সমর্থক থাকে যে, তাদের কারণে পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ে। তাদের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এদের বক্তৃতা-বিবৃতি  সেøাগান স্রেফ অশিক্ষিত পশ্চাৎপদ বন্য মূর্খ মানুষের মতো। আরো আছে, এমন একটি গোষ্ঠী যারা সব সময় এজাতীয় যেকোনো আয়োজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা ফন্দি আঁটে। নির্বাচনের সময় সবার আগে যে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয়, সেটি হচ্ছে জননিরাপত্তা। এই যে ইসি রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে বলেন তা কী করে সম্ভব হবে যদি রাজনৈতিক দলগুলোতে সুস্থ পরিবেশ না থাকে? নারী কী করে ভোটের লাইনে দাঁড়াবে, যদি সেরকম পরিবেশই না থাকে? তাহলে ইসির দায়িত্ব কি? নারীকে ভোটের লাইনে নিতে হলে নির্বাচনে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যাতে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিয়ে আসতে পারে। যদি নির্বাচনী পরিবেশ সহিংসতাময় হয় তখন পুরুষ কিছু সাহস করে ভোট দিতে গেলেও নারীরা কেন সে ঝুঁকি নিতে যাবে? কেন নারী এমন ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোতে অংশ নেবে? তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি কি ইসি নেবে? 

এরই মধ্যে সম্প্রতি ভোরের পাতায় প্রকাশিত হয়েছে, একটি মহল তাদের কিলিং মিশনে টার্গেট করে রেখেছে ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের। যা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ঘাপটি মেরে বসে থাকা এই অপশক্তি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এদের তৎপরতায় দেশের যেকোনো প্রান্তে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের কোনো অঘটন। নির্বাচন ঘিরে  যে ৩৪ জঙ্গির তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা খুবই ভয়াবহ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, নির্বাচন সামনে রেখে জঙ্গি সংগঠনগুলো বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে হিযবুত তাহরীর নামের সংগঠনটির তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জেএমবির কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মী-সমর্থকরা যেভাবে পরস্পরের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তাতে উৎকণ্ঠিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। এখনই লাগাম টেনে না ধরলে পরে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করি। এ জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। যেকোনো উপায়ে নির্বাচনী সংঘর্ষ বন্ধ করতে হবে।

কেননা সন্ত্রাস দমনে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। আমরা আশা করব, সব ধরনের হামলা-সংঘর্ষ বন্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের কর্মী-সমর্থকদের সংযত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট আর্ল মিলারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘দলীয় নেতা-কর্মীদের ধৈর্য ধরতে বলেছি’। কিন্তু অতি উৎসাহী নেতা-কর্মীরা এমন যে শীর্ষ নেতার আহ্বানও উপেক্ষা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। এটা যেন আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে গেছে। দেশকে আধুনিক করতে হলে অস্থিমজ্জায় মজ্জমান এই কুসংস্কৃতির শৃঙ্খল ভাঙতেই হবে। 

Ads
Ads