এবার ‘মাইনাস’ ফর্মূলায় ওবায়দুল কাদের!

  • ১-Sep-২০১৯ ০৫:১৫ অপরাহ্ন
Ads

:: উৎপল দাস ::

ওবায়দুল কাদের, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই নামটিই একটি পরিপূর্ণ বিশেষন। তারপরও ছাত্রলীগের সোনালী দুঃসময়ের উত্তরাধিকারিত্ব বহনকারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা দলের জন্য নানা ত্যাগ স্বীকার করে আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। শারিরীক অসুস্থতার পর ফিরে এসেও তিনি আবারো হাল ধরেছেন। যদিও কয়েকবছর আগে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিজের মুখেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে  বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা যদি যোগ্যতার মূল্যায়ণ করতো, তাহলে আরো ২ টার্ম আগেই তাকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বানাতেন।’ এমন একটি ভিডিও গত সম্মেলনের আগেও ভাইরাল হয়েছিল। ভিডিওটি ওবায়দুল কাদেরের যে ঘনিষ্ঠ মানুষ করে বাইরে প্রচার করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর থেকে নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে। 

বিশেষ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া ক্ষমতাসীন দলের একমাত্র ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগে অযাচিত হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ থাকা ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ কর্মী এবার জাতীয় নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন চেয়েছিলেন এমনকি উপজেলা চেয়ারম্যান পদেও নৌকার মনোনয়ন পাননি। তবে ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী সেই কর্মী ‍যিনি নিজেকে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রক দাবি করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ  একটি কাজ করেছেন। বিদ্রোহীদের আমরণ অনশন ভাঙাতে প্রশংশনীয় ভূমিকা রাখেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত জুবায়দুল হক রাসেল।     

এদিকে, গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত শোক দিবসের আলোচনায়ও অনুপস্থিত ছিলেন ওবায়দুল কাদের। মূলত অনুষ্ঠান মঞ্চে ওবায়দুল কাদেরের জন্য চেয়ার বরাদ্দও রাখা হয়নি। ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে গেলে তাকে নিচের সারিতে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতিদের মতোই বসে থাকতে হতো বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাই সুকৌশলে তিনি গণভবনেই যাননি। গণভবনের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ভোরের পাতার এ প্রতিবেদককে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাতেই ছাত্রলীগের শোক দিবসের আলোচনার মঞ্চে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের জন্য চেয়ার রাখা হয়নি। কারণ ইতিমধ্যেই ছাত্রলীগের বিতর্কিত এবং বিদ্রোহীদের নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের নানামুখী অপতৎপরতার বিষয়টি জেনেছেন শেখ হাসিনা। মূলত বর্তমান ছাত্রলীগের একমাত্র অভিভাবক হিসাবে শেখ হাসিনাই যে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছেন সেটি প্রমাণ করাও হয়েছে গতকালের শোক দিবসের আলোচনা সভায়। এমনকি বর্তমান ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার একজনও ওবায়দুল কাদেরের নাম বা তার অনুপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে একটি কথাও বলেননি। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অন্দর মহলে আলোচনা চলছে এমনই যে, ছাত্রলীগে ওবায়দুল কাদেরের হস্তক্ষেপের দিন ফুরিয়ে এসেছে। ছাত্রলীগের পরিপূর্ণ গঠনতন্ত্রের নাম এখন থেকে শুধুই শেখ হাসিনা। এর বাইরে কারো কোনো ঠাঁই নেই। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা (জাঙ্গাঙ্গীর কবির নাকক, আব্দুর রহমান, বি এম মোজাম্মেল এবং বাহাউদ্দিন নাসিম)ও ছাত্রলীগের বিষয়ে কতটুকু অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন কিনা সেটিও খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কেননা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সন্তানদের রাজনীতির আতুঁড় ঘর হিসাবে বিবেচিত ছাত্রলীগকে কলংকমুক্ত করতে কোনো ব্যাক্তিস্বার্থে যেন বাধাগ্রস্ত না হয়; সেদিক বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে পড়াশোনার ওপর জোর দিয়েই নিজের বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে, ওবায়দুল কাদের শুধু ছাত্রলীগের কারণেই আগামী দিনের রাজনীতির মাঠ থেকে মাইনাস হচ্ছেন এমনটা ভাবার সুযোগ নেই বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবেও তিনি কতটা সফল, কতটা ব্যর্থ তা নিরুপণের এখনই সময়। কেননা আর চলতি বছরই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সম্মেলন হতে পারে। দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামে এমন নির্দেশনা পাবার পর দলের নতুন সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন সেটা নিয়েও চলছে জল্পনা কল্পনা। সেক্ষেত্রে কয়েকজনের সঙ্গে ওবায়দুল কাদের সবার থেকে এগিয়ে থাকলেও তিনি সম্ভব মাইনাস হয়ে যাবেন এমন ধারণাই করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত তারুণ্য নির্ভর রাজনৈতিক দর্শনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের স্লোগানে শারিরীক অসুস্থার কারণে ওবায়দুল কাদের বাতিলের তালিকায় পরে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তরুণ কাউকে সাধারণ সম্পাদক করে চমক সৃষ্টি করতে পারেন আওয়ামী লীগের ঐক্যের প্রতীক শেখ হাসিনা। 

ওবায়দুল কাদের বিরুদ্ধে ছোট খাটো মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও সারা দেশে আওয়ামী লীগকে তেমনভাবে শৃঙ্খলিত করতে না পারা, খাবার টেবিলে খাবার আসতে দেরি হওয়ায় ওই আসনের এমপির গায়ে হাত তোলা, জেলায় জেলায় সম্মেলন করতে না পারার ব্যর্থতার চেয়েও সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন যে বিষয়টিতে ওবায়দুল কাদের তা হলো-আওয়ামী লীগের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের বিশেষ করে হাইব্রিডদের জায়গা করে দেয়ার মতো গুরুতর অপরাধ। ত্যাগীদের মূল্যায়ণ না করে আওয়ামী লীগের উপ কমিটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাগিয়ে দিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। 

ইতিমধ্যেই ক্ষমতাসীন সরকারের উন্নয়নের মহা অভিযাত্রায় মাঝে মধ্যে যে ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই সড়ককে কেন্দ্র করে। সদ্য বিদায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনারও বিদায়ী ভাষণে বলেছেন, সড়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেননি বলেই এখনো সরকারের কিছুটা ইমেজ সংকট হয়েছে। এ থেকে উত্তরণ হলে সরকার আরো ভালো অবস্থানে থাকবে। 

উল্লেখ্য, ওবায়দুল কাদের সেই ব্যাক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে আপন চাচা যিনি একাত্তরে রাজাকার ছিলেন, তাকে হত্যা করে আদর্শিক প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। একটি মাত্র কারণে নিঃসন্তান ওবায়দুল কাদেরের পিতা তার সঙ্গে আমৃত্যু কথা বলেননি। দলের প্রতি ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি আদর্শিক প্রশ্নে ওয়ান ইলেভেনের নির্যাতিত এই নেতা সত্যিকার অর্থেই ছাত্রলীগের দুঃসময়ের সোনালী অর্জনের নাম।

Ads
Ads