এই রুপালী গিটার ফেলে...

  • ১৯-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ফেরদৌস বাপ্পি ::

বৃহস্পতিবার রাতে ফিরলাম স্কয়ার হাসপাতাল থেকে। এখনো সেখানে হাজার হাজার ভক্ত, দর্শক, সহকর্মী বাচ্চু ভাইকে এক নজর দেখার অপেক্ষায়। সকাল থেকেই সেখানে আছেন সঙ্গীত অঙ্গনের প্রায় সবাই। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ভেঙ্গে পড়ছেন কান্নায়।

বাচ্চু ভাই বেশ কয়েক বছর ধরেই অসুস্থ ছিলেন। তবে অসুস্থতাকে পাত্তা দিতেন না একদম। কারো সাথে অসুস্থতা নিয়ে কথাও বলতেন না। কেউ অসুস্থতার কথা বললে বরং রাগ করতেন। কোনভাবেই মানতেই পারতেন না এই অসুস্থতাকে। ২০০৯-এ প্রথম হৃদযন্ত্রে ব্লক ধরা পড়ে তাঁর। অপারেশনের মাধ্যমে ২০০৯ সালেই তার হার্টে রিং পরানো হয়। তখন থেকেই ডাক্তারের নির্দেশ ছিলো বিশ্রামে থাকার। কিন্তু ডাক্তারের কথা মানেন নি। কয়েক বছর পরেই আবারো অসুস্থ হন তিনি। এবার ফুসফুস।

২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর ফুসফুসে পানি জমার কারণে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণের পর তিনি সুস্থ হন। ২০১৫ সালে আবারো হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। এরপর  থেকে নিয়মিত চেক আেেপ ছিলেন স্কয়ারে। নিয়মিত ওষুধও খেতেন।

এমনকি দুই সপ্তাহ আগেও হার্টের চেকআপ করিয়েছেন তিনি। তখনও দিব্যি সুস্থ ছিলেন। কিন্তু তারপর ক’দিনের টানা কাজ তাকে ভেতরে ভেতরে ক্ষয় করে ফেলে। স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক ও মুখপাত্র মির্জা নাজিম উদ্দিন জানান, আইয়ুব  বাচ্চু দীর্ঘদিন ধরে কার্ডিও-মাইওপ্যাথি নামক হৃদরোগে ভুগছিলেন। তার হৃদযন্ত্র ৩০ শতাংশ পাম্প করে। যেটা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ দরকার। একজন স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে কম রক্তচাপ ছিল তার হার্টের। তিনি বলেন, ‘ড্রাইভার আইয়ুব বাচ্চুকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তার তথ্যমতে, আইয়ুব  বাচ্চুর মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছিল। এর অর্থ তার হার্টের কার্যকারিতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়ে এই তরল পদার্থ বের হয়েছে। মানে হার্ট ফেল করেছে।’

জীবনের শেষ ৩ দিন : গত ১৬ অক্টোবর রংপুরে উন্নয়ন কনসার্টে অংশ নেন তিনি। কনসার্টে সবাইকে নিয়ে পরিবেশন করেন ‘উড়াল দেবো আকাশে’। সদ্য প্রয়াত পিয়ানিস্ট তুষারকে নিবেদন করেন গানটি। এই কনসার্টেই বাজানোর কথা ছিল তুষারের। তুষারের কি-বোর্ড রংপুরে স্টেজে পৌঁছে গিয়েছিল কিন্তু তুষারই পৌঁছাতে পারেনি। তার আগেই ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তুষার মৃত্যুবরণ করেন। বাচ্চু ভাই তুষারের মৃত্যুর সংবাদে শোকাহত ছিলেন। কনসার্ট শেষে ছিলেন বেশ টায়ার্ড। যদিও কাউকে বুঝতে দেননি।

গত ১৭ অক্টোবর দুপুরের ফ্লাইটে রংপুর থেকে রওনা দেন ঢাকায় উদ্দেশ্যে। বিমানে উঠেই ঘুমিয়ে পড়েন। বিমানে কিছু খান নি।  হয়ত শরীর খারাপ লাগছিল তখন। কিন্তু নিজের শরীরের ব্যাপারে কাউকে কিছু বুঝতে দিতে চাইতেন না। তখনও দেন নি। রাতে বাসায় ফিরে রেস্ট নেন। সকাল ৮টায় তাঁর ধানমন্ডির বাসায় হঠাত করেই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। বাসার লোকজন তাকে  দ্রুত নিয়ে আসেন স্কয়ার হাসপাতালে। কিন্তু তাঁর আগেই সব শেষ। সকাল ৯.৫৫ মিনিটে ডাক্তাররা তাকে অফিসিয়ালি মৃত ঘোষণা করেন এবং জানান তাঁর হৃদযন্ত্র মাত্র ৩০% কার্যক্ষম ছিল।

বাচ্চু ভাইয়ের সহধর্মিণী ফেরদৌস আইয়ুব  চন্দনা। চন্দনা ভাবী সকাল থেকেই স্কয়ারে ছিলেন। আপনজনেরা তাকে শান্তনা দিচ্ছেন। কিন্তু বাঁধ মানছিল না চন্দনা ভাবীর চোখ। কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলে গেছে তার। এমন চরম দুঃসময়ে তাদের  দুই সন্তান বড় মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব এবং ছোট ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব দেশের বাইরে ছিল। মেয়ে ফাইরুজ থাকে অস্ট্রেলিয়ায় আর ছেলে আহনাফ কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। দুজনকেই জানানো হয়েছে বাবার মৃত্যু সংবাদ। দুজনেই ফোনে মায়ের সাথে, আত্মীয়স্বজনের সাথে কথা বলছেন, কাঁদছেন। সন্তানেরা যেন বাবাকে শেষবারের মত দেখতে পারে সেজন্য মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের ফ্রিজিং মরচুয়ারীতে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নিয়ম না থাকা স্বত্বেও স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেজমেন্টে বাচ্চু ভাইয়ের গোসলের ব্যবস্থা করে দেয় ১৮ আগস্ট। হাসপাতালের উল্টোদিকে পান্থপথের মসজিদ থেকে আসেন হুজুরেরা, আরো আসে দুটি খাটিয়া। আর এই পুরো ব্যবস্থা করেন সঙ্গীত জগতের সতীর্থরা। বাচ্চু ভাইয়ের ছোট ভাই, এলআরবির সদস্যরা, পরিচালক ইজাজ খান স্বপন, গীতিকার আসিফ ইকবাল, গায়ক তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, হানিফ সংকেত, তাপস, এরশাদুল হক টিংকু, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী, বামবার সদস্যরাসহ আরো অনেকে সকাল থেকেই সব  ম্যানেজ করছেন। কাফনের সকল সরঞ্জাম নিয়ে আসেন সাংবাদিক মইনুল হক রোজ।  

বৃহস্পতিবার দুপুর ২.৪৫ মিনিটে শুরু হয় স্কয়ারের বেজমেন্টে বাচ্চু ভাইয়ের গোসল। গোসল করান মসজিদের ইমাম, সাথে যোগ দেন মডেল ফয়সালসহ আরো কয়েকজন। দুপুর ৩.১৫ মিনিটের দিকে কাফনের কাপড়ে ঢেকে অপেক্ষমান আপনজনদের বাচ্চু ভাইকে একনজর দেখার সুযোগ দেয়া হয়। এরপর তাঁর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের ফ্রিজিং মরচুয়ারীতে রাখা হয়েছে। 

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন, জানাজা ও দাফন : গতকাল সকাল ১০.৩০ মিনিটে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এটি দেখভাল করে। এর পর জুম্মার নামাজের পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ঈদগাহে। জানাজা শেষে ফিরিয়ে আনা হয় স্কয়ার হাসপাতালের ফ্রিজিং মরচুয়ারীতে। রাতে তার দুসন্তান ফাইরুজ ও আহনাফ দেশে ফিরে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি এসেছে স্কয়ার হাসপাতালে। আজ সকালে তাঁর মরদেহ নেয়া হবে  চট্টগ্রামে। সেখানে জানাজার পর তাকে দাফন করা হবে  তার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁর মায়ের কবরের পাশে।

সবারই প্রশ্ন কেন হঠাৎ এমন হলো! যেহেতু কেউই আগে থেকে জানতেন না যে, বাচ্চু ভাই বেশ অসুস্থ ছিলেন। এজন্য তাঁর অসময়ে চলে যাওয়া সবার কাছেই এক বিশাল ধাক্কার মতো লেগেছে। অনেকটা তাঁর সেই কালজয়ী গানের মতো-‘এই রূপালী গিটার ফেলে, একদিন চলে যাব, দূরে বহুদূরে...।’ কিন্তু এত অসময়ে চলে যাবেন কেউ বিশ্বাসই করতে চাইছেন না। আসলে এটা কি বিশ্বাস করার মতো! 

লেখক: টিভি ব্যক্তিত্ব
 

Ads
Ads