উচ্চমাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ‘সতর্কতা’ নাকি অসতর্কতার ফসল!

  • ২৪-Jul-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

কোথায় দেশ সামনের দিকে শনৈ শনৈ এগিয়ে যাচ্ছে অথচ বিপরীতে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে হঠাৎ করেই দেখছি একেবারেই উল্টো চিত্র! মাধ্যমিকে রেজাল্টে বিপর্যয়ের পর এবার এইচএসসিতেও দেখা গেল একটা বড়সড় ভূমিধস! বৃহস্পতিবার একযোগে প্রকাশ হলো দেশের ১০ শিক্ষাবোর্ডে চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল। দেখা গেছে, বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সফল শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস মুখরিত ছবি। এই হাস্যোজ্জ্বল মুখরিত ছবি সফলদের। আর যারা বিফল বা ‘ব্যর্থ’ তাদের ছবি কি কখনো মিডিয়া তুলে ধরেছে! এটাই জগতের নিয়ম। সফলদের গুণগান আর ব্যর্থদের জন্য অশেষ করুণা! বিস্ময়কর আরো যে, এবারের এইচএসসি রেজাল্টে গত এগারো বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বাজে ফলাফল। ফলে গভীর এক তিক্ত অভিজ্ঞতা ভর করেছে লাখো পরীক্ষার্থীর হৃদয়ে। কিন্তু এই ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যের কারণ কি? সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে এই ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখা গেছে, ইংরেজি ও আইসিটিতে ব্যর্থতা। এ দুটি বিষয়ের ধাক্কা লেগেছে প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ও জিপিএ ৫-এ।

 

ফলে স্বাভাবিক কারণেই সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষায় ভর্তি নিয়ে গভীর চিন্তায় পড়েছেন উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীরা। দেখা যাচ্ছে, গেলবারের চেয়ে সাড়ে আট হাজার জনের বেশি জিপিএ-৫ কম পেয়েছেন এবার। ফলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরাও। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি কমার কারণ হিসেবে সংশ্নিষ্টরা মোটা দাগে অবশ্য আরও কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। অতীতের চেয়ে খাতা দেখায় ‘সতর্কতা’ অবলম্বন করা হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে খাতা দেখা হয়েছে কঠোর হাতে। আর এখানেই আমাদের প্রশ্ন নিকট সাম্প্রতিকে আমরা মাধ্যমিকে ও উচ্চমাধ্যমিকে যে শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় ভালো ফল করতে দেখেছি সেখানে তাহলে এই ‘অসতর্কতা’ ছিল, যে অসতর্কতার জন্য তখন এতো ভালো ফল এসেছিল? নাকি দেশের সুধীমহলসহ সচেতন সমাজ ওই অভাবনীয় ভালো ফল নিয়ে ‘প্রশ্ন’ তোলাতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই চৈতন্যোদয় হলো? অথচ তখন তো তাদের শতভাগ ‘পাস’ করিয়ে দেয়ারই কীই না প্রত্যয় ছিল। আমরা শিক্ষা নিয়ে এরকম ‘ভানুমতীর খেল’ দেখতে আর প্রস্তুত নই। এ নিয়ে সস্তা বাহবা কুড়াবারও পক্ষপাতী নই। প্রকৃত মানদ- অনুযায়ীই শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করা হবে এটাই প্রত্যাশিত।

গত মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর তাই শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এবার পাসের হার কিছুটা কমলেও পাসের গুণগত মান বেড়েছে’। এবারের উচ্চমাধ্যমিকেও নিশ্চয় শিক্ষামন্ত্রীর সে উক্তিটি ফের স্বীকার করতে হয়। কেননা, শিক্ষামন্ত্রী অনুরূপভাবেই বলেন, ‘যেনতেনভাবে পাস করার দিন বহু আগেই ফুরিয়েছে। খাতা দেখায় এখন সতর্কতা এসেছে। আমরা এখন শিক্ষার মানে বিশেষভাবে জোর দিচ্ছি। এ কারণেও পাসের হার কিছুটা কমতে পারে।’ বটেই, কেননা, গত কবছরে যেভাবে গণহারে পাসের উৎসব দেখা গেছে তাতে গোটা দেশেই সন্দেহের সঙ্গে কালো মেঘের বাতাবরণ নিয়ে একটা উদ্বেগ দেখা গিয়েছিল। আর সেই উদ্বেগের ফসল দেখলাম শিক্ষামন্ত্রীর এই তৃপ্তিকর মন্তব্যে। তাই ফের অবনমনের দিকে পিছুটান! এখানেই তো সকলের মনে একটা খটকা জাগতেই পারে আগের বছরগুলোতে যেখানে গণহারে সব পাস করছিল হঠাৎ করে সেখানে আবার কী তেলেসমাত শুরু হলো যে, আবার এই অবনমনের দিকে ফিরে আসতে হবে? তবে কি আগের পাসের হারও যেমন কৃত্রিম ছিল তেমনি এখন এই অবনমনও কৃত্রিমভাবে সম্পাদিত! অন্যদিকে একসময়ের সফল শিক্ষা বোর্ড কুমিল্লায় কবছর ধরে দেশের অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় টানা সবচেয়ে কম পাসের হার দেখা গেছে। এ নিয়ে গত বছর প্রধানমন্ত্রীও এক বৈঠকে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মাধ্যমিকের মতো উচ্চমাধ্যমিকেও কী এমন কারণ ঘটল যে, গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ১৬ ভাগ বেড়েছে কুমিল্লা বোর্ডে? তার আগে ক্যাবিনেটের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লা বোর্ডের অবনমনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তৎকালীন শিক্ষা সচিবকে উদ্দেশ করে যিনি নিজেও কুমিল্লার। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন ছিল, যে কুমিল্লার শিক্ষার্থীরা দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করত সেই কুমিল্লাতেই কেন এরকম ফল বিপর্যয়। আর পরই কি-না মাধ্যমিকেও যেমন কুমিল্লা বোর্ডের ফল ঘুরে গেল তেমনি এবার উচ্চমাধ্যমিকেও তা-ই দেখা গেল! তেলেসমাত তো নয়, বিষয়টি!

তবে ‘সতর্কতা’ অবলম্বনের মধ্যে থেকেও এবং এই ফল বিপর্যয়ের পরও যারা সফল হয়েছেন তাদের প্রতি রইল আমাদের পক্ষ থেকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। আর যারা পাস করতে পারেননি তাদের প্রতিও রইল ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য অনুপ্রেরণা। যাহোক, আমরা চাই প্রকৃত গুণগত মান। আরোপিত বা কৃত্রিম নয়। কেননা, আজকের এই শিক্ষার্থীরাই জাতির ভবিষ্যৎ। যারা আগামীদিনের কাণ্ডারি হতে প্রস্তুত, এটা যেন আমাদের অবশ্যই মনে থাকে।

Ads
Ads