প্রত্যাশার আলো ছড়ানো বিমসটেক চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন

  • ৩১-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট ‘সার্ক’ যে সম্ভাবনার বার্তা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক বৈরীভাবাপন্নতার জন্য মুখ থুবড়ে পড়ে।  এ অবস্থায় এখন সার্কের ‘বিকল্প’ হিসেবে ধরা হচ্ছে বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন বা বিমসটেককেই। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা সাতটি দেশের জোট বিমসটেকের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন গতকাল শুক্রবার নেপালের রাজধানী কাঠ মান্ডুতে শেষ হলো। 

বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন বা বিমসটেকের এই সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান। আজকাল বিশ্বে এককভাবে কোনো দেশই উন্নতি করতে পারে না। সম্ভবও নয়। যারা এ কাজ করতে গিয়ে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তারাই পিছিয়ে গেছে। যেমন ধরা যাক বিশেষ আদর্শবাদী দেশ উত্তর কোরিয়া বা কিউবার কথাই। ভিন্ন  আদর্শের কারণে তারা একপর্যায়ে মুক্ত বাজার অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। কট্টর ডান বা বাম এই ধ্যানধারণা বিশিষ্ট আদর্শ যে অর্থনৈতিক উন্নতির অন্তরায়, তা গত কয়েক দশকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে আধুনিক বিশ্বে নানা ধরনের জোটবদ্ধতার গুরুত্ব বাড়ছে। প্রথম দিকে বৈশ্বিক জোটবদ্ধতার গুরুত্ব দেখা গেলেও সাম্প্রতিককালে আঞ্চলিক জোটবদ্ধতারও গরুত্ব পাচ্ছে। এতে আঞ্চলিকতার গন্ধ থাকলেও জোটবদ্ধ দেশগুলো বৈশ্বিক চেতনাতেই জাগ্রত। 

সেই চেতনার আলোকেই অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৭ সালে ‘ব্যাংকক ঘোষণা’র মধ্য দিয়ে চালু হয় বিমসটেক। প্রারম্ভিকে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড নিয়েই গঠিত হয় বিমসটেক। পরবর্তীকালে মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান এসে যুক্ত হয়। গত দু’ দশকে এই জোটের সাফল্য বলতে তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও এবারের সম্মেলনে পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার আলো ছড়াতে পারবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিমসটেকের আলোচনাকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্রপথে বিমসটেক ক্রুজ চালু করার প্রস্তাব করেন এবং নেপাল ও ভুটান তাদের প্রয়োজনে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারে বলেও জানান। আর এরকম পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত যদি জোটের অন্য দেশগুলো অনুসরণ করে তাহলে এই জোটের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমরা আশা করতে পারি। আরেকটি যেমন বিদ্যুতের গ্রিড কানেক্টিভিটি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। যেখানে সৌর বিদ্যুতের জন্যও আঞ্চলিক গ্রিড করার প্রস্তাব করেন শেখ হাসিনা। কারণ এ অঞ্চলের অনেক দেশেই দিনে দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যালোক পাওয়া যায়।  

তবে এই আঞ্চলিক সহযোগিতা ততোদিন পর্যন্ত ফলোদয় হবে না যতোদিন পর্যন্ত বিদ্যমান রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হচ্ছে। যেহেতু এ সংকটের মূলে বিমসটেকের সদস্য দেশ মিয়ানমার, কাজেই দেশটিকে এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই ঔদার্য্যরে পরিচয় দিতে হবে। যেমন বাংলাদেশের তরফ থেকে সমুদ্রপথে বিমসটেক ক্রুজ চালু করার প্রস্তাব ছাড়াও নেপাল ও ভুটানের প্রয়োজনে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতো ঔদার্য্যরেই উদাহরণ। যদিও বিমসটেকের মূল আলোচ্য বিষয় অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট নয়- তারপরও সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে বিশেষ প্রস্তাব রাখা যেতো বলে আমরা মনে করি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কাঠমান্ডূ পৌঁছেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। এতে নেপাল-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে কথা হয় বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যেই নেপালের সঙ্গে যৌথভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এরই মধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন।

সম্মেলনে বিমসটেকভুক্ত সাতটি দেশের মধ্যে গ্রিড কানেক্টিভিটি প্রতিষ্ঠা এবং ফৌজদারি ও আইনি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্পর্কিত দুটি এমওইউ প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। গ্রিড কানেক্টিভিটির অগ্রগতি হলে শুধু সাতটি দেশই নয়, পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা যায়। 

Ads
Ads