রাস্তার পাশে লাশ: কোনো পাষণ্ডও মেনে নিতে পারে?

  • ২৩-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দেশে খুনখারাবিতে যোগ হলো আরো একটি উদ্বেগের খবর। একই দিনে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চার এবং ঢাকার তুরাগে দুই লাশ উদ্ধারের অঘটন আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। দেখা গেছে, লাশগুলোর প্রতিটির মাথার পেছনে গুলির চিহ্ন রয়েছে। এ পর্যন্ত একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি ঢাকার রামপুরায় বসবাসকারী একজন গাড়িচালক। কে বা কারা তাদের খুন করেছে এখনো পর্যন্ত তার ক্লু পাওয়া যায়নি। অবশ্য পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি বলেছেন, তারা ‘ডাকাত দলের সদস্য’। তাদের পেশা ও পরিচয় যাই হোক, এভাবে কিন্তু কারো নিহত হওয়ার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। বিশেষত এভাবে লাশ পড়ে থাকার কারণ যাই হোক; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিন্তু কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। চিহ্নিত বা অচিহ্নিত অপরাধীদের কেউ কেউ কীভাবে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়, সেটাও এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট। আমরা মনে করি, হত্যাকারী যেই হোক তাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই। এমনকি নিহতরা যদি অপরাধীও হয়, প্রচলিত আইনের আওতায় তাদের বিচার হোক এটা আমরাও চাই। তবে এভাবে রাস্তায় অজানা খুনের ছোবলে কেউ লাশ হয়ে পড়ে থাকবে, এটা কোনো পাষণ্ডও মেনে নিতে পারে? একবার ভেবে দেখুক সে, ঘটনাটি যদি তার ওপর দিয়েই যায়, মেনে নেবে?

ওইদিনই অন্য এক ঘটনায় ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ী এলাকায় থাকা কাশবনের ভেতর থেকে দুটি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। লাশের পচন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কয়েক দিন আগে খুন করা হয়েছে। আড়াইহাজারে উদ্ধার গুলিবিদ্ধ লাশ চারটি যে হত্যাকাণ্ড , তাতে সন্দেহ নেই। তবে সন্দেহ হচ্ছে, কারা তাদের হত্যা করেছে। আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ সেটাই।  

গণমাধ্যমে আমাদের প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ, আত্মহত্যা বা অনাকাক্সিক্ষত কারণে একের পর এক নিহত হওয়ার খবর দেখতে হয়। কিন্তু ওইসব অঘটনের সঙ্গে এই ছয় লাশ উদ্ধার হওয়ার গুণগত পার্থক্য রয়েছে। যখন সরকার থেকে বলা হচ্ছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে, দেশবাসীরও প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের নেওয়া উন্নয়নমূলক কাজগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক সেখানে নতুন করে এই খুনের ধারাবাহিকতা আমাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় প্রতিদিনই এই খুনের ধারাবাহিকতায় দেশের কোথাও না কোথাও মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু জানা যাচ্ছে না কারা তাদের হত্যা করছে। আর উদ্বেগটি এখানেই।

মানুষ এক বেলা কম খেয়ে হলেও পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু সুখে-শান্তিতে ও নিরাপদে থাকতে চায়। কিন্তু এই খুনের ধারাবাহিকতা যেন দেশ থেকে ক্রমশ সেই পরিবেশ হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষে-মানুষে এখন আর আগের মতো হার্দিক নয়। গণমাধ্যমে উঠে আসছে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর। আর এরকম খুনের ঘটনায় সম্প্রতি নতুন করে যোগ হয়েছে খুনের ধারাবাহিকতা। এর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য হচ্ছে দুই শিশু হত্যা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তিন বছরের একটি মেয়েশিশুকে শ্বাসরোধে ও বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারী সন্দেহে পুলিশ ওই বাড়িরই দুই ভাড়াটিয়াকে গ্রেফতার করেছে। অন্য ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার দোহারে। ১২ বছরের এক কন্যাশিশুকে গলা কেটে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন আগে ঢাকার গুলশানে কর্মরত এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে পুলিশ পরিচয়ে গাড়িতে তুলে নেয় অপরাধীরা এবং গাড়িতে তুলেই বেদম মারধর শুরু করে। পরে পাঁচ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় রাস্তার ওপর ফেলে দেওয়া হয়। রাজধানীতে এ রকম ১০টি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়েছে। আমরা জানি যে, এসব খুনাখুনির পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আধিপত্য বিস্তার, জমিজমা বা টাকা-পয়সা নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতাসহ আরো অনেক কারণ রয়েছে। রাজনৈতিক হত্যার অভিযোগও কম নেই। সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের স্বস্তির জায়গাটিই উধাও হয়ে যাচ্ছে।

কাজেই এ ধরনের পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির লক্ষণ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এটাও ভুললে চলবে না যে, এ ধরনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নাগরিকদের মনে প্রথমেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ জাগবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাও কমে যেতে বাধ্য। এ ছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতিতে অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও সুযোগ নিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যরাও এমন পরিস্থিতিতে কারও পক্ষ হয়ে কাজ করতে পারে।

কেননা, এ ধরনের পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির লক্ষণ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এটাও মনে রাখা জরুরি, এ ধরনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নাগরিকদের মনে প্রথমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কাই জাগবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাও কমে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও সুযোগ নিতে পারে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যরাও এমন পরিস্থিতিতে কারও পক্ষ হয়ে কাজ করতে পারে। তখন অপরাধী হোক, নিরপরাধ হোক, আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে। সুতরাং উদ্ধার হওয়া ছয় লাশের পরিচয় ও তাদের হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটিত হোক এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। আর তা আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই।

Ads
Ads