জাতিসংঘকে আস্থায় না নিয়ে নেপিডোকে নয়

  • ৪-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

রোহিঙ্গাদের রাখাইনে পাঠানো বিষয়ে ইউএনএইচসিআরকে বাদ দিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবার তার সমালোচনা করল জাতিসংঘ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এক ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিচ বলেন, ‘শরণার্থীদের ব্যাপারে নেতৃত্বদানকারী ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে এ নিয়ে যে আলোচনা হয়নি, সেটা স্পষ্ট।’ যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম গার্ডিয়ান গত বুধবার এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কারণটি স্পষ্ট। একদিকে বাংলাদেশ সরকার চাচ্ছে, যেনতেন প্রকারে দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো আর অন্যদিকে মিয়ানমারও চাচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থান একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকা ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রথম ধাপে ৪৮০টি পরিবারের ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এহেন অবস্থায় জাতিসংঘকে এড়ানোর অভিযোগ উদ্বেগজনক বলেই আমরা মনে করি। কেননা, বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখা উচিত, আজকে যে মিয়ানমার সরকার নমনীয় হয়েছে এর পেছনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবদানই নিরঙ্কুশ। নয়তো আজ বাংলাদেশকে আরো কঠিন পরিস্থিতিই মোকাবিলা করতে হতো। এমনকি একটা সময় কিন্তু মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্ত বারবার লঙ্ঘন করে যুদ্ধ পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তারা আর এর বেশি এগোতে পারেনি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সজাগ দৃষ্টির কারণেই মূলত। 

সুতরাং জাতিসংঘকে পাশা কাটানো অভিযোগ যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় তাহলে তা হবে বাংলাদেশের জন্যই সমূহ ক্ষতি। কাজেই যা করার তা জাতিসংঘকে আস্থায় নিয়েই করতে হবে। বর্তমানে যতটুক অগ্রগতি ও আশার জায়গা তৈরি হয়েছে তা তাদেরই নিরঙ্কুশ ভূমিকার জন্য হয়েছে। এ জন্য অবশ্যই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা সমীচীন। আমাদের ঘরোয়া রাজনীতির যে প্রকৃতি তা যেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একই রূপ পরিগ্রহ না করে। তাহলে  আমাদেরই সমূহ ক্ষতি। কাজেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছানোর যেকোনো বিষয় বাংলাদেশের পক্ষে যাবে না, তা হলফ করেই বলা যায়। এমনিতেই বিশ্ব সম্প্রদায়ের অন্যতম শক্তি রাশিয়া, চীনসহ অনেক দেশই কার্যত আমাদের বিপক্ষেই গিয়েছে। এখন আমরা তাদেরও আমাদের বিপক্ষে ঠেলে দেবো? 

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি।’ আশা করি বাংলাদেশ সরকার তেমন পরিস্থিতিতে পড়ার কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে না। অথচ প্রকৃত সত্য হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যে তিনটি পূর্বশর্ত দিয়েছিলেন তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দেখা যায় না। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, প্রথমত, মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বৈষম্যমূলক নীতি ও আইন বিলুপ্ত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অসন্তোষের মূল কারণ উচ্ছেদে সব ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিয়ে তাদের সেফ জোনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী যে তিনটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছিলেন তা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহের দাবির সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ। কাজেই এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারকেও সে তিনটি দাবি থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশেরই ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এ অবস্থায় যেনতেন প্রকারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আদৌ টিকবে কি না সে বিষয়েও বাংলাদেশ সরকারকে সচেতন থাকতে হবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের ওপর সহানুভূতিশীল আন্তর্জাতিক মহল থেকে কোনো বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। তা ছাড়া এ পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার এমন কিছু করে দেখাতে পারেনি যে কারণে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারকে আস্থায় নিতে পারে। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহকে আস্থায় না নিয়ে উল্টো অবিশ^স্ততার পরিচয় বহনকারী মিয়ানমারকে যদি বাংলাদেশ সরকার আস্থায় নেয়, তাহলে সেটা নিজের পায়েই কুড়াল মারার নামান্তর হবে না, এ আশঙ্কার কথা আমরা কীভাবে অস্বীকার করতে পারি?

Ads
Ads