দেশে ফেরায় রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহ, প্রশাসনের সতর্কতা প্রয়োজন

  • ২২-Aug-২০১৯ ১০:০৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

রোহিঙ্গারা তখন দিশেহারা। নদীর স্রোতও বাঁধ মানাতে পারেনি সেদিন। চলে এসেছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশ সরকারও মানবিক কারণে ব্যবস্থা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের। এরপর বহুবার বহু চেষ্টায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চলেছে। দুদেশের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ সফরে তুলে ধরেছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তৈরি করেছেন আন্তর্জাতিক ঐক্য। ফলে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র বিভাগ থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করা হয়েছে। গত বছর নভেম্বরে প্রত্যাবাসনের কথা বলেও পিছিয়ে যাওয়া মিয়ানমার সম্প্রতি ক্যাম্প পরিদর্শনে আসে। সেদেশের পক্ষ থেকে এই সফরে বলা হয়, রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সেখানে তাদের বাসস্থান কেমন হবে তাও এক প্রজেকশনে তারা রোহিঙ্গাদের দেখান। সে সময় রোহিঙ্গারা শর্তসাপেক্ষে নিজ দেশে ফিরে যেতে রাজি হয়। এ সপ্তাহে হঠাৎই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সংবাদ পাই আমরা।

গতকাল ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সীমান্তে নিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল বাস। তাদের নিরাপত্তার জন্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন সক্রিয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের মধ্যে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো আগ্রহ দেখাননি। এই অনাগ্রহের মধ্যে ফুটে ওঠে নানা প্রশ্ন। আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি। বিচলিত হয়ে পড়ি এই ভেবে যে, শেষ পর্যন্ত তারা কি দেশে ফিরে যেতে চাইছেন না, নাকি তাদের দেশে ফিরে না যেতে প্ররোচিত করতে ব্যস্ত রয়েছে কোন মহল? প্রশাসনকে এদিকে খুবই মনোযোগী হতে হবে। 

জানা গেছে, ঈদুল আজহার ছুটিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কয়েকটি এনজিও ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খুবই সক্রিয় ছিল। মানবাধিকার সংস্থার নামে কয়েকটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনও কাজ করছে সেখানে। তারা মানবতার টানে কাজ করছেন বলে জানাচ্ছেন প্রশাসনকে। কিন্তু ভেতরে গিয়ে কী করছেন তা মোটা দাগে বোঝা নিশ্চয় প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু সেটাই এখন জানার বিষয়। রোহিঙ্গারা এদেশে জেঁকে বসে থাকলে কাদের লাভ, কাদের ক্ষতি সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, কোনো ইন্ধন না থাকলে অন্তত একজন রোহিঙ্গাকে আমরা ফিরে যাওয়ার কাতারে পেতাম বলেই আমাদের বিশ্বাস। তাহলে এই ইন্ধন কারা যোগাচ্ছেন? সরকারের সফল অগ্রগতিকে তারা কি নতুন কোনো চক্রান্তের মধ্যে ফেলে কালিমালেপনে ব্যস্ত হচ্ছেন? ভাবনার বিষয়। 

ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা নেতা গজিয়েছে। তাদের এনজিওগুলো বেশ প্রমোটও করছে। গত কয়েক মাসে মাদকব্যবসার সঙ্গে রোহিঙ্গারা জড়িত প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে তথ্য পেয়েছি আমরা। বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে মাদকবহনকারী বেশ কিছু রোহিঙ্গা। গতকাল বৃহস্পতিবারও কক্সবাজারের টেকনাফে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী নিহত এই মাদককারবারি রোহিঙ্গারা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের ৭ নম্বর ক্যাম্পের সৈয়দ হোসেনের ছেলে মো. সাকের ও টেকনাফ মুচনী রোহিঙ্গা শিবিরের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে নুর আলম। গত এপ্রিলেও নারীসহ ৩ রোহিঙ্গা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। শুধু মাদকের সঙ্গেই নয়, রোহিঙ্গাদের নানা সন্ত্রাসী কর্মকা-েও পাওয়া যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সময়ে আমরা জেনেছি।

দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে এভাবে নানাবিধ অপরাধ বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও প্রকট হতে পারে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এই সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে সেটা ঠিক করাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে অনীহা আরও ভাবনার অনুষঙ্গ তৈরি করে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে। 

Ads
Ads