গণপিটুনিই সমাধান নয়

  • ২১-Jul-২০১৯ ১০:০৬ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

পদ্মাসেতুকে ঘিরে হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ল, আর তাতেই শুরু হয়ে গেল গণপিটুনি! অথচ শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, গণমাধ্যম গুজবে কান না দিয়ে রটনাকারীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করে আসছে। তারপরও প্রতিদিন এতো এতো গণপিটুনির পর মূল ঘটনা উদঘাটন করে দেখা গেছে, এদের অধিকাংশই মানসিক রোগী। এই তো গত শনিবার বাড্ডায় ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। মেয়েকে ভর্তির জন্য স্কুলে খোঁজ নিতে গেলেন, আর লাশ হয়ে ফিরলেন! একটু ভেবে দেখুন, গণপিটুনিই কি আসল সমাধান? নিশ্চয় না। দেশে আইন আছে, আইনের শাসন আছে, বিচার আছে তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন। 

গুজবের সূত্র ধরে দুই সপ্তাহে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে প্রায় ২৫ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ছয় জন। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে গত শনিবার তিনজন নিহত আর অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে চারজনই নারী। গতকাল নওগাঁর আত্রাই-পতিসর সড়কের সোনাইডাঙ্গায় এ ভিখিরীকে গণধোলাই দেয় স্থানীয়রা। অপরাধ, তার ঘাড়ে বস্তা ছিল। এই জেলায় বস্তার মাছকে ‘কাটা মাথা’ সন্দেহে ছয় জেলেকেও দেওয়া হয়েছে গণপিটুনি। গত ১০ জুলাই থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত সারা  দেশে ছেলেধরা সন্দেহে ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই সন্দেহে আহত হয়েছেন গোটা ত্রিশেক। গণপিটুনি থেকে উদ্ধার অধিকাংশ আহতদেরকে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলেই উল্লেখ করেছেন। সেটা হয়ে থাকলে বিষয়টি কতোটা অমানবিক হয়েছে, যারা গণপিটুনিতে ছিলেন বা এ ধরনের মানসিকতা পোষণ করেন, তাদেরকে ভেবে দেখার জন্য আমরা অনুরোধ করছি।

পুলিশ গণপিটুনিকে ফৌজদারি অপরাধ বলে সতর্ক করে দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। ‘পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’- ফেসবুকে এমন স্ট্যাস্টাস দিয়ে গুজব রটানোর পরপরই এরূপ গুজব ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত করেছেন পদ্মাসেতু প্রকল্প পরিচালক। গুজব রটানোর অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে। তারপরও কেন থামছে না গণপিটুনি? কেনো অবুঝের মতোই গুজবের ওপরে ভাসতে পছন্দ করছেন তারা? 

দিনকে দিন ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ও আহত হওয়া নিয়ে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. সোহেল রানা বলেন, গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল এবং গণপিটুনি দিয়ে মৃত্যু ঘটানো ফৌজদারি অপরাধ। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে এ পর্যন্ত যতগুলো নিহতের ঘটনা ঘটেছে পুলিশ প্রত্যেকটি ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্তে নেমেছে। এসব ঘটনা তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। দেখা গেছে, গণপিটুনির ঘটনায় সারা দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে জড়িতদের কয়েকজনকে ইতোমধ্যে আটক করেছে তারা। সাভারে ছেলেধরা সন্দেহে নারীকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনায় প্রায় আটশ জনকে আসামি করে মামলা করেছে সাভার মডেল থানা।

নারায়ণগঞ্জে গণপিটুনিতে যুবক নিহতের ঘটনায় করা মামলায় ৪০০ আসামির ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই প্রশাসনিক তৎপরতা প্রশংসার দাবি রাখে। রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে তাছলিমা বেগম রেনু নিহতের ঘটনায় শনিবার রাতে অজ্ঞাত ৪০০ থেকে ৫০০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তার বোনের ছেলে নাসির উদ্দিন টিটু। শুধু মামলা দায়ের করেই থেমে থাকলে চলবে না, আসামিদের আইনের আওতায় আনতে দ্রুতগতিসম্পন্ন হতে হবে। 

আগেই এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিলাম, গুজব রটনার পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র রয়েছে। তারা গুজব দিয়ে জনমনে ভীতির সঞ্চার করে রেখেছে। এই ষড়যন্ত্রকারীদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। গুজবকে আমলে নিয়ে বিভ্রান্ত না হতে বলার পরও যারা এই গুজবে কান দিয়ে অমানবিকভাবে মানুষ হত্যায় মেতেছেন, তাদেরও বিচার করতে হবে। 

Ads
Ads