১০ বছরে সরকার পতনের যে ৬ ষড়যন্ত্র হয়েছে

  • ৪-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ভোরের পাতা ডেস্ক

একটি গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের পতন হয় দুটি পদ্ধতিতে। সরল পদ্ধতিটি হলো নির্বাচন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে কোনো সরকারকে হটিয়ে দেওয়া। যেমনটি ঘটেছে সম্প্রতি মালয়েশিয়ায়। নাজীব রাজাকের দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে অবসরে যাওয়া মাহাথি মোহাম্মদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। নির্বাচনে জনগণের রায়েই ক্ষমতাচ্যুত হন নাজিব রাজাক। সরকার পতনের আরেকটি পদ্ধতি হলো সংসদে সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব আনা। অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হলে সরকার সরে যাবে। অতিসম্প্রতি ভারতে এমন অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে। তবে কংগ্রেসের এমন প্রস্তাব লোকসভায় এমপিদের ভোটে নাকচ হয়ে যায়। এর আগে নেপাল, শ্রীলঙ্কাতে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হওয়ায় নির্বাচিত সরকারকে সরে যেতে হয়েছিল।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বাইরে সরকার পতনের একটি পথ হলো জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মুখে কোনো পদ্ধতির বাইরে গিয়েও সরকার পতনের একাধিক নজির আছে বিশ্বজুড়ে। তবে সাধারণত অবৈধ সরকারের ক্ষেত্রেই গণঅভ্যুত্থানে পতনের ঘটনা ঘটে। কোনো পদ্ধতিতেই সমর্থ না হলে এবং জনগণের আস্থাও না থাকলে সরকার পতনের জন্য কোনো রাজনৈতিক দল বেছে নেয় ঘৃণিত এক পদ্ধতি, যার নাম ষড়যন্ত্র।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার অবৈধ নয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। এই সরকারকে হটাতে চায় বিএনপি এবং সুশীল সমাজ নামধারীরা। কিন্তু তাদের জনসমর্থনও নেই। তাই এদের একমাত্র পথ ষড়যন্ত্র। বর্তমান সরকারকে হটাতে ষড়যন্ত্রকারীরা বারবার সরব হয়েছে। এ পর্যন্ত ছয়বার সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টা ছিল সরকার বিরোধীদের।

প্রথমবার সরকার পতনের চেষ্টা করা হয় ২০১৩ সালের ৫ মে। ওই দিনে রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থান নিয়ে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির ঢাকায় লাখো মানুষের সমাবেশে উৎফুল্ল হয়েছিল বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এরা আমাদের মেহমান। বিএনপি নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হলো, এদের আপ্যায়ন কর, এরা ঢাকা ছেড়ে যাবে না। মিষ্টি বিতরণ চলল বিএনপিতে। তারা একরকম নিশ্চিত ছিল সরকারের পতন অনিবার্য। তবে হেফাজতের পিছুটানে আশাহত করে বিএনপিকে। ব্যর্থ হয় ষড়যন্ত্রকারীদের সেবারের প্রচেষ্টা। 

সরকারের পতনের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা হয়েছিল হলি অর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি, ১ ভারতীয় ও ২ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন। রাতভর রেস্তোরাটি জঙ্গিদের হাতে জিম্মি ছিল। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর অপারেশন থান্ডারবোল্ট এর মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে। হলি আর্টিজানের ঘটনায় ষড়যন্ত্রকারীদের আশা ছিল অনেক বিদেশি সেখানে মারা যাবে, বিশ্বজুড়ে সরকারবিরোধী অবস্থান তৈরি হবে, এরই ফলশ্রুতি সরকার পতনে বাধ্য হবে সরকার। এর নীলনকশার বাস্তবায়নে হলি আর্টিজানের ঘটনার পরপরই বিশ্ব মিডিয়ায় প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়। কিন্তু হলি আর্টিজানের পর সরকারের জঙ্গি বিরোধী শক্ত অবস্থানের কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা এক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলা অভিযান চলে, এখনো অভিযান চলছে।

সরকার পতনের তৃতীয় ষড়যন্ত্র হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসার ওপর ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবে তীব্র অসন্তোষ দেখা যায়। রাজধানী জুড়ে চলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ওই আন্দোলনে ভর করে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করেন ষড়যন্ত্রীরা। তবে সরকারের ভ্যাট কয়েক বছর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়ে। মাঠে মারা যায় ষড়যন্ত্রও।

চতুর্থ ষড়যন্ত্রটি ছিল ‘জুডিশিয়াল ক্যু’। বিএনপি, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, যুদ্ধাপরাধী এবং সুশীল সমাজের একাংশ যৌথভাবে এই বিচারিক ক্যু এর নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল। ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত আপিল নিয়েই ষড়যন্ত্র গড়ে ওঠে। এই রায়ের লক্ষ্য ছিল তিনটি। প্রথমত, রায়ের মাধ্যমে বর্তমান সংসদকে অবৈধ ঘোষণার পথ করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল এবং তৃতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্প্রবর্তন। কিন্তু সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ায় এবং জন জাগরণের সৃষ্টি হওয়ায় পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যায়। মূলত: ষড়যন্ত্রের মুখ্য কুশীলব বিচারপতি সিনহা পিছু হটেন। পরে পদত্যাগ করে জুডিশিয়াল ক্যু অধ্যায়ের ইতি ঘটে।

সরকার হটানোর ষড়যন্ত্রের পঞ্চমটি ঘটে এ বছর মার্চে। ওই সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সারাদেশের বিক্ষোভ করে। ষড়যন্ত্রকারীরা কোটা আন্দোলনকে সামনে রেখে মূলত সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। কিছু ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটে, যার মধ্যে আছে ঢাবি উপাচার্যের বাসভবনে হামলা। শিক্ষার্থী নিহতের কথা তুলে কোটা আন্দোলনকে স্ফুলিঙ্গে মতো ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশজুড়ে। কোটা আন্দোলন নিয়েও সরকার, মূলত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর আন্দোলন থেমে যায়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে কোটা আন্দোলনকারীরা বারবার সরব হওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে আগের সেই সমর্থন তারা আর পায়নি। আর কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর ভর করে সরকার পতনের ষড়যন্ত্রও ভেস্তে যায়।

সরকার পতনের  সর্বশেষ ষড়যন্ত্র চলছে এখন। ক্ষমতার লোভ ষড়যন্ত্রকারীরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরও ছাড় দেয়নি। তাদের ওপর ভর করেই এখন চলছে সরকার পতনের প্রচেষ্টা। গত রোববার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহণের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। এরপরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন সোমবার থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে শুরু করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে গত সপ্তাহে মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার রাজধানী কার্যত অচল ছিল। গত বৃহস্পতিবার বোঝা গিয়েছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আর স্বতঃস্ফূর্ত নেই। সেখানে রাজনৈতিক অপশক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কারণ, সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার পরও আন্দোলন চলছিল। আর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশের অডিও ফাঁস হয়েছে। এখনো চলছে এই ষড়যন্ত্র।

রাজনৈতিক সচেতনদের প্রশ্ন এভাবে কি সরকার পতন করা যায়। কোনো সরকারকে হটাতে প্রয়োজন স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন। কিন্তু সেই জনগণই নেই তাদের পাশে। অন্য আন্দোলনের উপর ভর করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির প্রচেষ্টা আর কতদিন অব্যাহত রাখবেন জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীলরা।

Ads
Ads