গ্যাসের দাম কেন বাড়ল, ভেবে দেখা উচিত 

  • ৯-Jul-২০১৯ ১০:২৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বর্তমান জনজীবনে অবিচ্ছেদ্য মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে গ্যাস। মোটাদাগে চিন্তা করলে এই গ্যাস দাম বাড়ানোটা জনমনকে উত্তেজিত করে বেকি! যৌক্তিক কারণ বুঝতে না পারলে দূরদিগন্তের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে পড়ে, সাময়িক ক্ষতিটা জনসাধারণের কাছে হয়ে ওঠে বেদনাদায়ক। আর এমন পরিস্থিতিতে ‘চেতনাব্যবসায়ীরা’ গভীরের বিষয়টিকে লুফে নিয়ে উস্কে দেন জনগণকে। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির বর্তমান পরিস্থিতিটাও এমন এক স্রোতের সাথে পাড়ি দিচ্ছে বলে আমাদের ধারণা। তবে গত সোমবার গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্যম-িত যে কারণ জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তারপর আর কিছু কি বাকি থাকে ?

৭ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের হরতাল কর্মসূচির অংশ হিসাবে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কমায় ভারতে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কমানো হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার এলএনজি, এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করার জন্য সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রেখেছে।’ আসলে কি তাই? সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই দেশের গ্যাসের দামের পরিসংখ্যানও তুলে ধরে বলেছেন, ‘ভারতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গৃহস্থালীতে স্থানভেদে ৩০ থেকে ৩৭ টাকা, শিল্পে ৪০ থেকে ৪২ টাকা, সিএনজি ৪৪ টাকা আর বাণিজ্যিকে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। আর বাংলাদেশে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গৃহস্থালীতে ১২.৬০ টাকা, শিল্পে ১০.৭০ টাকা, সিএনজি ৪৩ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ২৩ টাকা। আামদের দেশে গ্যাসের দাম এখন যে পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে, তারপরও বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে।’

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে গ্যাসের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, বৃদ্ধি বা হ্রাস করা নির্ভর করে এই খনিজ সম্পদের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিভাগগুলোর উপর। ভর্তুকি কমিয়ে কোন খাতে বেশি দিতে হবে তার উপরেও নির্ভর করে দেশের উন্নয়ন। গত রোববার সংসদে জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের এক প্রশ্নে এমনই এক উত্তর দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেছেন, ‘সবসময় যদি সরকারকে ভর্তুকি দিতেই হয়, তাহলে কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। কাজেই সকল দিক বিচার বিবেচনা করে দাম বাড়াতে হয়েছে। এতে করে কিছু কিছু মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরোক্ষভাবে আমরা সবাই লাভবান হব। সার্বিক অর্থনীতির উপরে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ যদিও গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিরোধিতাকারীরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব পণ্যের দাম বাড়বে, কারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, এর প্রভাব পড়বে সাধারণ জনগণের ওপর। উচ্চ দামে আমদানি করা এলপিজিতে ভর্তুকির ভার লাঘবের জন্য সরকার গ্যাসের দাম বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে বলে মনে করেছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে কৃষিমন্ত্রীর যুক্তি প্রনিধানযোগ্য, ‘ছেলেমেয়েরা শিক্ষা গ্রহণ শেষে গ্রামের মাঠে গিয়ে আর কৃষি কাজ করবে না। তাদের জন্য চাকরি দরকার। সেই চাকরির জন্য শিল্প কারখানা করা দরকার। আর শিল্প কারখানার জন্য সব থেকে বড় অন্তরায় ছিল জ্বালানি। আমরা এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করে গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা করছি।’ 

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগে বিদ্যুতের উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এখন তা ১৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। দেশ এখন ৮.১ শতাংশ পর্যন্ত জিডিপি অর্জন করেছে। তবে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো গেলেও বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানির জন্য খরচও বেশি করতে হচ্ছে। ফলে দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে, এটা না বাড়ানো হলে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়ে এনার্জির ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলতে হবে, তাতে উন্নতি হবে না। শিল্পায়ন করতে হলে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হলে, সার উৎপাদন করতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ হতে হলে সরকারকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে। আর প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে আমাদের খরচ হয় ৬১.১২ টাকা, যা দিতে হচ্ছে ৯.৮০ টাকায়। চীন সফর শেষে গত সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ ও পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের বর্ধিত দাম মেনে নিতে হবে’। একই সাথে তিনি অনুযোগের সাথে আরও একটি পথ তুলে ধরেন তার বক্তব্যে, ‘একটা কাজ করি, যে দামে কিনব, সেই দামে বেচব। ৯ টাকার বদলে ৬১ টাকা দরে বেচব।’

এতো চমৎকার স্বচ্ছ যুক্তির পর সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নতির কথা ভাবলে আর কেন হট্টগোল, সমালোচনা, নিন্দা? শুধুমাত্র রাজনীতি না করে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করা উচিৎ।

Ads
Ads