খেলাপি ঋণ কমাতে প্রয়োজন পরিকল্পনা 

  • ৪-Jul-২০১৯ ১১:০৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

ঋণখেলাপিদের তালিকা দিনদিন লম্বা হচ্ছে। একটি অর্থবছর ঘুরে অন্য অর্থবছরে পা রাখতেই বেড়ে যাচ্ছে ঋণের বিপরীতে সুদের হার। থমকে দাঁড়াচ্ছে বিনিয়োগ কাটা। উন্নয়নের কলের চাকায় পড়ছে বাঁধা। বাধার প্রাচীর ভাঙতে তাই ব্যাংকঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে (এক অঙ্ক) নামিয়ে আনার প্রতি জোর দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে এবারের বাজেটে। এমনটা করা গেলে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। তবে কোনপথে হবে তার বাস্তবায়ন, তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা, সংলাপ। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত মার্চ মাস শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পঋণের বিপরীতে উদ্যোক্তাদের বর্তমানে সুদ গুনতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া ঋণ নেওয়ার সময় প্রক্রিয়াকরণ ফিসহ আরও অন্য যেসব ফি নেওয়া হয়, তাতে এ হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। ঋণের ওপর উচ্চ সুদের হারের অনেক কারণও বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয় সঠিকভাবে সমাধান করতে পারলে ব্যাংকঋণের ওপর সুদের হার কমানো সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের পক্ষেই সম্ভব হবে।

সুদের সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে খেলাপি ঋণকেই দায়ী করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের নির্দেশিত তর্জনীর প্রতি একমত রেখে আরও অনেক কিছু কারণও তুলে ধরছেন ব্যাংক ঊর্ধ্বতনরা। কম সুদে আমানত না পেলে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে যাবে বলেও ধারণা করছেন তারা। 

ক্যাপ পদ্ধতির (সরকার কর্তৃক কম-বেশি সুদের হার বেঁধে দেওয়া) বিলুপ্তির ফলে বাধ্যবাধকতা না থাকায় ব্যাংকগুলোর এদিকে নজরও কম বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ দুই বছর আগেও অর্থাৎ ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলো একক সংখ্যায়, অর্থাৎ ৯ শতাংশ হারে ঋণের সুদ গ্রহণ করত, ২০১৮ সালের পর থেকে সেই হার এখন ব্যাংকভেদে ১২ থেকে ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমাদের দেশে ব্যাংকঋণের সুদের হার বেশি হওয়ার কারণ কিন্তু ‘কস্ট অব ফান্ড’ কিংবা ‘ম্যানেজমেন্ট কস্ট’ না। খেলাপি ঋণের কারণেই সুদের হার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ, মোবাইল কলরেটের ওপর সারচার্জ বৃদ্ধি, ব্যক্তিপর্যায়ে করমুক্ত আয়সীমা না বাড়ানোর সমালোচনা করেন। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে আইনি ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। কিছু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ‘যদি এটা আমাদের নিশ্চিত করা যায় যে, আমরা কম সুদে আমানত পাব, সরকারি আমানতগুলো যদি আমাদের কাছে কম সুদে রাখা হয়, যদি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এভাবে কম সুদে আমানত গ্রহণ করে তখন আমরাও ঋণের সুদের হার কমাতে পারব।’ এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে বাজারে অর্থের তারল্য আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

এদিকে নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে ৯ শতাংশের বেশি সুদ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি)। তবে যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক, যে মতই পোষণ করা হোক দেরি না করে প্রয়োজন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।
ব্যাংকিং খাতে সুবাতাস বয়ে যাক, এটাই প্রত্যাশা। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও দায়িত্বশীলতা ও কর্মগতিশীলতা জরুরি। 

Ads
Ads