এতো বছরেও কেন পাহাড় ধস-আতঙ্ক?

  • ১০-Jul-২০১৯ ১১:০৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

২০১৭ সালের ১২ থেকে ১৩ জুন পার্বত্য তিন জেলাসহ ছয় জেলায় পাহাড় ধসে ১৬৮ জন নিহত হন। আর এবছর জুলাইতে এক শিশুসহ দুইজনের মৃত্যু ও ৫ জন আহতের মধ্য দিয়ে প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেন। ধস-আতঙ্কে জনগণও বেশ সচেতন হলেন। অচেতনে থাকা খুলশীর মধুশাহ পাহাড় এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে ত্রিশের অধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করে এক সহকারী কমিশনার পরিসংখ্যান দিলেন, ‘নগরের ১৪ পাহাড়ে ৮৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ’। অবশ্য এর আগে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেছেন বলে জানানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়- ধসের আগে বছরের আর সব দিনে এতসব উদ্যোগ কোথায় থাকে? কোথায় ঘুমায় পাহাড় ধস বন্ধে কমিটিগুলোর দেয়া প্রতিবেদনের সেই সব সুপারিশ? দুই বছর পর আবারও পাহাড় ধস কি তবে আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছে এসব সুপারিশ কাগজেই রয়ে গেছে?

‘সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নের দায় শুধু আমাদের নয়, এটা আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগের বিষয়। সেই সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’ সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং বক্তব্য দিয়েছেন। কোন জটিলতায় থেমে থাকে তবে এতোটা প্রাণের বেদনা? অথচ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে প্রথম থেকেই নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। ২০১৭’র ভয়াবহ প্রাণহানি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কাঁদিয়েছিল। আর কার প্রাণ কাঁদে? তার কঠোর ও সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরপরই পাহাড়-টিলার ধস বন্ধের উপায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মাঝে শুরু হয়েছিল তোড়জোড়, তৎপরতা। এরপর ২০১৭’র ৪ জুলাই চট্টগ্রামে উচ্চ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত একটি সমন্বয় সভায় বিশেষজ্ঞরা ‘অধিকাংশ পাহাড়ের ধস মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ’ বলে বিবৃতি দেন। কিন্তু তারপরে আবারও শীতল ঘরে চলে যায় সব। পর্যবেক্ষণে বাইরে চলে যায়।

পাহাড়ের উপরে চাষ শুরু হয় আলু ও হলুদ। বসতবাড়ি তৈরির জন্য কাটা হয় পাহাড়। গাছগাছালি কাটা বন্ধের সুপারিশ থাকলেও হরদম সেকাজ চলতে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কমিটির দুই প্রতিবেদন এবং তিনটি বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে পাহাড় থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকলেও বন্ধ হয়নি। ফলস¦রূপ ২০১৭ সালের ১৩ জুন পাহাড় ধসের ১২০ নিহত ও দুই শতাধিক আহতের ঘটনার ঠিক এক বছর পর ২০১৮ সালে ১২ জুন একই জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় মৃত্যু হয় ১১ জনের। আর ১৯-এও ঘটলো পুনরাবৃত্তি। 

২০১৭ সালে আগস্টের মাঝামাঝিতে পাহাড় ধস ঠেকাতে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা’ নীতি প্রণয়ন, ছাড়পত্র নিয়ে পরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ করাসহ ১২ দফা সুপারিশ করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে জমা দেয় পরিবেশ অধিদফতর। ওই প্রতিবেদনে, ধস ঠেকাতে পাহাড় ও টিলা সংরক্ষণে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রতিপালনসহ পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ও ভূমিক্ষয় রোধে বনায়ন, পাহাড় সংরক্ষণ টেকসই কৃষির প্রবর্তন, পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ম্যাপিং, জোনিংসহ পাহাড়ি এলাকার বিস্তারিত তথ্যভা-ার গড়ে তোলা, পাহাড় সংরক্ষণ, পাহাড়ি এলাকার ব্যবহার সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, টেকসই পাহাড় ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়। এছাড়া প্রতিবেদনে নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, পাহাড়ের গায়ে থাকা গুল্ম জাতীয় গাছ/জঙ্গল পোড়ানো বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি এলাকায় রাস্তা নির্মাণের সময় পাহাড়ের ঢাল কোনোভাবেই যাতে ৩৫-৪০ ডিগ্রির বেশি না হয় তা লক্ষ্য রাখতে হবে। পাহাড়ের ঢালে সিমেন্ট ব্লক বসাতে হবে বা ঘাসের আচ্ছাদন লাগাতে হবে। পাহাড় কেটে সমান করে এবং পাহাড়ের ঢাল এবং পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ের নিচে রাস্তা ও স্থাপনাগুলোর সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাহাড়ের অবৈধ বসতি স্থাপন নিরুৎসাহিত করতে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ ও বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিন্তু এর কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। ‘পৌরসভার ১৭ হাজার ৭৬৭টি হোল্ডিং (ঘর) রয়েছে।

একটি হোল্ডিংয়ের অধীনে কয়েকটি পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে অনুমোদন রয়েছে ২ হাজার ১৫টির, বাকি ১৫ হাজার ৭৫২টি অবৈধ’ বলে জানিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই এতো এতো ‘অবৈধ’তার কারণ খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রাণহানি দেখতে হতো না বলে আমাদের বিশ্বাস। এদিকে, প্রতিটি প্রতিবেদনে পাহাড়ে ভূতাত্ত্বিক জরিপের প্রয়োজনীয়তার তাগিদ দেওয়া হলেও অধিদফতরের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) সালমা আক্তারের ভাষ্যমতে, এমন প্রস্তাব অন্তত তার জানা নেই। এটা সমন্বয়হীনতা, নাকি নিষ্ঠাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেÑ তার পর্যালোচনার সময় পরে পাওয়া যাবে। আগে প্রয়োজন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া, একই সঙ্গে তার বাস্তবায়ন করা।

Ads
Ads