হুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ ও আমাদের বাস্তবতা 

  • ২১-Aug-২০১৯ ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: স্বপন দাস ::

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার ছেলে যে বিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করতেন সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে দেয়া এক বিখ্যাত চিঠিতে লিখেছিলেন, মাননীয় মহাশয়,আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম, তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন- এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি,আমার পুত্রকে অবশ্যই শেখাবেন- –সব মানুষই ন্যায়পরায়ণ নয়, সব মানুষই সত্যনিষ্ঠ নয়, তাকে এও শেখাবেন, প্রত্যেক বদমায়েশের মাঝেও একজন বীর থাকতে পারে, প্রত্যেক স্বার্থপর রাজনীতিকের মাঝেও একজন নি:স্বার্থ নেতা থাকে. এটাই তাকে শেখাবেন।  দীর্ঘ এই– চিঠির এক পর্যায় তিনি এটাও লিখেছেন, “হুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ না করার” কথা। তিনি আরো লিখেছেন. সে যেন সবার  কথা শোনে এবং তা সত্যের পর্দায় ছেকে যেন ভালোটাই শুধু গ্রহণ করে -এর পরও চিঠিতে তিনি  আরো অনেকগুলো লাইন লিখেছেন। তবে সেগুলো আজ লেখার বিষয় নয়। আজ সেই লাইটি নিয়েই এই লেখার অবতারণা আর সেই লইনটি হলো-

“হুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ না করার”। এর কারণ হচ্ছে- বাংলাদেশে যখন বরগুনায় রিফাত হত্যা, বন্যা পরিস্থিতির ঘটনা আলোচিত ঠিক তখনই ছেলে ধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা ঘটনার মতো ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। সম্প্রতি গলাকাটা ও ছেলে ধরার  গুজব শহর থেকে প্রত্যন্ত অ লে সবখানে  মানুষের মুখে মুখে আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়, একই সাথে ডেঙ্গুসহ আরো কিছু গুজব আমাদের সমাজিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এক ধরণের আতংক মানুষকে এক অস্থিরতার মধ্যে নিপতিত করেছে। যার খেশারত দিতে হয়েছে কয়েকটি নিস্প্রান জীবনকে। 

আমরাইবা কোন ধরণের মানুষ, এই গুজব বুঝে না বুঝেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইজবুকে সেয়ার করেছি। যার ফলে এই গুজব আরো ছড়িয়ে পরে এবং ব্যাপকতা লাভ করে। অথচ দেখা গেছে এর কোন বাস্তবতাই নাই। পদ্মাসেতুর প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গুজবের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি মহল সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে যা স¤পূর্ণ ভিত্তিহীন। সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি তুলে ধরে ওই বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয় যে ব্রিজ নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি গুজব। 

আইনশৃংখলা বাহিনী তৎপর হয়ে উঠে এবং গুজব রটনাকারি কয়েক জনকে গ্রেফতার করে। সারা দেশে গুজব প্রতিরোধে সচেতনতা মূলক নানা কর্মসচি দিয়ে এই গুজবের বিষয়ে মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয় প্রশাসন। আজ মানুষ বুঝতে পেরেছে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে এটি নিছকই গুজব। তৎক্ষনে ছেলে ধরা বা গলাকাটা সন্দেহে ঝড়ে গেছে কয়েকটি নিরপরাধ মানুয়ের প্রান। দেখতে হয়েছে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনিতে ঢাকায় নিহত রেনুর শিশু কন্যা তুষার কান্না? এখানেই কি সব শেষ, না। কোন মহল ডেঙ্গু নিয়েও গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর মত করেছে কুট কৌশল। হয়তো সফল হবেনা তারা, কারণ সরকার যথেষ্ঠ সক্রিয় রয়েছে ওদের ব্যাপারে। 

আমারা দেখলাম বরগুনার মত একটা ছোট্ট শহরে রিফাত শরীফকে বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের ভিডিও ভাইরাল। এই আরোচিত হত্যাকান্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে অসংখ্য সংবাদ প্রচার হলো। ফেইজবুক, ইউটিউব, অন-লাইন পত্রিকাগুলো ঢাকায় বসে গায়েবি সংবাদ প্রচার করলো। যার মধ্যে রিফাত শরীফকে নির্মম হত্যা ঘটনার প্রত্যক্ষ অংশ নেয়া খুনিদের ব্যাপারে যতটা না নিউজ হয়েছে তারও বেশী হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের  নিউজ। আমরা দেখলাম গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যে সংবাদ হয়েছে এমপি পূত্রকে জড়িয়ে “ সুনামের যত দুর্নাম” সেই শিরোনামের নিউজ রং তুলি দিয়ে রিফাত হত্যা নিয়েও লেখা হল। এটা কিন্তু অনেক পাঠকই বুঝতে পেরেছে। সময় সাপেক্ষে মানুষ আরো বুঝতে পারবে, সে সময়টা সামনে অপেক্ষা করছে। এক্ষেত্রে যে “হুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ করা হয়নি সেটাও প্রশ্নবোধক চিহৃ হয়ে আছে বরগুনার মানুষের কাছে।

বরগুনার রিফাত হত্যার ঘটনায়  প্রচার ও প্রকাশ হওয়া একেক সংবাদে অপরাধের কারণ নিয়ে রহস্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সাধারণ জনতা। এক সংবাদ এসে আরেক সংবাদকে ভুল প্রমাণ করে। খানিক আগেই অপরাধী বা ঘটনার পিছনে নতুন নুতন নাটকীয়তার সৃস্টি হয়। প্রযুক্তির  কল্যাণে অপরাধ ঘটে যাওয়ার সময়কার ছবি বা ভিডিও এখন সহজেই চলে আসে জনসম্মুখে। কারণ ছবি তো মিথ্যা বলে না। ধারণ করা ছবিকে সত্য মানলেও, এই ছবি বা ভিডিওর পেছনেও কিছু সত্য থাকে। গণমাধ্যম ও ফেসবুকে নানা কাহীনি লিখা হতে থাকে। রিফাত হত্যায় কে- বা কারা জড়িত, এই হত্যায় মিন্নির ভূমিকা কী ছিল? এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে আদালত থেকে। সেহেতু এখনি কারোরই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছা ঠিক নয়। বিশেষ করে মূলধারার গণমাধ্যম গুলো যখন গল্পের ফাঁদে পড়ে, তখন সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ এক ধরণের প্রভাব  অনুভব করে তাৎক্ষণিক কিছু উদ্যোগ নিয়ে ফেলে। এতে সত্য ঘটনা বা অপরাধী অনেক সময় আড়ালে রয়ে যায়। 

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নমিনেশনের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন স¤পাদক মো, জাহাঙ্গীর কবিরকে সম্বল করে একটি চক্র স্থানীয় সাংসদকে কৌশলে অবাি ত ঘেষনা করে, দিতে থাকে নানা অপবাদ। এত কিছু করেও সাংসদের জনসমর্থনের কাছে ব্যর্থ হয়ে চক্রান্তকারিরা তার ছেলেকে জড়িয়ে নানা প্রপাগন্ডা চালাতে থাকে। যদিও এসব কেন্দ্র করে শেষমেশ কোনই ফল হয়নি। কারণ দীর্ঘদিনের রাজনীতির পরীক্ষিত সৈনিক ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভূর উপর ভরসা রাখে জনগণ। তৃণমূলের  মানুষের সাথে মিশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বরগুনাকে এগিয়ে নেয়াসহ বরগুনার সম্প্রীতি বজায় রেখে কর্ম স¤পাদন করেছেন শম্ভু। সব মিলিয়ে শেষে নমিনেশন শম্ভুই পায়। আর বিপুল ভোটে জয়লাভও করেন তিনি। এরপরও তথাকথিত বিরোধী চক্রটি থেমে থাকেনি। সম্প্রতি বরগুনায় রিফাত হত্যা ঘটনায় গণমাধ্যমে নানা সংবাদে নানা ভাবে এমপি পূত্র সুনাম দেবনাথকে জড়িয়ে সংবাদ লিখে বর্তমান সাংসদের ইমেজ ক্ষুন্ন করার প্রায়াস চালায় ওই চক্রটি। বরগুনার সচেতন মহল মনে করে আইনকে তার নিজস্ব নিয়মে চলতে দেয়া উচিত। রিফাত হত্যা মামলার ভবিষ্যত আদালতই নির্ধারণ করবে। আর আমাদের থাকতে হবে সেই অপেক্ষায়। কিন্তু হুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ না করে আমাদের দেখতে হবে সেই বাস্তবতা। 

Ads
Ads