সাতক্ষীরার শীর্ষ চোরাকারবারিরা হাতিয়ে নিল বিজিবির হাতে আটককৃত ২ কোটি টাকার মাছ!

  • ২৭-Jul-২০১৯ ০১:০৫ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

মিথ্যা ঘোষনার মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে নিয়ে আসা আমদানিকৃত চার ট্রাক বিভিন্ন উন্নত প্রজাতির মিঠা পানির মাছ আটক করেছে বিজিবি। প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের এসব মাছ গভীর রাতে জেলার এক শীর্ষ চোরাকারবারীকে নামমাত্র মূল্যে নিলামে ক্রয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাষ্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজসে মাত্র ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় নিলাম দেওয়ায় সরকার কোটি টাকার উপরে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে যশোর ও খুলনার ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা এই নিলামে অংশ নিতে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ওই শীর্ষ চোরাকারবারীর লোকজন। ফলে অর্ধেকেরও কম টাকায় নিলাম পেয়ে যায় আশিক এন্টার প্রাইজের মালিক আল-ফেরদৌস ওরফে আলফা। এ ঘটনায় জেলায় রিতিমত হৈ চৈ পড়েযায়।

খোজ খবর নিয়ে জানা গেছে, ২৪ জুলাই মিথ্যা ঘোষণার দিয়ে এলসির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভোমরা বন্দর থেকে ছেড়ে আসা আমদানিকৃত ৪ ট্রাক মাছ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিজিবি আটক করে। বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে শহরের বিজিবি ক্যাম্পের সামনে থেকে ৩টি কার্গো ট্রাকসহ মোট ৪ ট্রাক ভর্তি দেশীয় মিঠা পানির মাছ ও সামদ্রিক মাছ আটক করা হয়। যার মধ্যে আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের বোয়াল, ফলুই, ট্যাংরা, ভেটকি, বাইন, গোলসা, রিটা মাছ অন্যতম। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এর পর থেকে মিশনে নামেন জেলার এক শীর্ষ চোরাকারবারী। বিজিবি থেকে শুরু করে কাষ্টমস্ কর্মকর্তাদের সাথে শুরু করেন বিভিন্ন দেন দরবার। এক পর্যায়ে চুপিসারে রাত ১২ টার দিকে শহরের কাষ্টমস্ গোডাউনে বিজিবি ক্যাম্প থেকে আটককৃত ৪ ট্রাক মাছের মধ্যে ঢাকা মেট্র-ট ১৩-২৫৬৮ নাম্বারের মা আমেনা নামের কার্গো ট্রাক ভর্তি মাছ নিলামের জন্য নিয়ে আসা হয়। এসময় বাকি ৩ট্রাক মাছ বিজিবি ক্যাম্পেই রাখা ছিলো। গোডাউনে মাছের কার্গো ট্রাকটি আনার পর মূহুর্তের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হন জেলার পুলিশের তালিকা ভূক্ত এক শীর্ষ চোরাকারবারীসহ তার লোকজন। পুরো কাষ্টমস্ গোডাউন রাতেই সরগম হয়ে উঠে। রাতের অধারে শুরু হয় নিলাম সিন্ডিকেট। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াই তড়িঘড়ি করে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করেন কাস্টমস্ গোডাউন অফিসার আজিজ রেজা ও সরকারী নিলামকারী মো: জাহিদুল ইসলাম।

নিলামে অংশ নেয় আশিক এন্টারপ্রাইজ, মুকুল স্টোর, অজয় ট্রেডার্স, মিন্টু এন্টার প্রাইজ, জাহিদ এন্টারপ্রাইজ, সাহেবা এন্টারপ্রাইজ, সৈয়দ সাকলাইন এন্টারপ্রাইজ, সৌরভ এন্টারপ্রাইজসহ মোট ৮টি প্রতিষ্ঠান। এরা সবাই আশিক এন্টারপ্রাইজের নিজস্ব লোকজন। সিন্ডিকেটের কারনে অনেকে নিলাম প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি। এসময় আলফার নেতৃত্বে সরকারী দলের নেতা উজ্জল, জাকিরসহ ১০/১২ জন মহড়া দিয়ে যশোর ও খুলনা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিলামে অংশ নিতে দেয়নি। ফলে ২ কোটি টাকা মূল্যের ওই মাছ মাত্র ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিলাম ক্রয় করেন জেলা পরিষদের কাউন্সিলর আশিক এন্টারপ্রাইজের আল ফেরদৌস আলফা।

এর পরপরি ব্যাবসায়ী ও আলফার লোকজন নিলামকৃত ওই মাছ পুনরায় তাদের ভিতরে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাম ধরে সিন্ডিকেটের নিকট থেকে আলফা হাতিয়ে নেয়। পরে গোডাউন কাষ্টমস্ কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের মধ্যে বাড়তি ৯ লক্ষ টাকা ভাগবাটোয়া করে নেয়।

এদিকে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ছাড়াই গোডাউন অফিসার আজিজ রেজা, সরকারী নিলামকারী মো: জাহিদুল ইসলাম এই নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করেন। রাতভর চলে নিলাম কার্যক্রম। এসময় উপস্থিত ছিলেন বিজিবির সিজার এনসিও হাবিলদার বাশার। তিনি জানান বেলা সাড়ে ১২টার সময় মিলবাজার এলাকা থেকে ৪ ট্রাক মাছ আটক করা হয়। সিজারকৃত মাছের বাজার মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ ৮ হাজার টাকা। দিনের বেলায় আটককৃত মাছ নিলামের জন্য দিনেই জমাদিতেন গভীর রাতে কাষ্টমস্ গোডাউনে জমা দিলেন কেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি কোন সদউত্তর দিতে পারেননি।

এদিকে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের এসব মাছ মাত্র ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় নিলাম দেখানো হয়। রাতের আধারে গোপন করে নিবার্হী ম্যাজিষ্ট্রেট ছাড়াই কেন এই নিলাম কার্যক্রম জানতে চাইলে এ এব্যাপারে গোডাউন অফিসার আজিজ রেজা, সরকারী নিলামকারী মো: জাহিদুল ইসলাম জানান, মাছ পচনশিল দ্রব্য সে কারনে একটু তড়িঘড়ি করে নিলাম দিতে হয়েছে। ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় আশিক এন্টারপ্রাইজ উক্ত নিলাম ক্রয় করেছেন।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি’র অধিনায়ক লে:কর্ণেল গোলাম মহিউদ্দিন খন্দকার জানান, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে মিঠা পানির মাছ ও সামদ্রিক মাছ আমদানিকরা হয়। এসব মাছ ভোমরা বন্দর থেকে ট্রাক যোগে আনার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে শহরের বিজিবি হেডকোয়াটারের সামনে থেকে আটক করা হয়। তবে ভোমরা বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত এই মাছ মালিকানা হিসাবে কেউ দাবি করেননি। মালিকানা না পাওয়ায় আটককৃত ৪ ট্রাক মাছ কাষ্টমস্ এ হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে ভোমরা কাষ্টমস্রে সহ-কারী রাজস্ব কর্মকর্তা এনামূল হোসেন জানান, ২৪ জুলাই ভারতের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স নাজ ইমপেকসের মাধ্যমে সাতক্ষীরার ভোমরা ইছামতি ফুডস্ দুটি বিল অফ এন্টিতে ৮ ট্রাক ও ১০ ট্রাক মোট ১৮ ট্রাক উন্নত প্রজাতির মিঠা পানির মাছ আমদানি করে। মেসার্স সুন্দরবন ট্রেডিং এজেন্সি এই মাছ ভোমরা কাষ্টমস থেকে ছাড় করান। অবশ্য ভোমরা বন্দর কাষ্টমস্ এর এলসিতে দেখানো হয়েছে সামুদ্রিক কাউয়া,মুলা ও মধুমতি মাছ । সামদ্রিক মাছের চাইতে মিষ্টি পানির পাছের শুল্ক দেড়গুন বেশি। ভোমরা ইছামতি ফুডস্ ও মেসার্স সুন্দরবন ট্রেডিং এজেন্সির মালিক ভোমরা ইউপি চেয়ারম্যান ইসরাইল গাজী। রাজস্ব কর্মকর্তা এনামূল হোসেন আরও জানান, বন্দর থেকে মাছ খালাসের পর বিভিন্ন পরিবহন যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে। তবে শুনেছি বিজিবির হাতে আটক হয়েছে ৪ ট্রাক মাছ।

এদিকে দীর্ঘ দিন ধরে সাতক্ষীরা বন্দর দিয়ে কিছু অসাধু আমদানিকারক বন্দর কর্মকর্তাদের যোগসাজসে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সামদ্রিক মাছের শুল্ক দিয়ে বেশি শুল্কের মিঠা পানির মাছ আমদানি করে আসছিলো। এরই শুত্রধরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিজিবি ওই শুল্ক ফাঁকি দেওয়া ৪ ট্রাক মাছ আটক করে। যার মধ্যে অধিকাংশ শুল্ক ফাঁকি দেওয়া মিঠা পানির মাছ বোয়াল, ফলুই, ট্যাংরা, বাইন, গোলসাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছিলো।

Ads
Ads