উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা: ‘তথ্যসন্ত্রাসে’ যেন পথ না হারাই

  • ২২-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণা। বাংলাদেশে নির্বাচনী উৎসব বলতে যা বোঝায় তা মফস্বল, মফস্বল শহর বা জেলা শহরগুলোতেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে কুসুম কুসুম শীতের আমেজ। বিকেল থেকেই জমে উঠছে ছোট ছোট চায়ের স্টলগুলোতে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের আলোচনা। কিন্তু বাংলাদেশে এই ভোটাদের ওই নির্বাচনী উত্তাপযুক্ত আলোচনা কোনোই প্রভাব রাখে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনো পক্ষের বা দলের জয় বা পরাজয়ে? কখনোই কি রেখেছিল? সরাসরি তা না রাখলেও পরোক্ষে তো কিছু না কিছু রাখেই। আর সেটা হচ্ছে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন সেক্টরগুলো তাদের ওপর কতটা প্রভাব রাখছে এবং তাদের ভোট প্রদান নির্ধারণী সিদ্ধান্তের ওপর কতটা মৃদু দোলা বা ঝাঁকুনি দিতে সক্ষম  হয়েছে সেটার ওপর।
আর এ কাজটিতে যে মাধ্যমটি সবচেয়ে বেশি পারঙ্গম, সেটা হচ্ছে তথ্যমাধ্যম। তা প্রিন্ট মিডিয়াই হোক আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াই হোক। নিঃসন্দেহে এবারের নির্বাচনে এই তথ্যমাধ্যম একটা বড়সড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। কী সেটা? এই তথ্যমাধ্যম কি উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে নাকি দেশকে গণতন্ত্রের অজুহাতে একটা অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে। এ বিষয়ে কোনোই সংশয় নেই যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। 
এই আমরা হররোজ সংবাদ দেখি, তাতে কী দেখি আমরা? আন্তর্জাতিক পাতায়? আর এসব সংবাদ কারাই-বা দেখায়, তা কি আমরা পাঠক কি দর্শকশ্রোতা হিসেবে কখনো তলিয়ে দেখি, বা তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি?

এই যে আমরা দেখি দরিদ্র আফ্রিকা, রাশিয়া, ভুখা ল্যাটিন আমেরিকা, যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য, একনায়ককবলিত উত্তর কোরিয়া, গরিব এশিয়া, অনাধুনিক বলকান, আবছা ককেশাস। সবই নেতিবাচক সংবাদ। আর যত ইতিবাচক সংবাদ, তা কেবলই পশ্চিম ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকার। এর কারণ কী?  কারণ হচ্ছে, যে উৎস থেকে আমরা কথিত বিশ্ব সংবাদ পাই তা দেয় হাতেগোনা তিনটি সংবাদ সংস্থা। AFP, AP, Reuters। এর মধ্যে অঋচ ফ্রান্সের, অচ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এবং জবঁঃবৎং ব্রিটেনের। আর এই তিনটি রাষ্ট্রই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। তারা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে প্রকৃত তথ্য থেকে দূরবর্তী মানুষের মস্তিষ্কে একটি অদৃশ্য উপনিবেশ তৈরি করে। এরই ফলে তৈরি হয় আরেক বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব। এই দাসত্বেই চাপাপড়া মানুষ তা-ই বিশ্বাস করে যা ওরা বলে। এমনকি কল্পিত ডগউ এর ভয় দেখিয়ে একটি তরতাজা ইরাককে ধ্বংস করে ফেললেও ওদের হামলাকে কেউ আগ্রাসন বলে না। ওদেরকে কেউ কোনো শাস্তির মুখোমুখি বা মামলার মুখোমুখি করার স্পর্ধা দেখাতে পারে না।

আর ওই যে ২০১৪ সালে গঠিত হওয়ার পরেও ইসরাইল কেন আইএসের বিরুদ্ধে একটিও বিমান হামলা বা অন্য কোনো হামলা চালালো না? থলের বেড়াল বের হয়ে পড়বে, এই ভয়েই কি? তাহলে এই থলের বিড়ালটি কোথায়? তেল আবিবেই কি? 

Weapons of Mass Destruction-WMD গণমাধ্যম প্রোপাগান্ডার ফলে জন্ম নেওয়া বহুল ব্যবহৃত একটি টার্ম। ইরাকে হামলার আগে এই জুজু প্রচার করে CNN, FOX, BBC, ABC, nytimes, chicago tribune, log angeles times, haaretz, times of israel, washigton post  প্রভৃতি। যে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো ইউরোপ ও আমেরিকার সাধারণ মানুষকে সাদ্দামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। এই গণমাধ্যমগুলো এরকম। এরা যখন এদের প্রয়োজন মনে  করে, নেতিবাচককে ইতিবাচক করিয়ে ছাড়ে আবার ইতিবাচককে ইতিবাচক করিয়ে ছাড়ে। আর তাদের এই অপতৎপরতার ফলে সাধারণ মানুষ অন্ধকারের তলানিতেই পড়ে থাকে। বঞ্চিত হয় প্রকৃত সংবাদ থেকে। এমন কি পশ্চিমা মিডিয়া আমাকে আর আপনাকে বাধ্য করে তারা যাকে শত্রু মনে করে আপনাকে আমাকেও তাই মনে করতে। কেননা, ওই তথ্যমাধ্যম এখন আর অবজেকটিভ অবস্থায় নেই। দুনিয়াজুড়েই এটি একটি প্রোপাগান্ডা অস্ত্র হয়ে উঠেছে। RT, Xinhua, Anadolu, Vice, NNN, MEM, Al Manar, Press, Ruptly, ইন্টারসেপ্ট, স্পুৎনিক, সানা, সুমারিয়া, উইকিলিক্স, পার্স টুডে, প্রাচ্যনিউজ নামের এই বিশ্বখ্যাত তথ্যমাধ্যম সংস্থাগুলো আসলে কতটা বিশ্বস্ত আপনার আমার প্রত্যাশিত জগতের সামনে? সেখানে ওই ছোট ছোট চায়ের স্টলগুলোর নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের আলোচনা কতটা থই পাবে?

এখন এই গণমাধ্যমেরই মুখোমুখি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে তো গেল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। দেশীয় গণমাধ্যমের কী ভূমিকা থাকবে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে? তারাও কি ওই আন্তর্জাতিক তথ্যমাধ্যমের ভূমিকায় নামবে- যারা দিনকে রাত করে, রাতকে দিন করে ছাড়ে? বলাই বাহুল্য, আর এটাই হচ্ছে তথ্যসন্ত্রাস। যার মাধ্যমে ভোটারদের মগজধোলাই করা সম্ভব হয়। কয়দিন আগেই তাই দেশের বেশ কিছু তথ্যমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা এই তথ্যমাধ্যমের সম্পাদকদের কী ছবক দিলেন? আর সম্পাদকরাই বা তাদের কী ছবক দিতে পারলেন?

সে যা হোক, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের তথ্যমাধ্যমকেও এক অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তা হচ্ছে, তারা কি উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সহগামী হবে নাকি আবারো তথ্যসন্ত্রাস উপস্থাপনের মাধ্যমে এক অনিশ্চিত বাংলাদেশের সহগামী হবে। যা উল্লিখিত ওইসব আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো করে থাকে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ওইসব আন্তর্জাতিক তথ্যমাধ্যমগুলো কিন্তু কখনো তাদের নিজ দেশের বিরুদ্ধে এমন তথ্যসন্ত্রাস ছড়ায় না যাতে তাদের উন্নয়ন পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আশা করি, আমাদের দেশের তথ্যমাধ্যমগুলো তাদের কাছ থেকে অন্তত এতটুকু শিক্ষা গ্রহণ করবে। অন্যথায় তাদের এটাও মনে রাখা উচিত যে, ইতোমধ্যেই এই তথ্যসন্ত্রাস প্রতিরোধে আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। যা দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই প্রণীত হয়েছে।  

তাই আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের তথ্যমাধ্যমগুলোকে মনে রাখতে হবে, আমরা যেন আমাদের নিজের পায়ে কুড়াল না বসিয়ে দিই। দেশের উন্নয়ন যেন ফের স্তব্ধ করে না দিই। আমরা যেন ফের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা না করি। আমাদের আরো মনে রাখতে হবে, ’৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে কিন্তু আমাদের দেশীয় তথ্যমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলেই দেশের স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছে। সেই সময়ে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ইত্তেফাক যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল তাতে সঙ্গত কারণেই পত্রিকাটি দেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। তখন আন্তর্জাতিক তথ্যমাধ্যম আজকের মতো এমন তথ্যসন্ত্রাসী হয়ে ওঠেনি। যে তারা দিনকে রাত করবে, রাতকে দিন করবে। বিবিসি, চট্টগ্রাম কালুরঘাট থেকে সম্প্রচারিত রেডিওসহ আরো তথ্যমাধ্যম সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের সহায়ক ভূমিকায় ছিল। দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখে যেতে পারেননি কিছু কুচক্রী সেনা অফিসারদের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হওয়ায়। তার সেই অসমাপ্ত কাজের ভার আজ তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার স্কন্ধে। আজ আবারো দেশের তথ্যমাধ্যমকে সেই ভূমিকায় আসতে হবে, যে ভূমিকা দেখেছি মহান মুক্তিযুদ্ধে। তা হচ্ছে, আজ দেশের উন্নয়ন যে গতিপথে এগোচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় রোল মডেল হয়ে উঠেছে, তা যেন আর পথ না হারায়। 

দেশের মানুষ যেন কোনো অপপ্রচারের কারণে, কোনো তথ্যসন্ত্রাসের কারণে বিভ্রান্ত না হয়, সে ভূমিকাই নিতে হবে আমাদের তথ্যমাধ্যমগুলোকে। গণতন্ত্রকে নিরাপদ ও বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তথ্যমাধ্যমের অশেষ ভূমিকা রয়েছে। আজ তাদেরও সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। বিশেষ করে যেসব তথ্যমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বলে দাবিদার, তাদের উদ্দেশ্যেই আমার এই ঔদাত্ত আহ্বান।       

Ads
Ads