গ্যাসের দাম বাড়লই: ‘গণশুনানি’ কি শুধুই নাটক?

  • ১-Jul-২০১৯ ১০:৩৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

কোনো জনদাবিই ধোপে টিকল না। জনদাবির বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে শেষপর্যন্ত গ্যাসের দাম বাড়লই। কোনোই কাজে আসলো না ‘গণশুনানি’তে ওঠা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত। ফলে বাসাবাড়িসহ সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ল। এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে আর ওই ‘গণশুনানি’র কী মূল্য থাকে? তবে কি এই ‘গণশুনানি’ সংশ্লিষ্টদের তরফ থেকে কোনো ‘নাটক’ বিশেষ বুঝতে হবে? বছর বছর এভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানো তো জনগণের জন্য যন্ত্রণাকর অভিজ্ঞতা ছাড়া কিছুই না। কেননা, এই ২০১৭ সালেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়। ওই বছরের মার্চ ও জুলাই থেকে দুই ধাপে তা কার্যকর করার কথা থাকলেও মার্চে দাম কার্যকর হয়। আর জুলাই মাসের দাম হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত করা হয়। 

এরই ভিতর গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বর্তমানের চেয়ে গড়ে দাম বাড়ানো হয়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। নতুন বাজেটে বিভিন্ন নিত্যপণ্যে ভ্যাটসহ (মূল্য সংযোজন কর) বাড়তি কর আরোপের পর অর্থবছরের প্রথম দিনই গ্যাসের দাম বাড়াল। আজ থেকেই অবশিষ্ট পণ্যের ওপর ভ্যাট এবং গ্যাসের মূল্য কার্যকর হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে সব শ্রেণির মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে সব নিত্যপণ্যের দাম, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বাসা ভাড়া, কৃষিপণ্য এবং সেবার খরচ বাড়বে। সাধারণ মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নাভিশ্বাস উঠবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের। তাদের মতে, দেশে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে রফতানি ও শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। অর্থনীতিতে বৈষম্য কমানো ও শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জোরালো সুপারিশ করেছেন তারা। এদিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন। সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, জ্বালানি দুর্নীতি না কমিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ানো সুশাসনের পরিপন্থী। এই এক গ্যাসের ওপর বাড়তি চাপ নেওয়া মানে আজ থেকে পাশাপাশি আরও অনেক কিছুর ওপর বাড়তি চাপ নিতে হবে জনগণকে। 

অর্থাৎ বাড়তি চাপ হিসাবে আজ থেকে আবাসিক খাতে দুই চুলার জন্য ৯৭৫ এবং এক চুলার জন্য ৯২৫ টাকা গণতে হবে দেশের সব শ্রেণির মানুষকে। এতে দেখা যাচ্ছে, একচুলা এবং দুই চুলার দামের ব্যবধান মাত্র ৫০ টাকা। এ অবস্থায় অধিকাংশ মানুষই প্রয়োজন না থাকলেও দুই চুলাই ব্যবহার করতে চাইবে। আর তা করছেও। আর এটা কি জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়? এতে জনগণের কেউ কি মাত্র ৫০ টাকা বেশির জন্য আর এক চুলা ব্যবহার করতে চাইবে? নাকি ৫০ টাকা বেশির জন্য এক চুলা ব্যবহার করবে? সরকার এ ব্যাপারটিকে কীভাবে গ্রহণ করবে? বিইআরসির আদেশ অনুযায়ী, আগামী মাস থেকে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাঘরে যাদের দুই চুলা আছে তাদের দিতে হবে ৯৭৫ টাকা। এখন দিতে হয় ৮০০ টাকা। অর্থাৎ দুই চুলার গ্রাহকদের এখন থেকে পৌনে ২০০ টাকা বেশি দিতে হবে। যাদের রান্নাঘরে এক চুলা আছে, তাদের দিতে হবে ৯২৫ টাকা। এখন দিতে হয় ৭৫০ টাকা। যেসব আবাসিক গ্রাহকের মিটার আছে, আগামী মাস থেকে তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ১২ টাকা ৬০ পয়সা ধার্য করা হয়েছে। যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার হবে ৪৩ টাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ উৎপাদন (ক্যাপটিভ পাওয়ার), সার কারখানা, শিল্প, হোটেল রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পসহ বাণিজ্যিক, চা-বাগান প্রতিটি খাতেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও এদিকে কিন্তু ভারতে গ্যাসের দাম কমানো হয়েছে। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম একটি গণমাধ্যমকে বলেন, বিভিন্ন করের পর গ্যাসের দাম বাড়ানো হলো। ফলে এটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষের জীবনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, জ্বালানি ও ভ্যাটের সঙ্গে সবকিছু জড়িত। বিশেষ করে পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বাসাভাড়া। ফলে এর প্রভাব জীবনযাত্রার সবগুলো খাতেই পড়বে। তিনি আরও বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ফলে বড় একটি শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্তরা হয়তো সঞ্চয় ভেঙে খাবে, অথবা তাদের জীবনযাত্রার মান কমবে। তার মতে, দেশের উৎপাদিত পণ্যের খরচ বেড়ে যাবে। এর ফলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত এবং দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতায় পড়বে। তিনি বলেন, দেশের বণ্টন ব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে। ফলে কিছু মানুষের আয় বাড়লেও তাদের সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি তেমন লাভবান হয় না।

উল্লেখ্য, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। কোম্পানিগুলো গ্যাসের দাম গড়ে ১০২ ভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব করে। এরপর মার্চ মাসে গণশুনানি করে কমিশন। শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে দামের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম অনুযায়ীই গত রোববার গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় কমিশন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম চার টাকা ৪৫ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা, সার কারখানায় চার টাকা ৪৫ পয়সা এবং শিল্প কারখানা ও চা-বাগানে ১০ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। বাণিজ্যিক খাতে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২৩ টাকা এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ১৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিইআরসি জানায়, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম সাত টাকা ৩৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গড়ে দাম বেড়েছে ৩২.৮ শতাংশ। বিদ্যমান ন্যূনতম চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গৃহস্থালি ব্যতীত অন্যান্য গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার মাসিক অনুমোদিত লোডের বিপরীতে ০.১০ টাকা হারে ডিমান্ড চার্জ আরোপ করা হয়েছে।

কথায় বলে, ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ।’ অর্থাৎ একই বিষয় কারো জন্য যেমন খুশি বয়ে আনে, অন্যদিকে সেই একই বিষয় কারো জন্য দুঃখ বয়ে আনে। তা চীনের দুঃখ যে হোয়াং হো নদী- বাংলাদেশের গ্যাসও কি বাংলাদেশের মানুষের জন্য তেমনি দুঃখ হয়ে থাকবে? নয়তো দেশের মানুষ গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে হলেও যেভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, তাতে করে সরকার ফের প্রমাণ দিল যে, তারা জনগণের স্বার্থে দেশ পরিচালনা করছে না। কিন্তু সরকার যে ‘গণশুনানি’ করেও জনমতকে এড়িয়ে জনগণের ওপর বাড়তি গাসের দাম চাপিয়ে দেওয়া হলো, তাতে করে দেশের মানুষই বুঝতে পারবে, এই ‘বাড়তি চাপ’ মানেই ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।
 

Ads
Ads