অসহায় বন্যার্তরা : এখন শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি দরকার

  • ১৩-Jul-২০১৯ ১০:০৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আসুন একটি দৃশ্যপট কল্পনা করি। চারদিকে পানি থৈ থৈ। মাচার ওপরে আপনি। সঙ্গে স্ত্রীর কোলে দু-তিন বছরের শিশুসন্তানের বিষণœ মুখ। মজুদ রাখা শুকনো খাবারের অবশিষ্ট দানাটি শেষ হয়েছে একদিন আগেই। ঘরে যখন পানি উঠতে শুরু করেছিল, সেসময় যেটুকু পানি তুলে রাখতে পেরেছিলেন, তাও যায় যায়। গলা শুকিয়ে গেলেও পানির দিকে তাকিয়ে থেকে তৃষ্ণা নিবারণ করছেন। খিদের জ¦ালায় শিশুসন্তানটি কেঁদে উঠলে তার মুখে একটু পানি তুলে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। অথচ আপনার সংসারে চালের অভাব নেই। আলুও মজুদ আছে যথেষ্ট। ওগুলো তুলে রাখা আছে। একটু কষ্ট করে হাত বাড়ালে পাওয়াও যেতে পারে। কিন্তু রান্নার পরিস্থিতি নেই। এমন সময় ত্রাণের চাল এসে পৌঁছালো আপনার হাতে। কেমন হতে পারে মনের অবস্থা? এমন না হলেও কাছাকাছি এক দৃশ্যের নায়িকা লালমনিরহাটের মর্জিনা বেগম। গণমাধ্যমের একজন কর্মী আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের পাসাইটারী ঈদগাহ মাঠ এলাকায় ছবি তুলতে গেলে ইচার আলীর স্ত্রী মর্জিনা বেগমের মানবিক আবেদন ছিল ‘ছবি না তুলি হামাক শুকনা খাবার দেন বাহে। বড়রা না খাইলেও বাচ্চারা তো না খেয়ে থাকতে পারে না।’ মানবিক এই আবেদনের পর বন্যাকবলিত অঞ্চলে খাদ্যত্রাণবিষয়ক কর্মনীতি এই মুহূর্তে কী হওয়া উচিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই আবেদন আপামর জনসাধারণের সঙ্গে ত্রাণসংশ্লিষ্টদেরকেও নিশ্চয় কাঁদিয়েছে! 

লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার ও নীলফামারীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। চার বিভাগে মানবেতর জীবনযাপন করছে লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষ। বন্যা মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত শুক্রবার সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটির সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেছেন, বন্যাদুর্গত জেলাগুলোয় ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, সাড়ে ১৭ হাজার টন চাল এবং ৫০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার পাঠানো হয়েছে। একই দিন ত্রাণ সচিব শাহ কামাল জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত প্রতিটি জেলায় দুই হাজার প্যাকেট করে মোট ৫০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। একটি প্যাকেটে চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, তেল, আটা, মসুরের ডাল, শিশুখাবারসহ একটি পরিবারের ৭ দিনের খাবার রয়েছে।

দুদফায় সাড়ে ১৭ হাজার টন চাল বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে। অথচ সেই শুক্রবারই আদিতমারী উপজেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মফিজুল হককে বলতে শোনা যায়, ‘বন্যার্তদের জন্য ১২ টন জিআর চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। শুক্রবার বিকেলে তা বিতরণ করা হবে। তবে শুকনো খাবারের প্রয়োজন থাকলেও বরাদ্দ না থাকায় দেওয়া হচ্ছে না।’ এদিকে সচিব শাহ কামালের ভাষ্য ‘জেলা প্রশাসক চাহিদা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে চাল দেওয়া হবে।’ আবার চাল প্রসঙ্গ চলে আসায় ফিরে চলুন এই লেখার প্রারম্ভিক সেই দৃশ্যপটে। কী হবে এই চাল দিয়ে? 

এটা ঠিক যে, আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিতদের জন্য ত্রাণের চাল কিছুটা উপকারে আসতে পারে। কারণ, মাচায় যা অসম্ভব, তা আশ্রয়কেন্দ্রে কিছুটা হলেও সম্ভব। কিন্তু ভেবে দেখতে হবে, এত এত পরিবার ওই আশ্রয়কেন্দ্রে রান্না করে খাওয়ার উপযোগী পরিবেশ ও চুলা পাবে কি? অবশ্য একটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিতদের জন্য বরাদ্দের চাল একত্রিত করে যদি আন্তঃপারিবারিক রান্না ও খাবারের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সুবিধাই বৈকি!

‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মেডিকেল টিম গঠন করেছে এবং প্রচুর পরিমাণে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রস্তুত রেখেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরেও কট্রোল রুম খোলা হয়েছে’ বলে যে তথ্য আমরা জানতে পেরেছি তা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু কোনো সংকট সৃষ্টি হওয়ার আগেই পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বন্যাকবলিত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া এখনই জরুরি বলে মনে করি। প্রতিটি প্যাকেটে শিশুখাদ্য না রেখে শুধুমাত্র শিশুখাদ্যের প্যাকেট আলাদাভাবে প্রস্তুত রাখাও প্রয়োজন। আর গুঁড়ো দুধকে রাখা উচিত একেবারেই আলাদা। কারণ, বন্যাতে বেশি সমস্যায় পড়ে শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীরা।

Ads
Ads