বেপরোয়া মিয়ানমার: জাতিসংঘকে হার্ড লাইনে যেতে হবে

  • ১৯-Jun-২০১৯ ১০:৩৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

কাউকে পরোয়া না করার প্রত্যয়ে মিয়ানমার এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি কোনোটারই পরোয়া করছে না দেশটি। অনেক টালবাহানা শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বেকুব বানাতে শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে চুক্তি করলেও আবার সেই টালবাহানার বৃত্তেই রয়ে গেছে। একটি রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি। উপরন্তু বাংলাদেশকেই দোষারোপ করছে। বলছে, বাংলাদেশের কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়নি। জাতিসংঘকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও উপেক্ষা করছে। এহেন প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে থাকা উদ্বাস্তুদের ক্যাম্পগুলোতে খাদ্যসহ অন্যান্য সহায়তা প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছে। ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশ পেয়েছে, মিয়ানমারে অবস্থানকারী জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি কেনাট ওস্টবি এক চিঠিতে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর মানবিক সংস্থাগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্ত মিয়ানমার সরকারকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘ ২০১২ সাল থেকে এক লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে বাঁচিয়ে রাখতে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। সত্তরের দশকের শেষে রোহিঙ্গাদের ওপর এই বর্বর নির্যাতন শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে নির্যাতনের মুখে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। পরে এদের একটি অংশকে মিয়ানমার ফেরত নিলেও অনেকেই বাংলাদেশে থেকে গেছে। এরপর ১৯৯২ সালে ফের দেশটির সেনাবাহিনী ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে। তখনো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর পর থেকেই শুরু হয় প্রত্যাবাসনের নামে মিয়ানমারের টালবাহানা। ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বর আক্রমণ চালায় তাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ অভিহিত করা হয়েছে। এরপরও দেশটির সেনাবাহিনী ক্ষান্ত হয়নি।

রোহিঙ্গা নিধনে আরও অনেক নিষ্ঠুরতা বেগবান করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে ভয়াবহ এক ‘গণহত্যা’র প্রেক্ষাপটে এক লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে তাদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পে অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা হয়। তাদের অবাধে চলাচলের অধিকার নেই। জীবিকার তাগিদেও কাজ করার সুযোগ নেই। তাদের বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসে জাতিসংঘ। খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে থাকে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বারবার জাতিসংঘকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ক্যাম্পগুলো বন্ধ করে দিয়ে তাদের নিজ গ্রামে বা নিকটস্থ এলাকায় পুনর্বাসন করা হবে। চলাচল ও কাজ করার অধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। এখন জাতিসংঘ মনে করছে, মিয়ানমার এই সংকটের সমাধান করার বদলে বরং সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে। সে কারণেই সহায়তা প্রত্যাহারের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অতীতে যেমন মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে আসছিল, বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে। রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরির কথা মুখে বললেও বাস্তবে মিয়ানমার সরকার কিছুই করছে না; বরং অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার ফন্দি আঁটছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘসহ বিশ্বসম্প্রদায়কে হার্ড লাইনেই যেতে হবে। প্রয়োজনে সর্বাত্মক অবরোধে যেতে হবে। যতোক্ষণ পর্যন্ত তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারগুলো ফিরিয়ে দিতে বাধ্য না হয়।

Ads
Ads