ঢাকা লিট ফেস্ট: বাংলা সাহিত্যেও বিশ্ব স্বীকৃতি জুটুক   

  • ১১-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলা রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সেই ১৯৫২ সালে। বলাই বাহুল্য যে, ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে এই দাবিটির মূলে ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে কবি বাংলা ভাষার কবিতাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। যদিও তখন এই বাংলা ভাষা কোনো রাষ্ট্রভাষা ছিল না। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের একটি আঞ্চলিক ভাষা মাত্র ছিল। তারপরও নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সেই সময় তিনি আপন সৃষ্টিশীল শক্তির ঐশ্বর্যের গুণে এই ভাষার সাহিত্যকে বিশ্বর দরবারে পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছর হতে চলল বাংলা রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু সেই রাষ্ট্রভাষার সাহিত্য বিশ্বের দরবারে পৌঁছানোর মতো সেই সৃষ্টিশীল সাহিত্যের দেখা মিলল কোথায় যা বিশ্বদরবারে সগৌরবে ঠাঁই পাওয়ার যোগ্য? এই অভাব পূরণের লক্ষ্যেই গত আট বছর ধরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসব ‘ঢাকা লিট ফেস্ট।

গত শনিবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শেষ হলো এই সাহিত্য উৎসব ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৮’-এর অষ্টম আসর। তিন দিনের এই উৎসবে প্রায় ৯০টি সেশনের আয়োজন করা হয়েছিল। যাতে করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় দিক তুলে ধরা যায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে ও বিশ্বসাহিত্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা সহজতর হয়ে উঠতে পারে।

এ আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবটির পয়লা আয়োজন করা হয় ২০১১ সালে। তখন অবশ্য উৎসবটির নাম ছিল হে লিটারেরি ফেস্টিভাল। এ নামকরণ নিয়ে অনেকে নানা তির্যক মন্তব্য করে আসছিলেন। পরে ২০১৫ সালে সে নামের পরিবর্তন ঘটিয়ে ঢাকা লিটারেরি ফেস্টিভাল বা ঢাকা লিট ফেস্ট নামকরণ করা হয়। অনুষ্ঠানটি নিয়মিত হওয়ার কারণে ইতোমধ্যেই গত আট বছরে উৎসবটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মোটামুটি দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। 
বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীও শিল্প-সাহিত্য প্রেমিক। তার অফিসে শোভা পায় শিল্পী শাহাবুদ্দিনের পেইন্টিংস।

আর তাই প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক আগ্রহেই ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্ত হয়। কেবল সাহিত্যবিষয়ক আলোচনাই নয়, চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারসহ বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হয়ে এর কলেবর ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্বের অনেক সমৃদ্ধশালী ভাষার  চাইতে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। কিন্তু উন্নত বিশ্বে সাহিত্য নিয়ে যে বড় পরিসরে নানা আয়োজন চলে বাংলাদেশে সেটার পরিবেশ নেই। ফলে একটি সমৃদ্ধশালী ভাষা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের সাহিত্যের স্বীকৃতি সেভাবে জোটেনি। রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তির ১০০ বছর পার হলেও এর পর আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রে কোনো লেখক তেমন পর্যায়ের কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাননি। অথচ আমাদের দেশে অনেক গুণী ও উন্নত মানের সাহিত্যিক গত ১০০ বছরে কমবেশি দেখা গেছে। তবে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বর্তমানে বড় অভাব দেখা যাচ্ছে স্বাচ্ছন্দ্যের। এই স্বাচ্ছন্দ্যের অভাবেই বাংলা সাহিত্য উচ্চ জাতের হয়ে উঠতে পারছে না। এর মূলে রয়েছে রাজনৈতিক কূপম-ুকতাজনিত সংকীর্ণ চিন্তা। এই সংকীর্ণ চিন্তাই একজন লেখকের স্বাচ্ছন্দ্য হরণ করে।  
অথচ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন লাইব্রেরিতে চীন, জাপান, কোরিয়ার সাহিত্য বেশ পাওয়া যায়। ভারত বহু ভাষার দেশ। তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে হিন্দি। অথচ এই দেশটির আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্যও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পাওয়া যাচ্ছে। কারণ তারা শুধু সৃষ্টিশীল সাহিত্যই করছে না পাশাপাশি তারা সেই সাহিত্যের অনুবাদ করছে। ফলে তা বিশ্বসাহিত্যে সহজেই জায়গা করে নিতে পারছে। বিষয়টি লক্ষ করলে এবং এর গুরুত্ব অনুধাবনে সমর্থ হলে বাংলা সাহিত্যকর্মেরও অনুবাদ হওয়া জরুরি। এখানে বাংলা বলতে বাংলাদেশের সাহিত্যকেই বোঝাচ্ছি। কেননা, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্য কিন্তু অনুবাদের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই বিশ্বের দরবারে জায়গা করে নিতে সচেষ্ট। এক্ষেত্রে তাই আমরা মনে করি, বাংলাদেশ সরকার অনুবাদের উদ্যোগ নিতে পারে। 

সেক্ষেত্রে লিট ফেস্ট আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সূত্র ধরে সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে আদান-প্রদানের যে পরিসর সৃষ্টি করছে, সেই সুযোগকে সরকারকেই কাজে লাগাতে হবে। যাতে করে বিশ্বদরবারে আমাদের বাংলা সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

তবে এ লিট ফেস্ট নিয়েও কথা উঠছে। এখানে আসলে কোন জাতের সাহিত্যকে আহ্বান করা হচ্ছে। সাহিত্য অবশ্যই সর্বকালেই নিভৃত চর্চার বিষয়। এ ছাড়া উন্নত সাহিত্য সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যেভাবে এখানে তথাকথিত জমকালো বিনোদন প্রয়াসী সেলিব্রেটিদের আমন্ত্রণ করা হচ্ছে তারা আসলে কোনো আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্যিক? সাহিত্য কি দাঁত কেলিয়ে হাসার মতো অ্যাতোই আনন্দ দায়ক? প্রকৃতপ্রস্তাবে, এভাবে কি তারা সাহিত্যের ‘মাফিয়া’ সৃষ্টিতেই উৎসাহ দিচ্ছেন না তো! এই সাহিত্যিকদের মধ্যে আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাদের পরবর্তীদের মতো অধ্যবসায়ী সাহিত্যিকরা পড়বেন কি? নাকি ‘দরবারি’ সাহিত্যিকরাই পড়বেন? বিষয়টি আয়োজকদের ভেবে দেখতে বলি।  

Ads
Ads