নভেম্বর থেকে আর কোনো জলদস্যুকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হবে না : বেনজীর আহমেদ

  • ৩১-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

সুন্দরবনে আর আত্মসমর্পণ নয়। নভেম্বর থেকে আর কোনো জলদস্যু বাহিনীকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হবে না। সুন্দরবনে কোনো জলদস্যু থেকে থাকলে তাদের সঙ্গে দেখা হবে সুন্দরবনে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের চরম আতঙ্ক জলদস্যু দমন এবং তাদের পুনর্বাসনে র‌্যাবের সফলতা নিয়ে এক জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতায় সোমবার এসব কথা বলেন র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ।

তিনি বলেন, ৪০০ বছরের সুন্দরবনের যম জলদস্যু দমন হয়েছে। এবার খোঁজা হবে জলদস্যুদের মদদদাতাদের। ২০১২ সালে র‌্যাব মহাপরিচালককে প্রধান করে সুন্দরবনের জলদস্যু দমনের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন হয়েছিল। দীর্ঘ ছয় বছর পর জলদস্যু দমনে এখন কিছু সাফল্য দেখা যাচ্ছে। সাফল্য পেতে এত দেরির কারণ কি জানতে চাইলে বেনজীর আহমেদ বলেন, দেরিতে হলো না দ্রুত হলো এটা বলা ঠিক হবে না। আমি বলতে চাই, র‌্যাব ফোর্সেস দায়িত্ব নিয়ে অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সুন্দরবনকে জলদস্যু মুক্ত করতে পারছে এটাই সবচেয়ে বড় কথা। সময়ের চেয়ে অর্জনকেই মনে হয় বড় করে দেখা উচিত। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ কী কী আছে, সেগুলোর ওপরও দৃষ্টি দেওয়া দরকার। জলদস্যু আত্মসমর্পণের আগে সুন্দরবনে বড় বড় অভিযান ছিল র‌্যাবের। ছিল অনেক নিহত এবং আহতের ঘটনা। তবে হঠাৎ করেই ২০১৬ সালের মে মাসে জলদস্যু আত্মসমর্পণ শুরু হয়।

একে একে ৩২টি বাহিনীর ৩১৭ জনের আত্মসমর্পণ। এর শুরুটা কীভাবে জানতে চাইলে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, সুন্দরবনের জলদস্যু দমনকে র‌্যাব চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। সুন্দরবন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। উপকূলীয় এই অঞ্চলে ২৫ লাখ লোক বসবাস করে। তাদের মধ্যে মৎস্যজীবী, মৌয়ালসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষ রয়েছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সুন্দরবন এলাকার মানুষের নিরাপত্তা তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১৩৫ জন জলদস্যু প্রাণ হারিয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ৫০৭ জন। জলদস্যু দমনের জন্য বঙ্গোপসাগরের অনেক গভীরে মেহের আলীর চরে র‌্যাব ক্যাম্প স্থাপন করেছে। বিশেষ করে অনেকটা চাপে পড়েই জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। প্রথমে কয়েকটি জলদস্যু গ্রুপ একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে র‌্যাবের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে আমরা এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর আমাদের সবুজ সংকেত দেন।

২০১৬ সালের ৩১ মে মাস্টার বাহিনীর ১০ জন সদস্য ৫২টি অস্ত্র, ৩ হাজার ৯০৪ রাউন্ড গুলিসহ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। এরপর গত ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ৩২টি জলদস্যু দল র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রত্যেকটি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া এবং তাদের মামলা সম্পর্কে বেনজীর আহমেদ বলেন, যেহেতু তারা অস্ত্র নিয়ে সারেন্ডার করেছে, তাই অস্ত্র আইনে মামলা নিয়ে তাদের জেলে দিয়েছি। তাদের কিন্তু আমরা ছেড়ে দেইনি। কারণ, ওই সারেন্ডারগুলো আনকন্ডিশনাল ছিল। তবে পরবর্তীতে তাদের মুক্তির জন্য আমরা সাহায্য করেছি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে যারা বেরিয়ে আসে তাদের আমরা সমাজে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি; যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। হত্যা এবং ধর্ষণ মামলা ছাড়া অন্যসব মামলা তুলে নেওয়ার বিষয়ে সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যসব মামলা তুলে নেওয়ার কাজও শিগগিরই শুরু হবে। প্রথমদিকে আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যুদের নিয়ে অন্য গ্রুপগুলোতে সন্দেহ ছিল। তবে পরবর্তীতে তারা দেখেছে যে আত্মসমর্পণকৃতরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছে। এরপরই মূলত বাকি দলগুলো আত্মসমর্পণ করে। সর্বশেষ যে ৬টি বাহিনী ছিল তারাও আগামীকাল ১ নভেম্বর আত্মসমর্পণ করবে।

জলদস্যুদের পুনর্বাসনের জন্য কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, জলদস্যুদের পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে প্রত্যেককে ১ লাখ, এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেককে মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছি। তাদের বর্তমান অবস্থা আমরা মনিটরিং করছি। ঈদ, পূজা-পার্বণে আমরা গিফট পাঠাচ্ছি। দেখা গেছে জলদস্যু হওয়ার আগে তারা যে পেশায় ছিল অনেকে সেই পেশায় ফিরে গেছে। যাদের কোনো দক্ষতা ছিল না তাদের যুব উন্নয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন ট্রেডে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। কিছুদিন আগে তাদের স্ত্রীদের সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছি।

আত্মসমর্পণকারীদের মানসিকতা কিছুদিন পর কি পুনরায় বদলে যেতে পারে? জানতে চাইলে র‌্যাব প্রধান বলেন,  না, আমরা তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। আত্মসমর্পণকৃত প্রত্যেকে যাতে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন কিংবা কোনোরূপ বিরূপ পরিস্থিতির শিকার না হন সেজন্য আমরা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। যারা জলদস্যু ছিল তারা কিন্তু সবসময় ফেরার জীবনযাপন করত। প্রতি পদে ছিল মৃত্যুর ঝুঁকি। স্ত্রী-পুত্র-পরিজনদের কাছ থেকে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর দূরে থাকতে হতো। হরিণের মাংস, বড় মাছ ও গলদা চিংড়ি দিয়ে ভাত খেলেও তারা ছিল ফেরারি। পরিবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য যেতে হতো বহুদূরের কোনো জেলায় তৃতীয় কোনো জায়গায়। আত্মসমর্পণ করেছে এমন এক সাবেক জলদস্যু আমার সঙ্গে কথা বলার সময় অঝোরে তার চোখ দিয়ে পানি ঝরেছে। সে বলেছে, ‘স্যার, আমি ভাবতাম মারা যাওয়ার পর আমার লাশ সাগরের মাছে খাবে। আমার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে না, স্বাভাবিক দাফনও হবে না।’ এ রকম ধারণা ছিল অনেকেরই। তবে এর বাইরেও র‌্যাবের চাপের কারণে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ছিল তারা। এ কারণে গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে আত্মসমর্পণের জন্য।

এবার কয়টি দল আত্মসমর্পণ করছে? নেপথ্য মদদদাতাদের বিষয়ে র‌্যাবের অবস্থান কি হবে জানতে চাইলে বেনজীর আহমেদ বলেন, ১ নভেম্বর বাকি ছয়টি দল আত্মসমর্পণ করবে। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ওই অনুষ্ঠানে যুক্ত হবেন। সুন্দরবনের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল জলদস্যুমুক্ত হচ্ছে এটা সরকারের জন্য বড় অর্জন। আর নেপথ্য মদদদাতাদের বিষয়েও আমরা কাজ করছি। তাদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। কারণ, তারা জলদস্যুদের মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক লাভবান হতো। তারা কখনো চাইত না সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হোক।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Ads
Ads