ইউরোপে জিএসপি ঝুঁকি: সমাধানের পথেই হাঁটতে হবে

  • ৫-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সংকটের শুরু হয় রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর থেকেই। তবে এর আরো আগে থেকেই একটু একটু করে এর আভাস দিয়ে যাচ্ছিল। যা ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বরে সংঘটিত তাজরীন ফ্যাশন অগ্নিকান্ড থেকে এর সূচনা। আর রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিষয়টি গোটা দুনিয়াকেই নাড়িয়ে দেয়। এরই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করে। এর পেছনে অবশ্য বাংলাদেশের ভেতর থেকেই কোনো ব্যক্তির হাত আছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মদ ইউনূস, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া প্রমুখ। অর্থাৎ এ সময় থেকেই মূলত বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাত ঘরে এবং বাইরে, উভয় দিক থেকেই বৈরী পরিস্থিতির মুখে পড়ে। সেই থেকে এই জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে বাংলাদেশ অনেক দেন-দরবার করলেও সব দেনদরবারই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। 

এখন ২৮ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সেই সুবিধা দেওয়া থেকে পিছিয়ে আসতে চাইছে। অর্থাৎ ইইউও এই জিএসপি সুবিধা বন্ধ করার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, পোশাক খাতের সংস্কারবিষয়ক ইউরোপের ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশের (অ্যাকর্ড) কার্যক্রমের মেয়াদ না বাড়ানোয় তারা বাংলাদেশের জিএসপি প্রত্যাহারের বার্তা দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের প্রধান এই রফতানি খাতটি নিয়ে এক ধরনের ঝুঁকির মুখেই পড়ল মনে হচ্ছে। অথচ ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (অস্ত্র ছাড়া সব কিছু) স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে অস্ত্র ছাড়া সব পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার বা জিএসপি সুবিধা পেয়ে আসছিল।

বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথিবীর কোনো দেশই যখন অর্থনৈতিকভাবে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু করে তখনই সেই দেশ একটা বৈরী পরিস্থিতির মুখে পড়ে। সেটা অর্থনৈতিকভাবেই হোক আর সামরিক শক্তির ক্ষেত্রেই হোক। চীন যখন অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেল তখন আমেরিকা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ল। অবশ্য এই উৎকণ্ঠার শুরু আরো আগে থেকেই। যখন চীন একটু একটু করে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আসছিল বিশে^র প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর তখন থেকেই মূলত তাদের উৎকণ্ঠার শুরু। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে করে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গবেষণা জানিয়ে রেখেছে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে উন্নীত হবে। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদানটি হচ্ছে, গার্মেন্ট খাত। এখন এই গার্মেন্ট খাতটিই পড়েছে আমেরিকার পর ইউরোপের রোষানলে।  

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একক অঞ্চল হিসেবে ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। কাজেই সেখানে জিএসপি সুবিধা রহিত হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য সেটা হবে একটা বড়সড় ধাক্কাবিশেষ। 

২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর উত্তর আমেরিকার ক্রেতাজোট অ্যালায়েন্স ও ইউরোপের জোট অ্যাকর্ড বাংলাদেশের কারখানাগুলোর মান পরিদর্শনের কাজ শুরু করে। মানসম্মত না হওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে একাধিকবার সংগঠন দুটির কার্যক্রমের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ আদালত মেয়াদ আর না বাড়াতে সরকারকে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ অনুযায়ী অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কার্যক্রমের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে তাদের কার্যক্রমের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। 
সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। কোনো কোনো সদস্য বাংলাদেশকে প্রদত্ত জিএসপি সুবিধা তদন্ত ও বাতিল করার প্রসঙ্গটিও তুলেছেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা তাদের জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে অ্যাকর্ডের কার্যক্রমের মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট কোন সিদ্ধান্তের দিকে মোড় নেয়।

বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে। বলাই বাহুল্য যে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এত দিন বাংলাদেশ যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিল, ক্রমেই তার অনেক কিছু চলে যাবে। তখন অবশ্যই বাংলাদেশকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এক্ষেত্রে স্মারণ রাখা প্রয়োজন যে, অনেক দেশ আছে যারা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর আর তেমন উন্নতি দেখা সক্ষম হয়নি। বরং যেন আরো পিছিয়ে গেছে। তন্মধ্যে অন্যতম ইন্দোনেশিয়া। অথচ ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়ার চেয়ে অগ্রগামী ছিল। দেশটি কিন্তু এখন দক্ষিণ কোরিয়া তো বটেই মালয়েশিয়া থেকেও পিছিয়ে গেছে। কাজেই উন্নয়নশীল দেশের তকমা পাওয়াটাই বড় কথা নয়, তা ধরে রাখতে সক্ষম হবে কি না দেশটি সেটাই সবার আগে দেখতে হবে। এখন যদি ইউরোপেও জিএসপি সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য তাহলে সেটা হবে দেশের উন্নতির ক্ষেত্রে বড় একটা ধাক্কাবিশেষ।  

তারপরও আমরা মনে করি, বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশে অ্যাকর্ডের কার্যক্রমের মেয়াদ বাড়ানো না গেলেও তাদের অন্য কীভাবে ধরে রাখা যায়, সেটা দেখতে হবে। অ্যাকর্ড ১৯২টি আন্তর্জাতিক পোশাক প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের গার্মেন্টশিল্পের নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করছে। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় হবে, ইইউর সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সমঝোতা চালিয়ে যেতে হবে।  সেসঙ্গে শুধু ইউরোপ-আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বাজার সম্প্রসারণের দিকেও হাঁটতে হবে।

Ads
Ads