অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি কী?
অগ্রণী ব্যাংক সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ বছর আমাদের সেøাগান হলো, ‘অগ্রযাত্রায় অগ্রণী’। আমরা লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে  অগ্রণী ব্যাংকের জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জও আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা। ঋণের সুদ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনলে অগ্রণী ব্যাংক প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা বঞ্চিত হবে। এরপরও আমরা চ্যালেঞ্জ জয়ে সামনে এগোচ্ছি। আমরা বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছি। গুণগত মানসম্পন্ন বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা ব্যাংকের পরিধি বাড়াতে চাই। এমন ঋণ দিতে চাই না, যে ঋণ বিতরণ করা হলে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হবে। অগ্রণী ব্যাংক এখন গ্রামের শাখাগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমি যতগুলো পদোন্নতি দিয়েছি, সবগুলোই শতভাগ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি কাজ করেনি। বিদেশে পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়েছে। পদোন্নতি, ঋণ বিতরণ, ব্যাংকারদের ট্রান্সপারসহ সব  ক্ষেত্রেই অগ্রণী ব্যাংকে দালালদের দৌরাত্ম্য ছিল। কিন্তু এখণ অগ্রণী ব্যাংকে শতভাগ পরিশুদ্ধতা এসেছে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন, অগ্রণী ব্যাংক অগ্রে থাকবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। 

বিদায়ী বছরের সফলতার সূচকগুলো যদি বলতেন?
২০১৭ সাল ছিল অগ্রণী ব্যাংকের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। বছরটিতে আমরা সত্যিকার অর্থেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছি। এখন লক্ষ্য হলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার। সে লক্ষ্যে আমরা সুদূরপ্রসারী কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। সঠিকভাবে  পরিচালিত হলে অগ্রণী ব্যাংক অনেকদূর এগিয়ে যাবে। বিদায়ী বছর অগ্রণী ব্যাংক ৯৫০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় ৭১ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের নিট সুদ আয় বেড়েছে ৪৮৮ কোটি টাকা বা ৫৯১ শতাংশ। ২০১৬ সালে সুদ থেকে নিট আয় ছিল মাত্র ৮২ কোটি টাকা। অথচ বিদায়ী বছর সুদ আয় ৫৭১ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ব্যাংকের কলেবর বাড়লেও ২০১৭ সালে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। ২০১৬ সাল শেষে লোকসানি শাখা ৭৮টি থাকলেও ২০১৭ সাল শেষে তা ৪৩টিতে নেমে এসেছে। বর্তমানে তা আরো কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে।

২০১৬ সাল শেষে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৬ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১৭ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৯৭০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা কমেছে। খেলাপি ঋণ থেকে বিদায়ী বছর আমরা ৫৭৫ কোটি টাকা নগদ আদায় করেছি। পুনঃতফসিলের ফলে ২০১৭ সালে আরো ১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছে। গত বছর অগ্রণী ব্যাংক অবলোপনকৃত ঋণ থেকেও ৯১ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে। ২০১৭ সালে আমাদের ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ২০ শতাংশের বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে বিদায়ী বছর শেষে অগ্রণী ব্যাংকের এডি রেশিও ৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের কোনো মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি নেই। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র আমরাই এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছি। সবমিলিয়ে অগ্রণী ব্যাংক বিদায়ী বছর সফলতার সঙ্গেই পার করেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জাগিয়ে তোলার জন্য আপনার উপদেশ কী?
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অগ্রণী ব্যাংকের প্রত্যেকটি কর্মীকে আমি নবউদ্দমে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছি। এতে আমাদের কর্মীরা জেগে উঠেছে। জড়তা কাটিয়ে ব্যাংকাররা গ্রাহকদের কাছে সেবা নিয়ে ছুটছে। আমি বলেছি, অগ্রণী ব্যাংকের কর্মীরা নিজেকে সরকারি চাকুরিজীবী বলে মনে করলে হবে না। বরং নিজের বেতনের অর্থ নিজেকেই উপার্জন করতে হবে। গ্রাহকদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান যোগাযোগ করতে হবে।

খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আমি খেলাপি ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলাম। এতে অপেক্ষাকৃত ভালো গ্রাহকদের কাছ থেকে ইতোমধ্যেই টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এখন যে সকল গ্রাহকের কাছে টাকা আটকে আছে, তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় অপেক্ষাকৃত কঠিন। আমরা ব্যাংকের অর্থ আদায়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছি। মামলা না করেই গ্রাহকদের কাছ থেকে এডিআরের ভিত্তিতে অর্থ আদায় করা হচেছ। যে সকল গ্রাহক মারা গেছেন, কিংবা বিপর্যয়ে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তাদের ঋণগুলোকে চিহ্নিত করে, যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ব্যালেন্সশিট পরিচ্ছন্ন করে আমরা সামনে এগোচ্ছি। অবলোপনকৃত ঋণ ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন কি না?
বর্তমানে অর্থনীতি ও রাজনীতি সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ছোট দেশ। এখানে বিভিন্ন ধরনের অনুরোধ আসতেই পারে। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদ ও আমরা যাচাই-বাছাই করে, সবকিছুর যথাযথ মূল্যায়ন করে ঋণ দিচ্ছি। সব ঋণের সুপারিশই খারাপ নয়। এর মধ্যে কিছু ভালো গ্রাহকও থাকতে পারে। আমরা বিষয়টিকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধান করার চেষ্টা করছি। চাপের মুখে আমরা নতি স্বীকারে বিশ্বাসী নই।

অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন শুনতে চাই?
আমরা অতীতে দেখেছি, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের টানাপড়েন সৃষ্টি হতে। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ, বিশেষ করে বর্তমান চেয়ারম্যানের কোনো তুলনা হয় না। তিনি এক্সিলেন্ট একজন মানুষ। বর্তমান চেয়ারম্যানের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই। তিনি একজন একাডেমিশিয়ান। গভর্নর মহোদয়ের ভাষায়, ড. জায়েদ বখ্ত ফাইন্যান্স চেয়ারম্যান। তিনি প্রত্যেকটি মেমো পড়েন, পর্যালোচনা করেন এরপর নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ কারণে সব পরিচালকরা বিনা বাক্যে চেয়ারম্যান মহোদয়ের কথা মেনে নেন। কেউ কোনো দিন নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন, এমন ঘটনা সাম্প্রতিককালে ঘটেনি।

বিদ্যুৎখাতসহ বড় বড় প্রকল্পে অগ্রণী ব্যাংক বিনিয়োগ করছে। এক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা বলুন?
দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই সরকার বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক বিদ্যুৎখাতের উন্নয়নের গৌরবময় অংশীদার। বিদ্যুৎখাতে করা বিনিয়োগ আমাদের ভালো আছে। আমরা বড় বড় আর্থিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করছি। তবে  তার মানে এই নয়, এসএমই খাতে ঋণ দেবো না। বরং এ মুহর্তে অগ্রণী ব্যাংককের মূল ফোকাস হলো এসএমই খাতকে উৎসাহিত করা। এসএমই খাত সমৃদ্ধ হলে দেশ এগিয়ে যাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির জোয়ার আনার জন্য এসএমই খাতের বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এটি ঠিক, এসএমই খাতে বিনিয়োগে ঝুঁকি বেশি। তারপরও আমরা ঝুঁকি নিয়ে দেশের কর্মসংস্থানে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে চাই।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর বেসরকারি ব্যাংকের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এটিকে কীভাবে  মূল্যায়ন করবেন?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর বেসরকারি ব্যাংকের নির্ভরশীলতা বাড়াটি জনগণের সদিচ্ছার বহিপ্রকাশ। জনগণ দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে, তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের মূল জায়গা হলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। সরকারি ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে, সে টাকা নিরপদ থাকবে, মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকে কিছু দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে মানুষ বুঝতে পেরেছে, সরকারি ব্যাংক তাদের আমানত সংরক্ষণের নিরাপদ স্থান। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়ছে। আমরা মুনাফার পেছনে না ছুটে জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করছি। এ কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও অনেক কম। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো মুনাফা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ফলে তাদের এডি রেশিও বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের এডি রেশিও বাড়লে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক ঘটনা। বর্তমানে আমাদের ব্যাংকে বড় ও ভালো গ্রাহকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

ব্যাংককে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আপনার পরিকল্পনা কী?
অগ্রণী ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ‘নাম্বার ওয়ান’ হতে চায়। এটি আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সবার শীর্ষে যেতে হলে আমাদের কঠিন সংগ্রম করতে হবে। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। এ মুহূর্তে আমাদের স্বল্পমেয়াদি টার্গেট হলো, লো কস্ট ডিপোজিট বাড়ানো। সেরা হওয়ার জন্য আমরা কিছু রণকৌশল প্রণয়ন করেছি। আগে সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা গ্রাহকদের কাছে যেত না, বরং গ্রাহকরা ব্যাংকারের কাছে আসতো। কিন্তু যুগ পাল্টেছে। সত্যিকারের ব্যাংকিং সেবা আমরা গ্রাহকদের হৃদয় জয় করতে চাই। অগ্রণী ব্যাংকের প্রত্যেকটি কর্মী গ্রাহকদের সেবক হিসেবে স্বীকৃত পাক, কর্মীদের কাছে এটিই আমার প্রত্যাশা। অগ্রণী ব্যাংকের মালিক রাষ্ট্রের ১৬ কোটি জনগণ। তাই জনগণের প্রত্যাশার পুর্ণতা দেখতে চাই। অগ্রণী ব্যাংক অগ্রগামী হোক। এটিই স্বপ্ন।

" /> ভোরের পাতা

‘অগ্রণী ব্যাংক অগ্রগামী হোক, এটিই স্বপ্ন’

  • ৬-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

২০১৬ সালের আগস্ট থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট ব্যাংকার মোহাম্মদ সামস্-উল ইসলাম। ইতিপূর্বে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি পদে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। একটি ভঙ্গুর আর্থিক পরিস্থিতি থেকে অগ্রণী ব্যাংককে টেনে তোলার জন্য মোহাম্মদ সামস্-উল ইসলাম নিরলসভাবে  কাজ করছেন। আন্তরিকতা, সততা, নিষ্ঠা ও কর্মস্পৃহার মাধ্যমে গত দুই বছরে অগ্রণী ব্যাংককে বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে শক্তিশালী আর্থিক ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। এখন এগিয়ে নিচ্ছেন অগ্রযাত্রার পথে। ব্যাংকারদের মাঝে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে তিনি বর্তমানে নিজ কর্মস্থল অগ্রণী ব্যাংক ও পূর্বের আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকসহ মোট তিনটি পৃথক স্থানে জাতির জনকের মুরালসহ ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপন করে এক অনন্য কীর্তি গড়েছেন। তাঁর এই আইডিয়া থেকে সম্প্রতি দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে গত ২৬ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সহকারী পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বিশ্বাস স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। অথচ একদিন জাতির জনকের প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও ভালোবাসা থেকে তিনিই সর্বপ্রথম উদ্যোগটি গ্রহণ করেছিলেন। সফল এ ব্যাংকার অগ্রণী ব্যাংকের সামগ্রিক পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। 
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবেগ রহমান

 

একটি বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে আপনি অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব নিয়েছেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ব্যাংকের পরিবেশ পাল্টে দিয়েছেন। এটি কীভাবে সম্ভব হলো? 
আমি যখন অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে  দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন ১০০-১৫০ কোটি টাকা মুনাফা করা এ ব্যাংকের জন্য স্বপ্ন ছিল। আমি দেখলাম অগ্রণী ব্যাংক একটি ভঙ্গুর আর্থিক পরিস্থিতিতে নিপাতিত। পাকিস্তান আমলের হাবিব  ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংক লিমিটেডকে একীভূত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অগ্রণী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ ব্যাংকটি অন্য ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে থাকবে  এমন বিশ্বাস থেকেই বঙ্গবন্ধু অগ্রণী ব্যাংকের নামকরণ করেছিলেন। সে অগ্রে থাকার ব্যাংকটিই একেবারে ধ্বংসের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছিল। ওই রকম একটি পরিস্থিতিতে জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব দেন। যে কোনো মূল্যে ব্যাংকটিকে দাঁড় করাতে হবে, এমন একটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমি অগ্রণী ব্যাংকের এমডির চেয়ারে বসেছিলাম। 

২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট আমি অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব নেই। সে হিসেবে ওই বছরের মধ্যেই ব্যাংকটিকে দাঁড় করানোর জন্য খুব বেশি সময় ছিল না। এ জন্য এমডির চেয়ারে বসেই আমি ১০০ দিনের একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলাম। পরিকল্পনাটি আমি পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করলে, পর্ষদ অনুমোদন দেয়। এরপরই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমার বক্তব্য ছিল, ১০০ দিনে আমরা সব  কাজ করে ফেলতে পারব না। কোন কোন প্রদক্ষেপ গ্রহণ করলে ব্যাংক বিপর্যস্ত পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াবে সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করি। অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অগ্রণী ব্যাংক ১০০ দিনের মধ্যে অনেকাংশেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ঋণ আদায়ের প্রতি জোর দেওয়ার কারণে আমরা একশ-দেড়শ কোটি টাকা মুনাফা করার স্বপ্ন দেখলেও তা ৫৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। এটি ছিল অগ্রণী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাথমিক ধাপ। তবে  এতেও আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। কারণ আরো ভালো কিছু করার প্রবল সম্ভাবনা অগ্রণী ব্যাংকের ছিল। বিদায়ী বছর আমরা প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার মতো পরিচালন মুনাফা করেছি। এর মধ্যে নিট মুনাফাই ছিল ৬৭৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে আমরা প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা নগদ আদায় করতে পেরেছি। ফলে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৫-১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আমাদের ৭৮টি লোকসানি শাখা ছিল। কিন্তু বিদায়ী বছর শেষে তা ২৩টিতে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রণী ব্যাংকের সেবা নিচ্ছে। সিটি গ্রুপ, বিএসআরএম, বসুন্ধরা, পিএইচপি, নোমান গ্রুপ, নিটোল, কেডিএস, যমুনা, প্রাইম গ্রুপ, এসিআইয়ের মতো বড় বড় করপোরেটগুলো অগ্রণী ব্যাংকের গ্রাহক হয়েছে। এর ফলে আমাদের বিনিয়োগ ও ঋণ যেমন বেড়েছে তেমনিভাবে ব্যাংকের ব্যালেন্সশিটও সমৃদ্ধ হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য বেড়েছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানোর জন্য আমরা নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়েছি। বাংলাদেশে কেউ চিন্তাও করেনি ব্রুনাই থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের অর্থ আসবে। সম্প্রতি আমরা ব্রুনাইয়ে বসবাসরত বাংলাদেশিদের উপার্জিত অর্থ তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছি। আমি ও ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখ্ত ব্রুনাই গিয়েছিলাম। তখন আমাদের হাতে ঈদুল ফিতরের আগের দেড় মাস সময় ছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিলো, যে কোনো মূল্যে ঈদুল ফিতরের মধ্যে ব্রুনাই থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ দেশে নিয়ে আসা। সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে আমরা সফল হয়েছি। ব্রুনাইতে আমরা রেমিট্যান্স হাউজগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছি। ঈদের বন্ধের আগের দিন দুজন গ্রাহকের রেমিট্যান্স দেশে আনার মাধ্যমে ব্রুনাই থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ আসার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এখন দেশের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে  ব্রুনাই থেকে অগ্রণী ব্যাংক রেমিট্যান্স নিয়ে আসছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণে ‘নাম্বার ওয়ান’।
আমাদের ৯৪৪টি শাখার মধ্যে সবকটি আমার এমডি মেয়াদে অটোমেশনের আওতায় এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র অগ্রণী ব্যাংকই পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। অগ্রণী ব্যাংকের বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ভালো। আমাদের মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি এসেছে। ভবিষ্যতেও এর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

আগে আমরা শাখা ব্যবস্থাপকদের নিয়ে আঞ্চলিক সম্মেলন করতাম। কিন্তু এখন আমরা সম্মেলন না করে গ্রাহক ও ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান কন্টাক্ট’ করছি। ইতোমধ্যেই এ উদ্যোগের সুফল আসতে শুরু করেছে। গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যাংকের প্রত্যেক কর্মকর্তাকে আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ ও আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে সব ব্যাংকার একযোগে অগ্রণী ব্যাংককে এগিয়ে নেওয়ার কাজে সমানভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন।

আগে গ্রামের শাখাগুলো আমানত সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাত। আমি বলে দিয়েছি, গ্রামের শাখার আমানত গ্রামেই বিতরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে অগ্রণী ব্যাংক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। গ্রামের মানুষ ঋণ নেওয়ার জন্য অগ্রণী ব্যাংকে আসছে।

বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্য থেকে বড় ধরনের সফলতার মূল রহস্য কী?
আমি অগ্রণী ব্যাংকেরই প্রোডাক্ট। এ ব্যাংকে যোগদানের মাধ্যমেই আমার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। ফলে অগ্রণী ব্যাংকের সবকিছু আমার নখদর্পণে। ডিএমডি থেকে পদোন্নতি পেয়ে আমি ১ বছর ১০ মাস আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের এমডি ছিলাম। এরপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী মহোদয় অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব দেওয়ার পর, আমার মনে হলো, নিজের ঘরে আমি ফিরে এসেছি। অগ্রণী ব্যাংককে আমি নিজের সন্তানের মতো দেখি। এ ব্যাংকই আমাকে ব্যাংকার বানিয়েছে। এজন্য অগ্রণী ব্যাংককে সবসময় আমি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করি। এ ব্যাংকে আমি শুধু চাকরি করি না বরং ব্যাংকটিকে ভালোও বাসি। এটি সফলতার একটি কারণ হতে পারে।

আমি সবসময়ই মনেপ্রাণে চাই, অগ্রণী ব্যাংক অগ্রণীর পথে এগিয়ে যাক। আমার মেয়াদে ব্যাংকটিকে একটি উন্নত কাঠামোতে নিয়ে যেতে চাই। যাতে ভবিষ্যতে বলতে পারি, দায়িত্ব পালনকালে আমি অগ্রণী ব্যাংকে এ কাজটি সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছি। গত ৩৫ বছর ধরে অগ্রণী ব্যাংকের এডি লাইসেন্স বাড়ানোর চিন্তা কেউ করেনি। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি এডি লাইসেন্স বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন তিনটি এডি শাখা অগ্রণী ব্যাংকে যুক্ত হচ্ছে। আমি শুধু ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতেই চাই না; বরং অগ্রণী ব্যাংক সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি ‘ইমেজ’ বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র অগ্রণী ব্যাংক ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ সেবা চালু করেছে। আমরা পাওয়ার সেক্টরে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছি। নোমান গ্রুপ অগ্রণী ব্যাংকের চেয়েও বেশি রফতানি করে। বসুন্ধরা, সিটি গ্রুপের মতো বড় বড় করপোরেটগুলোকে অগ্রণী ব্যাংকে নিয়ে আসা বড় ধরনের সফলতা। পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার প্রতিফলন হিসেবেই বড় করপোরেটগুলো অগ্রণী ব্যাংকের গ্রাহক হয়েছে।

বর্তমানে নিজ কর্মস্থল অগ্রণী ব্যাংক ও পূর্বের আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকসহ পৃথক তিনটি স্থানে আপনি জাতির জনকের মুরালসহ ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপন করেছেন।  এটি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভব  করলেন?
সাত বছর আমি দেশের বাইরে ব্যাংকিং করেছি। ক্যারিয়ারের ১৬ বছর চট্টগ্রামে কাটিয়েছি। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি আমি জিএম পদোন্নতি পেয়ে প্রধান কার্যালয়ে আসি। সে সময় আমাকে হেড অব  আইডি করা হয়।

একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। জিএম পদটি দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে একটি সম্মানজনক পদ হিসেবেই স্বীকৃত। সিলেট যাওয়ার পর আমার মনে হলো, দেশ স্বাধীন না হলে আমি জিএম হতে পারতাম না। হয়তো হাবিব ব্যাংকের এসপিও পর্যন্ত যেতে পারতাম। যার জন্য দেশটি স্বাধীন হলো, আমি জিএম হতে পারলাম, সেই বঙ্গবন্ধুর সম্মানে কিছু করার ইচ্ছে হলো। সিলেট অঞ্চলে অগ্রণী ব্যাংকের তিনটি জোনাল অফিস আছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারের অফিসটি বেশ বড়সড়। তখন আমি বললাম, কার্যালয়টির ফাঁকা জায়গায় ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ করার প্রস্তাব  দিলাম। একটি বুক সেলফ কিনে দিলাম এবং কর্মকর্তাদের বললাম, বঙ্গবন্ধুর ওপর যত বই লেখা হয়েছে, সবগুলো সংগ্রহ করে সেলফে জমা করতে। পরে নিজ উদ্যোগে ২০১০ সালে বেশকিছু বই কিনে সেলফ সাজিয়েছি। এভাবেই অগ্রণী ব্যাংকের মৌলভীবাজার কার্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এমডি হয়ে যখন আনসার-ভিডিপি ব্যাংকে গেলাম, তখন মনে হলো ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় বিস্তৃত পরিসরে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপন করা সম্ভব। এর মধ্যেই মাথায় আসল, বঙ্গবন্ধুর একটি মুরাল স্থাপনের। আনসার-ভিডিপি ব্যাংকে যোগদানের সময় সেটির অবস্থাও খুবই নাজুক ছিল। আর্থিকভাবে ভঙ্গুর ব্যাংকটির উদ্যোগে বিস্তৃত পরিসরে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপন করা সহজ ছিল না। আনসার-ভিডিপি নামে যে একটি ব্যাংক আছে, মানুষ সেটিও জানত না। কিন্তু ব্যাংকটির এমডি পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর সর্বোচ্চ আন্তরিকতার মাধ্যমে কাজ করেছি। এর ফলে আনসার-ভিডিপি ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে সফলভাবে বঙ্গবন্ধুর মুরালসহ একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি স্থাপন করা সম্ভব হলো।

অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি স্বপ্ন পুরণের উদ্যোগ নেই। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডির কার্যালয়ের মাঝের স্থানে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিনন্দন মুরাল স্থাপন করি। সম্পুন্ন ব্রোঞ্জের তৈরি ১১০ কেজি ওজনের মুরালটি অগ্রণী ব্যাংকের অবয়বে পরিবর্তন এনেছে। মুরালের পাশেই বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা সব বই ও অডিও-ভিডিও ক্যাসেট সংগ্রহ করে লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হলে, আমি প্রধানমন্ত্রীর হাতে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নারে’র দুটি ছবি দিয়েছিলাম। তিনি আনন্দচিত্রে ছবি দুটি গ্রহণ করেছিলেন। এ ধারাবাহিকতায় সারাদেশে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপনের নির্দেশ এসেছে। এর মাধ্যমে আমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়েছে। আমি হৃদয়ে যে আনন্দ পেয়েছি, তা কোনো শব্দ দিয়ে, কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব  হবে না।

অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি কী?
অগ্রণী ব্যাংক সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ বছর আমাদের সেøাগান হলো, ‘অগ্রযাত্রায় অগ্রণী’। আমরা লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে  অগ্রণী ব্যাংকের জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জও আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা। ঋণের সুদ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনলে অগ্রণী ব্যাংক প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা বঞ্চিত হবে। এরপরও আমরা চ্যালেঞ্জ জয়ে সামনে এগোচ্ছি। আমরা বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছি। গুণগত মানসম্পন্ন বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা ব্যাংকের পরিধি বাড়াতে চাই। এমন ঋণ দিতে চাই না, যে ঋণ বিতরণ করা হলে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হবে। অগ্রণী ব্যাংক এখন গ্রামের শাখাগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমি যতগুলো পদোন্নতি দিয়েছি, সবগুলোই শতভাগ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি কাজ করেনি। বিদেশে পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়েছে। পদোন্নতি, ঋণ বিতরণ, ব্যাংকারদের ট্রান্সপারসহ সব  ক্ষেত্রেই অগ্রণী ব্যাংকে দালালদের দৌরাত্ম্য ছিল। কিন্তু এখণ অগ্রণী ব্যাংকে শতভাগ পরিশুদ্ধতা এসেছে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন, অগ্রণী ব্যাংক অগ্রে থাকবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। 

বিদায়ী বছরের সফলতার সূচকগুলো যদি বলতেন?
২০১৭ সাল ছিল অগ্রণী ব্যাংকের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। বছরটিতে আমরা সত্যিকার অর্থেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছি। এখন লক্ষ্য হলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার। সে লক্ষ্যে আমরা সুদূরপ্রসারী কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। সঠিকভাবে  পরিচালিত হলে অগ্রণী ব্যাংক অনেকদূর এগিয়ে যাবে। বিদায়ী বছর অগ্রণী ব্যাংক ৯৫০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় ৭১ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের নিট সুদ আয় বেড়েছে ৪৮৮ কোটি টাকা বা ৫৯১ শতাংশ। ২০১৬ সালে সুদ থেকে নিট আয় ছিল মাত্র ৮২ কোটি টাকা। অথচ বিদায়ী বছর সুদ আয় ৫৭১ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ব্যাংকের কলেবর বাড়লেও ২০১৭ সালে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। ২০১৬ সাল শেষে লোকসানি শাখা ৭৮টি থাকলেও ২০১৭ সাল শেষে তা ৪৩টিতে নেমে এসেছে। বর্তমানে তা আরো কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে।

২০১৬ সাল শেষে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৬ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১৭ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৯৭০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা কমেছে। খেলাপি ঋণ থেকে বিদায়ী বছর আমরা ৫৭৫ কোটি টাকা নগদ আদায় করেছি। পুনঃতফসিলের ফলে ২০১৭ সালে আরো ১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছে। গত বছর অগ্রণী ব্যাংক অবলোপনকৃত ঋণ থেকেও ৯১ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে। ২০১৭ সালে আমাদের ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ২০ শতাংশের বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে বিদায়ী বছর শেষে অগ্রণী ব্যাংকের এডি রেশিও ৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের কোনো মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি নেই। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র আমরাই এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছি। সবমিলিয়ে অগ্রণী ব্যাংক বিদায়ী বছর সফলতার সঙ্গেই পার করেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জাগিয়ে তোলার জন্য আপনার উপদেশ কী?
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অগ্রণী ব্যাংকের প্রত্যেকটি কর্মীকে আমি নবউদ্দমে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছি। এতে আমাদের কর্মীরা জেগে উঠেছে। জড়তা কাটিয়ে ব্যাংকাররা গ্রাহকদের কাছে সেবা নিয়ে ছুটছে। আমি বলেছি, অগ্রণী ব্যাংকের কর্মীরা নিজেকে সরকারি চাকুরিজীবী বলে মনে করলে হবে না। বরং নিজের বেতনের অর্থ নিজেকেই উপার্জন করতে হবে। গ্রাহকদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান যোগাযোগ করতে হবে।

খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আমি খেলাপি ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলাম। এতে অপেক্ষাকৃত ভালো গ্রাহকদের কাছ থেকে ইতোমধ্যেই টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এখন যে সকল গ্রাহকের কাছে টাকা আটকে আছে, তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় অপেক্ষাকৃত কঠিন। আমরা ব্যাংকের অর্থ আদায়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছি। মামলা না করেই গ্রাহকদের কাছ থেকে এডিআরের ভিত্তিতে অর্থ আদায় করা হচেছ। যে সকল গ্রাহক মারা গেছেন, কিংবা বিপর্যয়ে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তাদের ঋণগুলোকে চিহ্নিত করে, যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ব্যালেন্সশিট পরিচ্ছন্ন করে আমরা সামনে এগোচ্ছি। অবলোপনকৃত ঋণ ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন কি না?
বর্তমানে অর্থনীতি ও রাজনীতি সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ছোট দেশ। এখানে বিভিন্ন ধরনের অনুরোধ আসতেই পারে। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদ ও আমরা যাচাই-বাছাই করে, সবকিছুর যথাযথ মূল্যায়ন করে ঋণ দিচ্ছি। সব ঋণের সুপারিশই খারাপ নয়। এর মধ্যে কিছু ভালো গ্রাহকও থাকতে পারে। আমরা বিষয়টিকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধান করার চেষ্টা করছি। চাপের মুখে আমরা নতি স্বীকারে বিশ্বাসী নই।

অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন শুনতে চাই?
আমরা অতীতে দেখেছি, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের টানাপড়েন সৃষ্টি হতে। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ, বিশেষ করে বর্তমান চেয়ারম্যানের কোনো তুলনা হয় না। তিনি এক্সিলেন্ট একজন মানুষ। বর্তমান চেয়ারম্যানের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই। তিনি একজন একাডেমিশিয়ান। গভর্নর মহোদয়ের ভাষায়, ড. জায়েদ বখ্ত ফাইন্যান্স চেয়ারম্যান। তিনি প্রত্যেকটি মেমো পড়েন, পর্যালোচনা করেন এরপর নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ কারণে সব পরিচালকরা বিনা বাক্যে চেয়ারম্যান মহোদয়ের কথা মেনে নেন। কেউ কোনো দিন নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন, এমন ঘটনা সাম্প্রতিককালে ঘটেনি।

বিদ্যুৎখাতসহ বড় বড় প্রকল্পে অগ্রণী ব্যাংক বিনিয়োগ করছে। এক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা বলুন?
দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই সরকার বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক বিদ্যুৎখাতের উন্নয়নের গৌরবময় অংশীদার। বিদ্যুৎখাতে করা বিনিয়োগ আমাদের ভালো আছে। আমরা বড় বড় আর্থিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করছি। তবে  তার মানে এই নয়, এসএমই খাতে ঋণ দেবো না। বরং এ মুহর্তে অগ্রণী ব্যাংককের মূল ফোকাস হলো এসএমই খাতকে উৎসাহিত করা। এসএমই খাত সমৃদ্ধ হলে দেশ এগিয়ে যাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির জোয়ার আনার জন্য এসএমই খাতের বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এটি ঠিক, এসএমই খাতে বিনিয়োগে ঝুঁকি বেশি। তারপরও আমরা ঝুঁকি নিয়ে দেশের কর্মসংস্থানে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে চাই।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর বেসরকারি ব্যাংকের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এটিকে কীভাবে  মূল্যায়ন করবেন?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর বেসরকারি ব্যাংকের নির্ভরশীলতা বাড়াটি জনগণের সদিচ্ছার বহিপ্রকাশ। জনগণ দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে, তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের মূল জায়গা হলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। সরকারি ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে, সে টাকা নিরপদ থাকবে, মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকে কিছু দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে মানুষ বুঝতে পেরেছে, সরকারি ব্যাংক তাদের আমানত সংরক্ষণের নিরাপদ স্থান। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়ছে। আমরা মুনাফার পেছনে না ছুটে জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করছি। এ কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও অনেক কম। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো মুনাফা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ফলে তাদের এডি রেশিও বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের এডি রেশিও বাড়লে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক ঘটনা। বর্তমানে আমাদের ব্যাংকে বড় ও ভালো গ্রাহকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

ব্যাংককে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আপনার পরিকল্পনা কী?
অগ্রণী ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ‘নাম্বার ওয়ান’ হতে চায়। এটি আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সবার শীর্ষে যেতে হলে আমাদের কঠিন সংগ্রম করতে হবে। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। এ মুহূর্তে আমাদের স্বল্পমেয়াদি টার্গেট হলো, লো কস্ট ডিপোজিট বাড়ানো। সেরা হওয়ার জন্য আমরা কিছু রণকৌশল প্রণয়ন করেছি। আগে সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা গ্রাহকদের কাছে যেত না, বরং গ্রাহকরা ব্যাংকারের কাছে আসতো। কিন্তু যুগ পাল্টেছে। সত্যিকারের ব্যাংকিং সেবা আমরা গ্রাহকদের হৃদয় জয় করতে চাই। অগ্রণী ব্যাংকের প্রত্যেকটি কর্মী গ্রাহকদের সেবক হিসেবে স্বীকৃত পাক, কর্মীদের কাছে এটিই আমার প্রত্যাশা। অগ্রণী ব্যাংকের মালিক রাষ্ট্রের ১৬ কোটি জনগণ। তাই জনগণের প্রত্যাশার পুর্ণতা দেখতে চাই। অগ্রণী ব্যাংক অগ্রগামী হোক। এটিই স্বপ্ন।

Ads
Ads