‘কঠোর পরিশ্রম করলে কখনো বৃথা যায় না’

  • ১-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: জাককানইবি প্রতিনিধি ::

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ.এইচ.এম. মোস্তাফিজুর রহমান এর সাথে দৈনিক ভোরের পাতার জাককানইবি প্রতিনিধি এর সাথে কিছু বিষয় নিয়ে বুধবার (২৮ নভেম্বর) তারিখ সাক্ষাৎকার হয়।

প্রশ্ন:১.স্যার কেমন আছেন?
উত্তর: ভাল আছি, আপনারা কেমন আছেন?

প্রশ্ন:২. স্যার আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন........
উত্তর: জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলায় নানার বাড়িতে আমার জন্ম। আমি ছোটবেলায় খুবই দূরন্ত ছিলাম। উপজেলা শহরে নানার বাড়িতে থাকতাম,কারণ আমার বাবার বাড়ি নদীতে ভেঙ্গে যায়। বর্ষাকালে নদীতে সাঁতার কাটতাম। সারাদিন বন্ধুদের সাথে ফুটবল, হাডুডু, কানামাছি, লাটিম ঘোরানো আরও কতোকি খেলাধুলা করতাম। কিন্তু আমি সবসময় ক্লাসে প্রথম হতাম। বাবা ঢাকায় চাকরি করতেন খুবই সুন্দর ভাবেই চলছিল আমাদের পরিবারটা। মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবাকে মেরে ফেলার পর আমার জীবনটা একদম তছনছ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবা শহীদ হন এবং আমি আমার বাবার লাশ পর্যন্ত দেখতে পাইনি। বুড়ো নানা, নানী, মা আর আমি সহ আমার পাঁচ ভাই আমিই পরিবারের বড় ছেলে সবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পড়ে আমার উপর। নানার যে সামান্য জমি ছিল তা চাষ করে আমাদের বছরের চার মাসের খাবার চলত। বাকি আট মাস কিনে খেতে হত। খুবই কষ্টে কাটত দিনগুলো।

প্রশ্ন:৩. স্যার আপনার স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে যদি কিছু বলতেন.....
উত্তর: ১৯৭২ সালে আমি এস.এস.সি পাশ করলাম ১ম বিভাগে। বাড়ির পাশের কলেজে ভর্তি হলাম। দিনে চারবার প্রাইভেট পড়াতাম তাই দিয়ে জীবন চলত। আর ভাবতাম বাড়ির পাশে জুট মিলে চাকরি নিব। কারণ পরিবারের বড় ছেলে আমি। আই.এস.সিতে আমরা ১০৭ জন পরীক্ষা দিলাম পাশ করলাম সাত জন। আমাদের কলেজে কেউ ১ম বিভাগ পায় নাই। আমি ২য় বিভাগে পাশ করলাম, সারাদিন প্রাইভেট পড়ানো কাজ করে ঠিকঠাক মত নিজের পড়ালেখা করতে পারিনি।

ডিগ্রিতে ভর্তি হলাম উদ্দেশ্য জুটমিলে একটা চাকরি নিব। ছোট ভাইদের পড়াব, আর পরিবারটা দেখব। আমি ছোটবেলা থেকে ইংরেজি ভাল পারতাম, কলেজে মাঝে মাঝে ইংরেজিতে লেকচার দিতাম। একদিন আমার একবন্ধু নাম সিদ্দিক বলে, মোস্তাফিজ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিব চল আমার সাথে যাই ফর্মের টাকা আমি দিব। ১০ ঘন্টা ট্রেনে যাওয়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছালাম। ১ম কোন বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম যা স্বপ্নের মত। আজ থেকে ৪২ বছর আগের কথা।বন্ধুকে সাহায্য করতে যেয়ে আমি ফেসে গেলাম আমি কারণ পরীক্ষায় প্রথম হলাম।

কিন্তু আমার কোন প্রতিক্রিয়া নাই। কিন্তু আমার বন্ধু ৬ষ্ঠ হয়েছে। ভাইভাতে বলল তুমি তো সমাজবিজ্ঞানে পড়বা না ইংরেজিতে পড়বা । আমি বললাম এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বনা। বন্ধু ভর্তি হতে চলে গেল আমি বাড়ি চলে আসলাম টার্গেট জুটমিলে চাকরি নিব। ডিগ্রিতে পড়ি আর দিনে চার-পাচ বার প্রাইভেট পড়াই। স্কুলে পড়া অবস্থায় এক সহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাথে পরিচয় হয় তার নাম নিজামউদ্দিন আমি তাকে ভাই বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে মাঝে মাঝে টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন। ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ পরিবারের বড় ছেলে সবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আমার উপর। কি যে দুঃসময় গেছে তা বলে বুঝাতে পারবনা।  এতদিনে সিদ্দিকের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। সিদ্দিক বলল একদিন স্যার ক্লাসে জিজ্ঞাস করলেন কে প্রথম হয়েছে।

সিদ্দিক দাঁড়িয়ে বলল তার নাম মোস্তাফিজ জামালপুর বাড়ি সে পড়বে না। স্যার বললেন কেন পড়বে না সিদ্দিক বলল মোস্তাফিজের আর্থিক সমস্যা। স্যার সিদ্দিককে আমার উদ্দেশে চিঠি লেখতে বললেন। সিদ্দিক আমার উদ্দেশে চিঠি লেখল এবং বলল স্যার তোকে প্রাইভেটের ব্যবস্থা করে দিবে তুই রাবিতে চলে আয়। আমি ধার-দেনা করে রাবিতে যেয়ে ঐ স্যারের সাথে দেখা করলাম। স্যার বলল তোমাকে প্রাইভেটের ব্যবস্থা করে দিব, আর আমাদের গবেষণাকর্মে কাজ কর কিছু টাকা পাবে তা দিয়ে চলবে তোমার। তুমি ভর্তি হয়ে যাও। আমি বললাম স্যার আমাকে আমার পরিবার দেখতে হয়। স্যার আমি এখানে ভর্তি হলে আমার পরিবারকে দেখার মত কেউ নাই। স্যার বলল তোমার ছোট ভাইকে জুট মিলে চাকরির ব্যবস্থা করে দাও। আমি বাড়ি চলে আসলাম জুটমিলের ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম ছোট ভাইয়ের চাকরির বিষয়ে, ম্যানেজার চাকরি দিলেন তবে পার্ট টাইম। 

কিছু টাকা ধার নিয়ে মাকে বলে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম। ছোট ভাই সারারাত ডিউটি করে যে টাকা পায় তা দিয়ে পরিবারের দেখভাল করা হয়। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম আরও একটি সাহসে কৃষি কর্মকর্তা নিজাম ভাই বললেন তুমি যাও আমি তোমাকে প্রতিমাসে ১০০ টাকা করে দিব। আমি নিজে রোজগার করতাম আর পড়তাম। বাড়িতে কম আসতাম, শুধু গ্রীষ্মকালে দেড়মাসের বন্ধ থাকত তখন আসতাম। বাড়িতে আসতাম প্রাইভেট পড়াতাম, অনেক প্রাইভেট পড়াতাম তাতে এক থেকে দেড় হাজার টাকা রোজগার করতাম। টাকা খরচ করতাম না সম্পূর্ণ টাকা জমা রেখে রাবিতে চলে যেতাম। আমি বাড়ির ব্যাপারে বেশি খোঁজখবর নিতাম না। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম কবে আমার একটা পরীক্ষা হয়। অবশেষে অপেক্ষার অবসান হল পরীক্ষা হল এবং আমি ১ম হলাম। সবাই অবাক যে ছেলের ভাল কোন কাপড় নাই এক কাপড় পড়ে প্রতিদিন ক্লাসে আসে সে প্রথম হইছে। আমার একসেট পাজামা পাঞ্জাবী আর একটা শার্ট, প্যান্ট ছিল তাই দিয়েই আমি ক্লাস করতাম। 

আমার এম.এ ফাইনাল পরীক্ষা চলছে তখনও সময় দেখার মত কোন ঘড়ি নেই আমার কাছে। কখন কয়টা বাজে, আমি ঘড়ি দেখার জন্য বারবার নীচতলায় হলের মসজিদে যেতাম। কখনও পাশের রুমে যেতাম না কারণ সে যদি বিরক্ত বোধ করে। আমি বই কিনতে পারতাম না তাই সব সময় লাইব্রেরিতে পড়তে যেতাম। আমি এত বিপ্লবের পরও বিভাগের ফার্ষ্ট ক্লাস ফার্ষ্ট হয়েছি। তৎকালীন সময় ফার্ষ্ট ক্লাস ফার্ষ্ট হওয়া অনেক কিছু, কারণ সচরাচর এমন ছিল না। পরবর্তিতে বিভাগের স্যাররা আমাকে শিক্ষক হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে এবং আবেদন করতে বলে। আমি আবেদন করলাম এবং ১৯৮৩ সালের ২রা জুন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি।

প্রশ্ন:৪. স্যার আপনার মতে সফলতার মূল-মন্ত্র কি.......
উত্তর:
১. সৎ নিয়ত: মহৎ উদ্দেশ্য থাকতে হবে এবং আপনি কি হতে চান তা মহৎ হতে হবে।
২. কঠোর পরিশ্রম: কঠোর পরিশ্রম করলে কখনো বৃথা যায় না।
৩. স্রষ্টার আশীর্বাদ: মা বাবার দোয় এবং মানুষের ভালবাসা থাকলে সব কিছু অর্জন করা সম্ভব।

প্রশ্ন:৫. স্যার আপনার জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন কি........
উত্তর: আমার সাথে যারা কথা বলেছে চলেছে তাদেরকে আমাকে ভালবাসতেই হবে। আমি রাবিতে খুবই পপুলার শিক্ষক ছিলাম। দুঃখ, কষ্ট এতকিছুর পরও আমি আমার নীতির বিসর্জন দেই নাই কখনো। আমি জোট সরকারের আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে একমাএ সদস্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভোটে জয় লাভ করেছি। এখন আমি বর্তমান আওয়ামী-লীগ সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়নের সহযোগী হতে চাই।

প্রশ্ন:৬. স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুইটি ভর্তি পরীক্ষায় কোন প্রকার অনিয়ম ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন, যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় পারে নাই এই সফলতার মূল চাবিকাঠি কি.......
উত্তর: আমি এটা পেরেছি সকলের সহযোগিতায়।এখানে আমার ব্যক্তি কোন ক্রেডিট নাই। তবে হ্যা, আমি এই অবস্থানটা তৈরি করেছি।

ধন্যবাদ স্যার আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।
ধন্যবাদ আপনাদেরকেও।

Ads
Ads