আসামে নাগরিক তালিকা : ১৯ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন!

  • ১-Sep-২০১৯ ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
Ads

সতর্ক থাকতে হবে বাংলাদেশকে, ভোরের পাতাকে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা

:: জিএম রফিক ::

ভারতের আসামে গতকাল শনিবার প্রকাশিত চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন। রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া, ঝুঁকিতে পড়া এ মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত রাষ্ট্রবিদ, গবেষক, বিশেষজ্ঞরা। যদিও রাজ্যসরকার বলেছে, ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) তালিকা থেকে বাদপড়া ব্যক্তিরা এখনই বিদেশি বলে গণ্য হবেন না। বরং তাদের সামনে এখনো নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগ আছে। এজন্য আগামী ১২০ দিনের মধ্যে তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে বলা হয়েছে। এই বিষয়ে শুনানির জন্য রাজ্যজুড়ে ১ হাজার ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলা হবে বলেও জানানো হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে হেরে গেলেও সব আশা শেষ হয়ে যাচ্ছে না। কারণ, তারপর হাইকোর্ট এবং সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগ থাকছে। এমন এক অবস্থায় ভোরের পাতাকে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। 

কিন্তু ভারতে বিচারব্যবস্থা এমনিতেই দীর্ঘমেয়াদি। তার ওপর প্রতিটি আদালতেই সাধ্যের অতিরিক্ত মামলার বোঝা রয়েছে। এ অবস্থায় নাগরিকত্ব প্রমাণের সম্ভাব্য দীর্ঘ এবং জটিল আপিল আবেদন প্রক্রিয়া দেশটির আদালতকে আরও ভারাক্রান্ত করতে পারে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইদুল হক সুমন বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অশুভ সংকেত।’

প্রিয়া সাহার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘যে মুহূর্তে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশে গুম ঘটনা টেনে আনা হলো, সেই মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশে এমন ঘটনা আমাদের জন্য কখনোই শুভ হতে পারে না। প্রতিবেশী দেশে কোনো ঘটনা ঘটলে স্বভাবতই প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে।’ নাগরিকপঞ্জি থেকে যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা মূলত অতিদরিদ্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলো এখন ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের এতগুলো সিঁড়ি কীভাবে পাড়ি দেবে সেটাও বিবেচ্য বিষয়। দরিদ্র এ মানুষগুলো আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘোরার এবং মামলা লড়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে পাবে সেটাও বড় প্রশ্ন। তারা যদি সামষ্টিকভাবে লড়ে তো খরচ কমবে।’ 

‘কাশ্মীর যেমন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, ঠিক তেমনি আসামের এই ঘটনাও তাদের অভ্যন্তরীণ’ উল্লেখ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ ভোরের পাতাকে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমাদের সহানুভূতি থাকবে। তবে তাদেরই এই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আসামে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদপড়াদের মধ্যে জড়িয়ে থাকতে পারে দেশভাগের ঘটনা। যা ১৯৪৭ সালেই ঘটে গেছে। এরপর এতদিনে সেখানে অবস্থানকারীদের নিয়ে আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভাতর নিশ্চয় ভেবেচিন্তে এগোবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।’

আসামের লেখিকা সঙ্গীতা বড়ুয়া পিশারতি বলেছেন, ‘যাদের নাম তালিকায় নেই তারা এরই মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত। তার অন্যতম প্রধান কারণ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণ। অনেকেই এটা নিয়ে অভিযোগ করছেন। ফলে তাদের ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে এটা ভেবেই অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।’ যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে যারা বিদেশি বলে ঘোষিত হবেন তাদের নিয়ে কী করবে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এর আগে বেশ জোর দিয়েই ‘অবৈধ মুসলমান অভিবাসী’দের বাংলাদেশে বিতাড়নের কথা বলেছিল। যদিও বাংলাদেশ সরকার চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তার সম্প্রতি ঢাকা সফরে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘এটা একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’

এমন প্রসঙ্গে দি লেপ্রসি মিশন ইন্টারনেশনাল বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মি. জন অর্পন ভোরের পাতাকে বলেন, ‘এতদিন যেহেতু ওখানে এসব মানুষ বসবাস করে আসছেন, হঠাৎ নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া বিষয়টি উদ্বেগজনক।’ মি. জন অর্পন বলেন, ‘তারা কীভাবে এতদিন সেখানে বসবাস করল, সেটা একটি বড় ধরনের প্রশ্ন।’ এ বিষয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংলাপ হওয়া জরুরি। এর রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। 

এনআরসি নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এমতাবস্থায় তাদের যে আইন আছে, তাদের যে সুপ্রিম কোর্ট আছে এবং তাদের যে সিভিল সোসাইটি আছে, তারা বিষয়টি মানবে কি-না আমরা জানি না। তবে এনআরসি নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তা ব্যতীত এখন পর্যন্ত বিষয়টি সম্পূর্ণ ভারতের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের খুব বেশি কথা বলার সুযোগ নেই। তারাই এটার সমাধান করবে। এছাড়া ভারত-বাংলাদেশের বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যত আলোচনা হয়েছে, সেখানে কোথাও এ বিষয়টি নিয়ে কখনো কথা হয়নি। সুতরাং এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের খুব বেশি চিন্তার কিছু আছে বলে মনে হয় না। এ বিষয়টি নিয়ে ভারতবিরোধী জনগণ বাংলাদেশে আছে, তারা যেন কোনোরকম ইস্যু সষ্টি না করতে পারে সেদিকেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’

বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে ভোরের পাতা। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেন। তাদের মন্তব্যগুলোকে বিশ্লেষণ করে আমরা জানতে পেরেছি, নাগরিকপঞ্জিতে বাদপড়াদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে বলে যে আলোচনা তা নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরেও উদ্বেগ রয়েছে। কারণ ইতোমধ্যেই প্রতিবেশী আরেক দেশ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। নতুন আরও শরণার্থীর বোঝা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেই আমাদের বর্তাবে। এখনই যেহেতু ওদেশ থেকে এমন ফিসফিসানি শুরু হয়েছে, সেহেতু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। সে হিসাবেই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জরুরি। 

Ads
Ads