স্বপ্নের পদ্মাসেতু: গুজব রুখবে দেশপ্রেমিক জনতা 

  • ১৩-Jul-২০১৯ ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আর কোনো বাধাবিঘ্ন ছাড়াই স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে এটা কারো কারো গায়ে জ¦ালার কারণ বৈকি! তাদের চিন্তা, মন ও মননে এই সেতুর সাফল্য এলার্জির মতো। তাই পরিকল্পনার শুরু থেকেই পর্যায়ক্রমে, কখনো কখনো জোট বেঁধে এর কাজ বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এই মেগা প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর পর প্রধানমমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে পদ্মাসেতু নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালের ১৭ জুন চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তাদের গায়ে এলার্জির জ্বালা আগুন ধরিয়ে দেয়। এই প্রকল্পে সরকারকে বিফল প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগে আছে তারা। তারই অংশ হিসেবে কয়েকদিন আগে সামাজিক গণমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেশবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এর আগে গত বছরের আগস্টেও একই ধরনের গুজব ছড়িয়েছিল রাজবাড়ী জেলায়। কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি তারা। জনতা যখন দেশপ্রেমিক, তখন কোনো অপশক্তিই পারে না গুজব দিয়ে সাফল্যকে ঢেকে দিতে, উন্নয়নকে রুখে দিতে। 
২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শরীয়তপুরের জাজিরা ও মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় মূল সেতু নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের পর এক সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বেআইনিভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি থাকতে না পেরেই ড. মুহম্মদ ইউনূস তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে পদ্মাসেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সরিয়ে নিয়েছিল। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করতে গিয়ে দেশি-বিদেশি অনেক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। সেই ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। তখন থেকে আজ অবধি দেশের উন্নয়নকে রুখে দিতে নানা অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পদ্মাসেতু নিয়ে গুজবের নেপথ্যে ষড়যন্ত্রকারীদের ধরতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। ‘এক লক্ষ শিশুর মাথা কেটে তৈরি হচ্ছে পদ্মাসেতু’ ফেসবুকে এমন গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গতকাল শুক্রবার ভোরে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায় হায়াতুন্নবী নামে এক যুবককে আটক করেছে র‌্যাব।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা মূল সেতুর ২৯৪টি পাইলের মধ্যে ২৯২টি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। ৪২টি পিয়ারের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০টি পিয়ারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৪টি স্প্যান স্থাপন করা হয়েছে, যা এখন দৃশ্যমান। এ অবস্থায় এমন সব গুজব কাজের গতিকে যেন কমিয়ে না দেয়, সেজন্য আরও সচেতন থাকতে হবে প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। কর্মযজ্ঞের হালনাগাদ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে। গবেষকরাও সেতু কর্তৃপক্ষকে সেতুটি নির্মাণে খুঁটিনাটি সকল তথ্য জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে জনগণ আরও সচেতন থাকবে বলে আমরা মনে করি। তথ্য সামনে থাকলে জনগণ বুঝতে পারবে, কোনোকিছুর প্রয়োজন থেকে থাকলে তা হালনাগাদ তথ্যের মধ্যে জানানো হতো। ফলে গুজব রটনাকারীদের কথা তারা বিশ্বাস করবে না, ভয় পাবে না। জনগণের কাছে সঠিকভাবে তথ্য তুলে ধরায় ‘মাথা লাগবে’ বলে যে গুজব উঠেছিল তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনগণও সোচ্চার হতে দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার চাঁদপুরে মনু মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে এবং বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় ‘ছেলেধরা ও গলা কাটা’ সন্দেহে তরিকুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান নামে দুই যুবককে পিটুনি দিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। তারা মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার বাসিন্দা। জনসচেতনতার ফলেই এমন প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। নতুবা আতঙ্কে তারা ঘরমুখো হয়ে গুটিসুটি মেরে থাকতেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী মনে করেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে যেসব গল্প শুনে আসে, কোনো ধরনের যাচাই ছাড়া সেগুলো বিশ্বাস করার প্রবণতার কারণেই এই প্রযুক্তির যুগেও সেসব গল্প সত্যি বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।’ ফোকলোরের এই শিক্ষিকা সরলভাবে সহজ কথা বললেও মনে রাখতে হবে, পদ্মাসেতু নির্মাণকালে বারবার যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তাতে রয়েছে রাজনৈতিক পচামস্তিষ্কের চাল। যদিও পরে তিনি সে কথাকে উড়িয়ে দেননি। 

কুচক্রীরা তাদের দাঁতে জড়িয়ে নিতে চাইছে পদ্মাসেতু। নস্যাৎ করে দিতে চাইছে দেশের উন্নয়ন। গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে ‘একটি চ্যালেঞ্জ’। কিন্তু তারা প্রতিবারই বিফল হয়েছে। যদিও তাদের বিফলতা বা সফলতায় আমাদের কিছু আসে-যায় না। আমাদের সবাইকে সচেতনতার সঙ্গে বিশুদ্ধ প্রগতিশীলতাকে ধারণ করতে হবে, চিহ্নিত করতে জানতে হবে গুজবের রকমফের। তবেই একের পর এক সাফল্যের মধ্য দিয়ে মেগা প্রজেক্ট নিয়ে আমাদের দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে।

Ads
Ads