বিদেশি ব্যাংকে অর্থ: পাচারকারীরা কি ডুমুরের ফুল?

  • ২৯-Jun-২০১৯ ১০:০১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশ যে একে একে বহুক্ষেত্রেই উন্নতির স্বাক্ষর রেখে চলেছে সে আজ মাথার ওপরে সূর্য থাকা দিবালোকের মতোই সত্য। যে দেশটিতে গত তিন দশক আগেই দেখা যেত ভাঙা টেবিল-চেয়ারসমৃদ্ধ হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি ব্যাংক- সে দেশটিতে আজ নতুন ব্যাংকের ছড়াছড়ি। গত তিন দশক আগে এদেশে যে কটা সোনালী, রূপালী, পূবালী, জনতা, অগ্রণী নামের সরকারি ব্যাংক ছিল সেখানে যে গ্রাহক ছিল তাদের বেশিরভাগই খুচরা টাকা জমা রাখত। তুলতও শতেক, হাজারেক এমন টাকা। এখন এমন গ্রাহক আর কোথাও দেখা যাবে না। এমনকি মফস্বল এলাকায়ও। আর তখন বিদেশি কোনো ব্যাংকে অর্থ জমা রাখবে, এমন লোক তো ছিল ডুমুরের ফুলবিশেষ। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা সম্পর্কে যদি বলা হয়, তখন কী উত্তর হবে এর? একসময় বিদেশি ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখা ছিল বড়লোকদের শখবিশেষ। আর এখন? সেই শখ গিয়ে ঠেকেছে পাচারে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ এ বছর আবার বেড়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে দেশের ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশিদের আমানত দাঁড়িয়েছে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। ঠিক এক বছর আগে ২০১৭-এর ডিসেম্বরে বাংলাদেশিদের অর্থ জমানোর পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ফ্রাঁ; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। অতীতের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বাড়ে। ২০১৭ সালে খানিকটা কমলেও এবার আবার বেড়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের অর্থ জমানোর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৯ কোটি টাকা, ২০১৬-তে এর পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫৬৬ কোটি, ২০১৫-তে ৪ হাজার ৪১৭ কোটি, ২০১৪-তে ৪ হাজার ৫৮ কোটি, ২০১৩-তে ২ হাজার ৯৮১ কোটি। অর্থাৎ মাঝে ২০১৭ সাল ছাড়া প্রতি বছরই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ জমানোর পরিমাণ বেড়েছে। এজাতীয় খবর প্রকাশের পর সাধারণভাবে ধারণা জন্মে, সব টাকাই বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। অর্থনীতি নিয়ে যারা লেখালেখি ও গবেষণা করেন তারা মনে করেন, দুটি কারণে এমন ধারণা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেকে এখানে অর্থ রাখা নিরাপদ মনে করেন না। আবার দেশে বিনিয়োগের মতো উপযুক্ত পরিবেশের অভাব। এ নিয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালে ৫৯১ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাচার হয়েছে।

আর ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাচার হয়েছে ছয় হাজার ৩২৮ কোটি ডলার। আর এতেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এই টাকাগুলোর উৎস কি? এদিকে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই অর্থের সবই অবৈধভাবে গেছে, তাও বলা যাবে না। তবে বৈধ হোক আর অবৈধই হোক কারো টাকা যদি সেখানে থাকে, সেটা নিয়ে এখানে তদন্ত হয়। আর তদন্তে কোনো তথ্য দরকার পড়লে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হিসেবে ওই দেশে চিঠি লেখা হয়। তখন তারা দেখে, কার কি আছে না আছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তথ্য বলছে, গত বছর আমদানি ব্যয় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। অনেকের ধারণা, তার একটি অংশ পাচার হয়ে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে জমা হয়েছে। কাজেই এটা পাচার নাকি বৈধভাবেই জমা হয়েছে, তা এদেশের জনগণ জানতে চাইতেই পারে।

আইন অনুযায়ী দেশ থেকে অর্থপাচারের বিষয়টি তদারক করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে কারা অর্থ জমা করেছে, নানাভাবে সেই তথ্য জানার চেষ্টা করেও জানতে পারেনি সংস্থাটি। কারণ তথ্য জানতে হলে ব্যক্তির পুরো পরিচয় ধরে তথ্য চাইতে হয়। কিন্তু তা এখানে সম্ভব হচ্ছে না। আরেক তথ্যে জানা যাচ্ছে, ভারত সরকারের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের এ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। কাজেই এক্ষেত্রে ভারত কীভাবে সুইজারল্যান্ড থেকে তথ্য আদায় করছে, তার বিস্তারিত জেনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে এই বাংলাদেশি মুদ্রা পাচারকারীদের প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসা অসম্ভব কিছু হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস।

সুইস ব্যাংককে দুনিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক বলে বিবেচনা করা হয়। কারণ গ্রাহকের পরিচয়সহ সব তথ্যও গোপন রাখে তারা। ফলে গোটা পৃথিবীর টাকাঅলাদের প্রথম পছন্দ সুইস ব্যাংক। কালোটাকার মালিকদের মাঝে সুইস ব্যাংক হলো সঞ্চয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান। 

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পথে অর্থপাচার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হয়; যার একটি বড় অংশ সুইস ব্যাংকে জমা হয়। ইউরোপের দেশগুলোয় ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে অর্থপাচার হয়। সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে শীর্ষ এক ব্যবসায়ী এ পদ্ধতিতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। বাংলাদেশ থেকে বড় ব্যবসায়ী, আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতরা, ব্যাংকিং ও শুল্ক দফতরের কিছু লোকও পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। মাত্র এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা জমা পড়ায় এ অর্থের উৎস নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এ টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত না প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চিত অর্থ, তা নিয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা। এখন এসব অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকারের কি আদৌ জানার ইচ্ছা রয়েছে কি-না সেটা আমরা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

শুধু তা-ই নয়, এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের গচ্ছিত টাকা এবং তার উৎস সম্পর্কেও সরকার জানার চেষ্টা করবে- সেটাও আমরা প্রত্যাশা করি। কেননা, এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলেই কিন্তু ছিল টাকা পাচার-সংক্রান্ত। ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের উৎসও এই টাকা পাচার-সংক্রান্ত। কিন্তু এখন আবার নতুন করে, নতুন পদ্ধতিতে সেই একই টাকা পাচারের বৃত্তেই যদি আটকে থাকে বাংলাদেশ- তাহলে এদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত সার্থকতা ভোগকারী হিসেবে সেই প্রায় একই অর্থ পাচারকারীদেরই বুঝতে হবে?  

Ads
Ads